চলতি মাসের শেষ নাগাদ শুরু হবে বোরো মৌসুমের ধান রোপণ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় জমি প্রস্তুত চলছে। দেশে সারের রিজার্ভ দিয়ে প্রাথমিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেখা দিতে পারে সার সংকট। সংকটের শঙ্কা ইতোমধ্যে জাগতে শুরু করেছে মাঠ পর্যায় এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যেও।
এরই মধ্যে বেসরকারি সার আমদানিকারকদের ঋণপত্র (এলসি) খুলতে বেসরকারি ব্যাংকের খামখেয়ালি এবং সোনালী ব্যাংকের এলসি সৌদি আরবের দুটি ব্যাংক বাতিল করার পর সেই শঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ডিলাররা। তবে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) এবং ডিএপি সারের সংকট মাঠ পর্যায়ে বেশি বলে জানা গেছে। তবে বেসরকারি উদ্যোগের ৩০ শতাংশ সার আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করলেও সরকারি উদ্যোগের ৭০ শতাংশ সার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে আসবে বলে মনে করে মন্ত্রণালয়টি।
এদিকে সার আমদানিতে জরুরি ভিত্তিতে ডলার জোগান দেওয়ার জন্য সরকারি দপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে। গতকাল সোমবার সরকার সার আমদানির জন্য ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ছাড় করেছে। এদিকে চাহিদা অনুযায়ী ডিলাররা এখনই সার পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, গত অক্টোবর থেকেই ডলার সংকটে ভুগছে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ফলে বাড়তি মূল্য পরিশোধ করেও ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। দেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলো গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও পাঁচ লাখ টন বেশি সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে সামনের বোরো মৌসুমে সার পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে দুশ্চিন্তা। এর বাইরে চাহিদার তুলনায় সার না দেওয়ায় ইতোমধ্যে শীতকালীন সবজি চাষে প্রভাব পড়ছে বলে জানা গেছে। বোরোর জমি তৈরির সময় এমওপি সার দিতে হয়। কিন্তু বেসরকারি আমদানিকারকরা এলসি খুলতে না পারার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই সার আসবে কি না তা দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের এলসি বাতিল করেছে সৌদি আরবের দুটি ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন শিল্প মন্ত্রণালয় অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে দুটি লটের এলসি খুলেছে।
সার আমদানির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সার আমদানির জন্য ৫১৯ কোটি (৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার জোগানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। এর মধ্যে গতকাল সোমবার ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার বরাদ্দও দিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, গ্যাস সংকট ও কারখানা মেরামতের কারণে ইউরিয়ার উৎপাদন ঘাটতির শঙ্কায় যখন বাড়তি আমদানির পরিকল্পনা চলছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবে ব্যাংক আল-বিলাদ এবং ব্যাংক আলজাজিরা পরপর চারটি এলসি বাতিলের ঘটনায় আমদানিতে শিডিউল বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এলসি বাতিল হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বিসিআইসি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে।
বিসিআইসির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইউরিয়া আমদানির শিডিউলটা নির্ধারিত। এর ওপর নির্ভর করছে আমাদের কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ। আমদানিতে সমস্যা হলে মাঠ পর্যায়ে সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হবে।’
জানা যায়, সৌদি আরব থেকে ৩০ হাজার টনের মোট ১৬টি লটে জিটুজি প্রক্রিয়ায় সার আমদানি করছে বাংলাদেশ সরকার। এর প্রথম তিনটি লটের চালান আনলেও পরবর্তী চার লটের সার আমাদানিতে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে চার ও পাঁচ নম্বর লটের সার নেওয়ার জন্য বন্দরে ৭ দিন ধরে জাহাজ লোডিংয়ের জন্য রেডি করা ছিল। ফলে ক্ষতিপূরণ বাবদ দৈনিক ২০ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে সরকারকে।
জানা গেছে, চলতি বছরে ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ২৬ লাখ টন এবং নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ৮ লাখ টন মিলিয়ে মোট ৩৪ লাখ টন। বিসিআইসির চারটি নিজস্ব সার কারখানার মাধ্যমে সাড়ে ১০ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও গ্যাস সংকটের কারণে তিন মাসের বেশি সময় ধরে যমুনা সার কারখানা একেবারেই বন্ধ। গ্যাস সংকট ও অব্যাহত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাকি তিনটির উৎপাদনও পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। ফলে পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া অতিরিক্ত আমদানির অনুমোদন নিয়েছে বিসিআইসি। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিসিআইসির আমদানি লক্ষ্য ছিল ১৭ লাখ ৭০ হাজার টনের। এই সার আমদানি করার কথা সৌদি আরব থেকে। এর বাইরে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) কাছ থেকে ছয় লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। বাড়তি পাঁচ লাখ টন ইউরিয়াও আমদানি করা হবে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ইউরিয়া সারের চাহিদা সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯২৫ লাখ টন, অক্টোবরে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৪০ লাখ টন, নভেম্বরে ২ লাখ ২৪ হাজার ৩৩৯ লাখ টন এবং ডিসেম্বরে ৩ লাখ ১ হাজার ৩৯৫ লাখ টনসহ মোট ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯ টন। তবে সঠিক পরিসংখ্যান না দিলেও সারের বর্তমান মজুদ গত বছরের এই সময়ের তুলনায় সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ইউরিয়া সারের মোট চাহিদার পুরোটাই আমদানি করে বিসিআইসি। আর এমওপি, টিএসপি এবং ডিএপি—এই তিন সার আমদানির একটা অংশ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এই তিন সারের বাকিটা আমদানি হয় বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে। সরকারি উদ্যোগে সারের তেমন কোনো সমস্যা না হলেও বেসরকারি আমদানি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। শঙ্কা রয়েছে বিএডিসির মাধ্যমে আমদানির সারের ক্ষেত্রেও। ফলে বিএডিসি বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সার আমদানির জন্য চলতি অর্থবছরে ৫১৯ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হতে পারে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৫৬ হাজার ৫২ কোটি টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ও উপকরণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বলাই কৃষ্ণ হাজরা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সারের ৭০ শতাংশ আমদানি হয় সরকারিভাবে। এটি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ সার আমদানির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অতিমুনাফার জন্য বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক এলসি খুলতে চাচ্ছে না। ফলে বেসরকারিভাবে আমদানি হওয়া ৩০ শতাংশ সার নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। বর্তমানে সারের মজুদ গত বছরের এই সময়ের চেয়ে বেশি আছে। আশা করি কোনো অসুবিধা হবে না।’
এদিকে সরেজমিনের তথ্য বলছে, চাহিদা অনুযায়ী ডিলাররা ইউরিয়া বা অন্য সার পাচ্ছেন না। ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমে সংকটের আশঙ্কা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। এমওপি সার নিয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। বাকি ডিএপি এবং টিএসপিরও সংকট রয়েছে। ফলে এখন থেকে সার কম বিক্রির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন তারা।
নেত্রকোণার একজন ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখনই সার পাচ্ছি না চাহিদা অনুযায়ী। ইরি (বোরো) মৌসুম আসলে বড় সংকট হতে পারে। গত কয়েক বছর ধরেই এমওপি সার নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। তবে এ বছর সংকট আরও প্রকট।’