আব্দুর রহমান মিল্টন, ঝিনাইদহ
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৬:৫২ পিএম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২২:১৩ পিএম
ঝিনাইদহে বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষ হচ্ছে ড্রাগন। শুক্রবার কালীগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে তোলা। প্রবা ফটো
ড্রাগন চাষে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে কৃষিপ্রধান জেলা ঝিনাইদহে। দুই বছরের ব্যবধানে জেলায় ড্রাগনের চাষ বেড়েছে ৮ গুণ। জেলার ৮৪২ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হয়েছে। অথচ দুই বছর আগেও মাত্র ১৪১ হেক্টর জমিতে চাষ হতো। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ রসালো এই ফলের দেশজুড়ে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া ভালো ফলন ও বিক্রি করে লাভবান হওয়ায় কৃষক ঝুঁকছে ড্রাগন চাষে। ফলে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাড়ছে ড্রাগনের চাষ। ড্রাগন বেচা-কেনায় মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুরে গড়ে উঠেছে পাইকারি হাট।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার জেলায় ৮৪২ হেক্টর জমিতে ড্রাগনের চাষ হয়েছে। আর প্রতি হেক্টর জমি থেকে গড়ে ৩২ টন ড্রাগন উৎপাদন হবে। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলায় ২৬ হাজার ৯৪৪ টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদিত এসব ড্রাগনের বাজারমূল্য ছিল ৫৩৮ কোটি টাকারও বেশি। জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলায় ড্রাগন চাষ বেশি হয়। কালীগঞ্জের ২১৬, কোটচাঁদপুরে ৩০০ ও মহেশপুরের ২৮০ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হয়েছে।
ড্রাগন চাষ করা কৃষকরা জানান, ড্রাগন চাষে খরচ খুবই কম। কীটনাশকের তেমন ব্যবহার নেই। ক্যাকটাস জাতীয় এ গাছে জৈব সার দিতে হয়। এক বিঘা জমিতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ৫-৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা যায়। চারা লাগানোর এক বছরের মধ্যে ফুল-ফল আসে।
মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুরসহ আশপাশের অঞ্চলে হাজার হাজার টন ড্রাগন উৎপাদন হয়। এ বছরের শুরুর দিকে উপজেলার মালাধারপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন কোটচাঁদপুর-মহেশপুর সড়কের গৌরীনাথপুর গ্রামে রাস্তার পাশে গড়ে তোলেন ড্রাগন ফলের আড়ত। নাম দেন ‘বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আর ড্রাগনের রাজধানী গৌরীনাথপুর নতুন বাজার’। তিনিই এখানে ড্রাগন ফলের আড়তের প্রথম উদ্যোক্তা।
জসিম উদ্দিন জানান, দেশের নানাপ্রান্ত ঘুরে এত পরিমাণ ড্রাগন চাষ কোথাও দেখেননি। তাই আড়তের এমন নাম দেন। তার আড়ত থেকে প্রতিদিন ২০-২৫ লাখ টাকার ড্রাগন কেনা-বেচা হয়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা। তার দেখাদেখি এখানে ছোট-বড় ৫০টি আড়ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাসহ কৃষক-ব্যবসায়ীরা জানান, গৌরীনাথপুর ড্রাগন ফলের এখন পাইকারি বাজার। প্রতিদিন দেড় থেকে ২ কোটি টাকার ফল কেনা-বেচা হয় এখানে। মাসে কেনা-বেচা হয় ৫০- ৬০ কোটি টাকা। তরুণ-বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি আড়তে ১০-১৫ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছে। এখানে এলাকার তরুণ ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। কৃষক, পাইকার ব্যবসায়ী, শ্রমিক-কর্মচারীদের হাঁকডাকে মুখর গৌরীনাথপুর বাজার। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে একটানা কেনা-বেচা। এরপর ট্রাক ভরে ড্রাগন ফল চলে যায় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, কুমিল্লা, খুলনা, সিলেট, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
ঢাকা থেকে এসেছেন ব্যবসায়ী জামাল হোসেন খান। তিনি জানান, বাংলাদেশের গ্রাম পর্যায়ে এত বড় বাজার আগে দেখেননি। এ অঞ্চলে যত ড্রাগনের চাষ বাড়ছে তত চাহিদাও বাড়ছে। সুলভ মূল্যেই তারা তরতাজা-সতেজ ফল কিনছেন। নাটোর থেকে আসা পাইকার মিজানুর রহমান জানান, আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফল কিনতে হতো। কৃষকরা এই ফল বিক্রি করতে পারত না। বিক্রির ঝামেলা, টাকার ঝামেলা ছিল। ঢাকার আড়তে পাঠালে সময়মতো টাকা পেত না। এখন কৃষকরা দামদর যাচাই-বাছাই করে বিক্রি করতে পারছে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গৌরীনাথপুরসহ এ অঞ্চলে উৎপাদিত ড্রাগন যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যেও। এখানকার শতাধিক কৃষকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ‘হ্যাপি হাট’ নামে একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। তারা প্রতি সপ্তাহে দুই টন করে ড্রাগন নিয়ে যাবে। এরই মধ্যে দুইশ কেজি ফলের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে সন্তোষজনক ফলাফল জানিয়েছে।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজগর আলী বলেন, ‘ধানসহ বিভিন্ন ফসল-ফলের চেয়ে ড্রাগন চাষ লাভজনক। তাই মহেশপুরের গৌরীনাথপুরের পাইকারি বাজারটি এখন ড্রাগনের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাজারে টিনশেড ঘর নির্মাণসহ নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে। ড্রাগন ফল বিদেশে রপ্তানি করতে শতাধিক কৃষক হ্যাপি হাট নামে দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এরই মধ্যে ফলের ওজন এবং বিষমুক্ত কি নাÑ তা পরীক্ষা করা হয়েছে। তারা প্রতি সপ্তাহে ২ টন ড্রাগন ফল পাঠাবে দুবাইয়ে।’