মোহন আখন্দ, বগুড়া
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১০:৫৫ এএম
বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলি গ্রামের একটি ক্ষেতে কুঁকড়ে যাওয়া মরিচের গাছ। প্রবা ফটো
ক্ষেতে মরিচগাছের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে। মরিচক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। অথচ কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা মিলছে না। তাদের ব্যস্ততা ‘মাল্টা প্রজেক্ট’ নিয়ে। তাই দিশাহারা কৃষকরা ছুটছেন কীটনাশক বিক্রেতাদের কাছে। এতে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচা মরিচের মূল্যবৃদ্ধির কারণ জিজ্ঞেস করাতেই বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরের কয়েকজন কৃষক এমন অভিযোগ করেন।
এক বছরের ব্যবধানে মরিচের দাম ৫ গুণ বেশি কেন, এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল বগুড়ার শিবগঞ্জ সদরের উথলি গ্রামের কৃষক হাতেম আলীকে। তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে এই প্রতিবেদককে তার মরিচের ক্ষেত দেখতে যেতে আহ্বান করেন।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে উথলি গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মরিচের আবাদ চোখে পড়ে। বছরের এই সময়টাতে ওই গ্রামের কৃষকরা সূর্যোদয়ের পরপরই ক্ষেত থেকে মরিচ তোলা শুরু করেন এবং পরে সেগুলো হাটে-বাজারে বিক্রি করেন।
স্থানীয় কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জে ২৫০ হেক্টর জমিতে এবার মরিচের চাষ হয়েছে। সাধারণত মার্চের মাঝামাঝিতে আবাদ শুরু হয়। তার আড়াই মাস পর থেকেই কাঁচা মরিচ উত্তোলন শুরু হয়। গড়ে ১০ দিন পরপর তিন মাস ধরে মোট ৯ বার কাঁচা মরিচ তোলা যায়। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে পরবর্তী তিন মাসে প্রতি হেক্টর জমি থেকে ১০ মেট্রিক টন কাঁচা মরিচের ফলন মেলে। সেই হিসাবে প্রতি বিঘা জমি থেকে ১০ দিন পরপর গড়ে ১৪৮ কেজি বা পৌনে ৪ মণ মরিচ তোলা সম্ভব।

কৃষক হাতেম আলীর সঙ্গে মেঠোপথ ধরে কিছুদূর এগোতেই দেখা হয় প্রতাপ চন্দ্র মোদক নামে আরেক কৃষকের সঙ্গে। মরিচের দাম নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বলেন, ‘কাঁচা মরিচের দাম বেশি- এডা লিয়াই (নিয়েই) দেশ সুদ্ধা (দেশজুড়ে) হইচই। কিন্তু দাম কিসোক (কেন) বাড়িছে (বেড়েছে) সেডা (সেটি) কেউই জানব্যার (জানতে) চায় না। হামার ১১ কাঠা জুমিত (জমি) থ্যাকা গত বছর ইঙ্কা (এমন) সময় ৮-১০ দিন পরপর ২০ কেজি করে মরিচ তুলছি। আর ইবার ২০ দিন পরেও দুই কেজির বেশি মরিচ পাওয়া যাচ্ছে না। যান মাঠোত যান। মরিচের গাছগুলা আগে দেখেন। তখন বুঝবেন দাম কিসোক বাড়িচ্ছে।’
হাতেম আলী এবার এক বিঘা জমিতে মরিচের আবাদ করেছেন। তিনি তার ক্ষেতে পাতা কুঁকড়ে যাওয়া মরিচগাছগুলো দেখিয়ে বলেন, ‘আমার এই এক বিঘা জমিতে লাগানো মরিচগাছের মধ্যে ৭০ ভাগেরই পাতা কুঁকড়ে গেছে। সবাই বলছে তাপমাত্রা বেশি হওয়ার কারণে এটা হয়েছে। ৮-১০ দিন পর তিন ধরনের ওষুধ ছিটানোর পরও কোনো লাভ হচ্ছে না। গত বছর যেখানে ৮-১০ দিন পরপর এক মণ করে মরিচ তুলেছিলাম সেখানে এবার ২০ দিন পর ৫ কেজি মরিচও তুলতে পারছি না।’
এর কারণ ও প্রতিকার নিয়ে কৃষি কর্মকর্তারা কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে উজ্জ্বল মোদক নামে এক কৃষক বলেন, ‘এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা রাশেদ সাহেব (মো. রাশিদুন নবী) আমাদের গ্রামে আসেন ঠিকই। কিন্তু তিনি তো ব্যস্ত মাল্টা প্রজেক্ট নিয়ে। মাল্টার ফলন কেমন হচ্ছে, সেটা দেখার জন্য তিনি এই গ্রামে ঘন ঘন এলেও আশপাশের মরিচের ক্ষেতগুলো কখনও পরিদর্শন করেননি কিংবা আমাদের কোনো পরামর্শও দেননি।’
কৃষক হাতেম আলী জানান, কৃষি কর্মকর্তার দেখা না পেয়ে তারা বাজারের কীটনাশক বিক্রেতার শরণাপন্ন হন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতা আমাদের তিন ধরনের ওষুধ দিয়ে সেগুলো প্রয়োগ করতে বলেন।’
উথলি বাজারের কীটনাশক বিক্রেতা মেসার্স প্রিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক পরিমল চন্দ্র সাহা বিষ্ণু জানান, ফসলের কোন ধরনের রোগে কী ওষুধ বা কীটনাশক দিতে হবে সেটি কোম্পানির লোকজন তাদের জানিয়ে দেন। সেই অনুযায়ী তারা কৃষকদের কাছে ওষুধ এবং কীটনাশক বিক্রি করেন।
হাতেম আলীর মরিচের ক্ষেত থেকে ফেরার পথে দেখা মেলে আলোচিত মাল্টা প্রজেক্টের। মোকামতলা-জয়পুরহাট সড়কসংলগ্ন বিশাল মাল্টা বাগানে কথা হয় পরিচর্যাকারী কৃষক শহীদ হাসানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, কৃষি কর্মকর্তারা প্রায়ই ওই বাগানে আসেন। তাদের মধ্যে রাশেদুন নবীই বেশি আসা-যাওয়া করেন। তিনি গত বুধবার এসেছিলেন।
কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফোন করা হয় কৃষি বিভাগের শিবগঞ্জ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাশেদুন নবীকে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি নিয়মিত আমার কর্ম এলাকায় যাই এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিই। আর মাল্টা প্রজেক্টের যে কথা কৃষকরা বলছেন, সেটি সরকারিভাবে নেওয়া একটি প্রকল্প। সেটা দেখভাল করাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’
মরিচগাছগুলো কুঁকড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার তাপমাত্রা বেশি হওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসে যাওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মোছাম্মৎ মোসলেমা খাতুন জানান, তিনিসহ মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তাই নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। মরিচের ফলন কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার তাপমাত্রা বেশি হওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মরিচ আবাদের জন্য উপযোগী। কিন্তু এবার তাপমাত্রা ছিল ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
মাল্টা প্রজেক্ট সম্পর্কে মোসলেমা খাতুন বলেন, ‘এটা আমাদের দপ্তরের লেবু জাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতাধীন একটি কর্মসূচি। ২০১৯ সালে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। মাল্টা চাষে যাতে অন্য কৃষকদের আগ্রহ বাড়ে সেজন্যই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।’