আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৩ ০৯:৫৭ এএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৩ ১০:৪৯ এএম
রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরে বসে থাকা একটি রাম ঘুঘু। ছবি : লেখক
দুর্লভ ও বিরল পাখির সন্ধানে ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ ভোর থেকে হাঁটছি কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে। কিছু পাখির সন্ধান পেলেও কুয়াশার কারণে ওদের ভালো ছবি তুলতে পারছিলাম না। ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করার পরও কুয়াশা কাটল না। তাই টিলা থেকে নিচের দিকে নামতে থাকলাম। এমন সময় হঠাৎ করেই পাশের বড় নাম না জানা গাছটি থেকে লালচে-বাদামি রঙের একটি ঘুঘু সামনের দিকে উড়াল দিল। সঙ্গে সঙ্গেই ক্লিক করলাম। ক্যামেরার মনিটরে রিভিউ করে নতুন প্রজাতির পাখি পেয়ে মন খুশিতে নেচে উঠলেও পরক্ষণেই তা চুপসে গেল। কারণ কুয়াশার জন্য ছবি ভালো হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি সুন্দরবনের পশুর নদী দিয়ে যাওয়ার সময় করমজলের পাশে একই প্রজাতির একটি পাখিকে গাছের মরা ডালে বসে থাকতে দেখলাম। এবার আর মিস হলো না। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আরেকটি রাজশাহীর পদ্মা নদীর এক চরে বসে থাকতে দেখে ক্যামেরায় ক্লিক করলাম। নৌকা ধীরে ধীরে ওর কাছে চলে এলো, কিন্তু সে অবিচল; একটুও নড়ছে না, চুপচাপ বসে আছে। কৌতূহলবশত নিচে নামলাম, ওর একদম কাছে চলে গেলাম। এরপর ও ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। আমরাও ওর পিছু নিলাম। কিছুক্ষণ পর অনেকটা অনিচ্ছায় সে উড়াল দিল। পাশের একটি হালকা ঝোপে গিয়ে নামল, আমি ওর পিছু পিছু কিছুক্ষণ হেঁটে নৌকায় ফেরত এলাম। পাখিটিকে এভাবে পাব কখনও ভাবিনি। ওর কথা আজীবন মনে থাকবে।
লালচে-বাদামি বর্ণের এই ঘুঘু এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি রাম ঘুঘু। কইতর ঘুঘু বা গোলাপ ঘুঘু নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Oriental Turtle Dove ev Rufous Turtle Dove। বৈজ্ঞানিক নাম Streptopelia orientalis। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে ওদের দেখা যায়।
প্রাপ্তবয়স্ক রাম ঘুঘুর দৈর্ঘ্য ৩৩-৩৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৫১-৫৫ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৬৫-২৭৪ গ্রাম। মাথা নীলচে-ধূসর থেকে বাদামি-নীল, তার ওপর থাকে লালচে আভা। মুখমণ্ডলে গোলাপির আভা। ঘাড়-গলা ফ্যাকাশে হলদে থেকে ধূসর-গোলাপি। ঘাড়ের দুপাশে দুটি সাদা-কালো পট্টির মতো থাকে। ডানা-ঢাকনি ও ডানার পালক-ঢাকনির সব কালচে পালকের প্রান্ত লালচে হওয়ায় পিঠে আঁইশের মতো মনে হয়। লেজের প্রান্ত হালকা ধূসর। বুক-পেট ও দেহতল গাঢ় পীতাভ। লেজতল ফ্যাকাশে। চোখের রঙ কমলা। চঞ্চু ফ্যাকাশে নীলচে-গোলাপি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল গোলাপি, নখ নীলচে। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও দেহতল পীতাভ-ধূসর এবং ডানা-ঢাকনি ও ডানার পালক-ঢাকনি ফ্যাকাশে পীতাভ।
রাম ঘুঘু লবণাম্বু বা বাদা (Mangrove) বন, উন্মুক্ত বন, আবাদি জমি ও বাগানে বিচরণ করে। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে থকে। এরা হেঁটে হেঁটে ঘাসবীজ, খাদ্যশস্য, আগাছা, সদ্য গজানো কচিপাতা ইত্যাদি খায়। পুরুষ পাখি গলা ফুলিয়ে ‘ক্রু ক্রু ক্রু ক্রুউ… ’ শব্দে ডাকে।
মে থেকে জুলাই প্রজনন মৌসুম। এ সময় বাঁশবন, চারাগাছ বা ঝোপঝাড়ে কাঠিকুটি দিয়ে ঢিলেঢালা বাসা বানায়। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া ও ছানা লালন-পালনের দায়িত পালন করে। ডিম পাড়ে দুটি। ডিমের রঙ সাদা, যা ফোটে ১৫-১৬ দিনে। ছানারা ১৫-১৭ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-৬ বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ