ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:৫৯ পিএম
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৭:০৪ পিএম
ইতালির রোম চিড়িয়াখানা বা বাঁয়োপার্কোতে একটি রাজ শকুন। ছবি : ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
একসময় লাল-মাথার পাখিটিকে এদেশে দেখা যেত প্রচুর সংখ্যায়। মুরব্বি ও বিজ্ঞজনের কাছে শুনেছি কোথাও কোনো গরু-মহিষ মারা গেলে এই পাখিটির আগে কেউ তাতে ঠোঁট চালাত না। জানা মতে, স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে এদেশে ওরা বাসা করত, ডিম-ছানা তুলত। এমনকি, ১৯৭৩ সালেও খুলনার ডুমুরিয়াতে ওদের একটি বাসা পাওয়া গিয়েছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পাখিটি মহাবিপন্ন বলে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশে এখন আর ওদের দেখা যায় না। কাজেই এদেশে আমার পক্ষে পাখিটির দেখা পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু ২১ মার্চ ২০১০ সালে ইতালির রোমে একটি কনফারেন্সে গিয়ে রোম চিড়িয়াখানায় (তাদের ভাষায় বায়োপার্কো) ওদের একটির দেখা পেলাম। আর সঙ্গে সঙ্গেই ওর ক’টি ছবি তুলে নিলাম। এরপর এই তেরো বছরের মধ্যে কোথাও ওদের টিকিটিরও দেখা পাইনি। আর এদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে ওদের দেখা পাওয়ার কোনো তথ্য আমি পাইনি।
বিশ্বব্যাপী মহাবিপন্ন এবং বর্তমানে এদেশের অতি বিরল পাখিটির নাম রাজ শকুন। মোল্লা শকুন বা মোরগ শকুন নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Red-headed Vulture, King Vulture, Indian Black Vulture বা Pondicherry Vulture। বৈজ্ঞানিক নাম Sarcogyps calvus। এদেশের প্রাক্তন আবাসিক পাখিটিকে বহু পূর্বে সিলেট (সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ) বিভাগের উন্মুক্ত এলাকায় ভবঘুরে হিসেবে দেখার তথ্য রয়েছে। ওরা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের আবাসিক পাখি। এ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো দেশে পাওয়া যায়।
প্রাপ্তবয়স্ক রাজ শকুনের দেহের দৈর্ঘ্য ৭৬ থেকে ৮৬ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ২০০ থেকে ২৩০ সেন্টিমিটার ও ওজন ৩.৫ থেকে ৬.৩ কেজি। পুরো দেহ কালো পালকে মোড়ানো। পালকবিহীন মাথা ও ঘাড়ের চামড়া গোলাপি-লাল। গলার দু-পাশে দুটি ঝুলন্ত লাল লতিকা রয়েছে। ডানা কালো, ডানার মধ্য-পালকের গোড়ার ধূসর-সাদা অংশ ওড়ার সময় ফিতার মতো দেখায়। ওড়ার সময় বুক ও রানে সাদা পট্টি ছাড়া দেহ স্পষ্টতই কালো দেখায়। রানের ভিতরের পালকহীন খোলা চামড়া লাল। চোখ হলুদ, লাল-বাদামি কিংবা গাঢ় লাল। চঞ্চু কালচে-বাদামি, নিচের চঞ্চুর গোড়া হলুদ। পা ও পায়ের পাতা অনুজ্জ্বল কালচে-নীল ও মেটে থেকে অনুজ্জ্বল লাল। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথায় রয়েছে সাদা কোমল পালক ও মাথা কালচে-বাদামি। খোলা চামড়া কিছুটা পাটকিলে ও লেজতল-ঢাকনি সাদা।
ওরা উন্মুক্ত মাঠ, আবাদি জমি, বনভূমি ও শুকনো এলাকায় একাকী কিংবা জোড়ায় বিচরণ করে। অন্য প্রজাতির শকুনের সঙ্গে প্রাণীর মৃতদেহ খায়। খাবারের এলাকায় প্রায়ই অন্য প্রজাতির শকুনের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। ঝগড়ার সময় ‘হিস-হিস—-’ বা ‘ঘড়-ঘড়—-’ শব্দ করে।
ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল ওদের প্রজননকাল। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে মাটি থেকে ৯ থেকে ১২ মিটার উঁচু কোনো গাছের ডালে (মগডাল বেশি পছন্দ) বড়োসড়ো বাসা বানায় ও স্ত্রী তাতে একটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও প্রায় ৪৫ দিনে ডিম থেকে ছানা ফোটে। সদ্য ফোটা ছানার কোমল পালকের রঙ ধূসর-সাদা। ছানারা কত দিনে উড়তে শিখে বা বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তা জানা যায়নি। আয়ুষ্কাল প্রায় ১৫ বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ