মাউন্টেইন মেমোরিজ : কানেকটিং পিকস পিপলস
রিয়াসাদ সানভী
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৪ ১৪:০৯ পিএম
শিরোনাম ‘হিলারি স্টেপ’, হিমালয় শৃঙ্গের পথে অভিযাত্রী দল। ছবি : নিশাত মজুমদার
হিমালয় সব ঋতুতে তার রূপ বদলায়। হিমালয়কে বুঝে ওঠা পরম আকাঙ্ক্ষিত মানুষটির মন পড়ার চাইতেও কঠিন। তবে এখানে কিছু ব্যাপার কখনও বদলায় না। কেউ একবার তার টানে বাঁধা পড়লে কিছুতেই ঘরে তার মন বেঁধে রাখা যায় না। তাকে বারবার ছুটে যেত হয় ঘর পালানো বাতাসের ডাকে। হিমালয়ের শিখরগুলোর এমন অমোঘ আকর্ষণ, যে মৃত্যুভয়ও তখন অতি তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হয়।

হিমালয়ের ব্যাপ্তি কয়েক হাজার কিলোমিটার। তবে ‘হিমালয়’ নাম শুনলে যে দেশটির কথা সবার আগে মাথায় আসে তার নাম নেপাল। পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ থেকে গগনচুম্বী গিরিপথ, বৈচিত্র্যে ভরা পার্বত্য জীবন আর প্রকৃতির রোমাঞ্চকর আহ্বান। নেপাল এখানে অনন্য, অতুলনীয়।
হিমালয়ের পায়ের কাছের বাংলাদেশ থেকে পর্বতারোহণের রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালের পর। বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব-বিএমটিসির হাত ধরে এ দেশে পর্বতারোহণ যুগের শুরুর পর একসময় এভারেস্ট আরোহণও সম্ভব হয়।
তবে সারা বছর হিমালয়ের দুর্গম পথে অভিযানে ব্যস্ত পর্বতারোহীদের নিজেদের মধ্যে মতবিনিময়, অভিজ্ঞতার আদানপ্রদানের সুযোগ কমই হয়। সেই সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিতেই বাংলাদেশে অবস্থিত নেপাল দূতাবাস এবং দেশের প্রথম পর্বতারোহণ ক্লাব বিএমটিসি আয়োজন করে ‘মাউন্টেইন মেমোরিজ : কানেকটিং পিকস পিপলস’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

যেখানে অংশ নিচ্ছেন অভিযাত্রী, রোপ ফোর, ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স, অল্টিচিউড হান্টার্স, কোয়েস্ট, মাউন্টেইন ম্যাডনেস, বিএমটিসির মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় সব ক্লাব।
আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে মূলত নেপাল-হিমালয়ের প্রাণপ্রকৃতি এবং শিখর আরোহণের উদ্দেশ্যে অভিযানের রোমাঞ্চে ভরপুর মুহূর্তের ছবিমালা। এভারেস্ট, মানাসলুর মতো ৮ হাজার মিটারি শৃঙ্গে সফল অভিযান করেছেন এ দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ পর্বতারোহী এম এ মুহিত। তার তোলা বেশ কয়েকটি ছবি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। কখনও ভয়ংকর পর্বত খ্যাত কাঞ্চনজঙ্ঘার সামিটের আগে শেষ ক্যাম্পে আরোহণের গা শিউরে ওঠা ছবি, কখনও এভারেস্ট শৃঙ্গের আগে হিলারি স্টেপ পার হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত এম এ মুহিতের ক্যামেরায় মূর্ত হয় উঠেছে। তার তোলা প্রতিটি ছবিতে জড়ানো আছে অভিযানের রোমাঞ্চ।
আরেক আলোকচিত্রী এবং অভিযাত্রী আরিফুর রহমানের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে হিমালয়ের অসীম সুন্দরের হাতছানি। নীলগিরি পর্বতের রহস্যে ঘেরা সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেকোনো দর্শক হারিয়ে যাবেন হিমালয়ের সেই গহিন সুন্দরে। হিমালয়ের রাতের আকাশ কতটা স্বপ্নময় হতে পারে, তা আরিফুর রহমানের আলোকচিত্র না দেখলে বোঝা সম্ভব না।
আছে নিশাত মজুমদারের তোলা হিমালয় শৃঙ্গের দিকে যাওয়া অভিযাত্রী দলের গা হিম করা ছবি। ফজলুর রহমান শামীমের ‘আমা দাবলাম ফ্রম সায়াংবোচে’ শিরোনামের ছবিটি দেখে যে-কারও মন চাইবে এ জীবনে একটি বারের জন্য হলেও হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়ে আসি। ইকরামুল হাসান শাকিলের তোলা ‘নমস্তে’ ছবিটি নেপালের পাহাড়বেষ্টিত সাধারণ জনজীবনের প্রতিচ্ছবি।

আরেকটি ছবি মন কেড়ে নেওয়ার মতো। দেখলে মনে হবে পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম পর্বত মানাসলুর যেন সবুজের মাঝে রাজত্ব করা সাদা দৈত্য। সবুজে তার দুই মাথা বের করে রাজসিক ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকাই এ ছবির মূল বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়া শেরপা রাজধানী নামচে বাজারের ঠিক আগে হিলারি ব্রিজের উলম্ব ছবিটি যেন অভিযানপ্রিয় মানুষকে স্বপ্নময় হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
এ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের যে উল্লেখযোগ্য ১৮ পর্বতারোহীর ছবি স্থান পেয়েছে তারা হলেন নিশাত মজুমদার, ফজলুর রহমান শামীম, আরিফুর রহমান, অমিত ঘোষ, ফরহান জামান, মাহমুদ রানা, জাফর সাদেক, মোহাম্মদ হোসাইন সবুজ, আবরারুল আমিন, আহাসানুজ্জামান তৌকির, আবু সাইদ মো. রাজীব, কাউছার রূপক, রিয়াসাদ সানভী, ইকরামুল হাসান শাকিল, বাহালুল মজনু বিপ্লব, নূর মোহাম্মদ, সাদিয়া সুলতানা ও এম এ মুহিত। এ আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বিশ্বখ্যাত চার নেপালি শেরপা ক্লাইম্বিং গাইড মিংমা গ্যালজে শেরপা, পেম্বা দর্জি শেরপা, ড্যান্ডি শেরপা, চিরিং ওয়াংচু শেরপার তোলা বেশ কয়েকটি ছবি।
তিন দিনব্যাপী প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে গতকাল ৩১ মে। চলবে আগামীকাল ২ জুন পর্যন্ত। পাহাড় আর রোমাঞ্চ যারা ভালোবাসেন তারা চলে আসতে পারেন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ২ নম্বর গ্যালারিতে। বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।