নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৩ ০৯:৪৮ এএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩ ১০:৫৯ এএম
সব দলের নেতা মিলেমিশে গত দেড় বছরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ম্যানগ্রোভ বন থেকে কেটে নিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি বাইন গাছ; দখল করেছেন ৩০০ একর জমি। প্রবা ফটো
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের একদল নেতা। তারা গত দেড় বছরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ম্যানগ্রোভ বন থেকে কেটে নিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি বাইন গাছ; দখল করেছেন ৩০০ একর জমি। তাদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ ১৯টি মামলা করলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস করে এখনও অব্যাহত রয়েছে মাছের ঘের তৈরির কার্যক্রম। তবে দখলকারীদের দাবি, এসব জমির প্রকৃত মালিক তারাই।
মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নে বঙ্গোপসাগরের কাছে জামিরার খাল এলাকায় এমন দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে। হোয়ানক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ ওয়াহিদ শামীম, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আবদুল মতি, ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি শাহাবুদ্দিন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান এনামুল করিম চৌধুরী, উপজেলা জামায়াতের রুকন কুলু মিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এরশাদুল ইসলামসহ প্রায় অর্ধশত প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে এই দখলদারিত্বের অভিযোগে মামলা করেছে বন বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হোয়ানক ইউনিয়নের কালাগাজীরপাড়া বাজারের পশ্চিম পাশের কাঁচা রাস্তা দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেই অমাবস্যাখালীর বগাচতর চিংড়ি ঘের। সবুজ গাছগাছালিতে ভরপুর এ এলাকার লোকালয় পেরিয়ে গেলে সামনে দেখা মেলে জামিরার খালের মোহনা। তার পশ্চিম প্রান্তে একসময়ের সবুজ ম্যানগ্রোভ বন এখন বিরানভূমি। বাইন গাছগুলোর শ্বাসমূল ছাড়া কিছুই নেই। কোনো কোনো শ্বাসমূলে গজিয়েছে সবুজ পাতা। সেখানে এক্সকাভেটর দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বাঁধ। মো. হোসেন নামে ওই এলাকার একজন লবণ চাষি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত দেড় বছর ধরে এই ঘের নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। প্রভাবশালীদের অনুগত শ্রমিকরা প্রথমে কেরোসিন দিয়ে বাইন গাছে আগুন লাগায়। তারপর করাত দিয়ে কাটা হয় সব গাছ।

কারা এই প্রভাবশালী এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এরশাদ জমিদার (এরশাদুল ইসলাম, যিনি এলাকায় জমিদার বলে পরিচিত) ও আরও অনেকেই দখল করেছেন। তাদের দখলেই এসব খাল-বন। বন বিভাগের তথ্যমতে, অমাবস্যাখালী এলাকায় ছিল কমপক্ষে ১৫ হাজার বাইন গাছ। মহেশখালীর শাপলাপুর, কুতুবজোমের সোনাদিয়া ও ঘটিভাঙ্গা, ধলঘাটার হাঁসেরচর, হোয়ানকের অমাবস্যাখালী ও মাতারবাড়ীর চারপাশে ২৫ হাজার একর চরে ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই প্যারাবন গড়ে তোলা হয়।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, অমাবস্যাখালী মৌজার পশ্চিমে ৩০০ একর ম্যানগ্রোভ বনের ১৫ হাজার গাছ কেটে ঘের নির্মাণের ঘটনায় মহেশখালী উপকূলীয় রেঞ্জের ঝাপুয়ার বিট কর্মকর্তা এইচএম মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে থানায় তিনটি মামলা করেন। এ ছাড়া বন আদালতে আরও ১৬টি মামলা করে বন বিভাগ। এসব মামলায় ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে ২২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। মামলার পর কোনো আসামি গ্রেপ্তার হননি। এরই মধ্যে অনেকে আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে দখল অব্যাহত রেখেছেন।
মামলার আসামি
স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের মামলার নথি অনুযায়ী, দখলবাজিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হোয়ানক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ ওয়াহিদ শামীম, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আবদুল মতি, ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি শাহাবুদ্দিন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান এনামুল করিম চৌধুরী, উপজেলা জামায়াতের রুকন কুলু মিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এরশাদুল ইসলাম। তারা বিভিন্ন মামলার আসামি। তা ছাড়া আসামির তালিকায় আছেন মোহাম্মদ সিকদার, আবদুস ছালাম, সোমলত মাহমুদ কলি, মোহাম্মদ আমিন, শাহাদাত কবির শাহাদাত, নাজেম উদ্দীন নাজু, ছদর আমিন, ইসহাক, পেঠান আলী, আব্দুল জব্বার, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আবদুল করিম, আমির হোসেন, আকতার হামিদ, মারুফুল হক, সাইফুল ইসলাম, মকসুদ, জাকির হোসেন, মোহাম্মদ আলম, তারেকুল ইসলাম, আহসান উল্লাহ, মোহাম্মদ বেলাল, আনছার উল্লাহ, জসিম উদ্দিন, কফিল উদ্দিন, ইমরুল কায়েস মানিক, মনু মিয়া, মুজিবুল হক, জিয়াবুল হক, তৌহিদুল ইসলাম, রুহুল কাদের বাদশা, শহিদুল ইসলাম সোহেল, এমদাদুল ইসলাম রাসেল, রুবেল, মোস্তাক আহমদ, রফিক উদ্দিন, শাহ নেওয়াজ রুবেল, আতাহার উদ্দিন, মোস্তফা কালাম বকুল, রমিজ উদ্দিন বাদশা, ওবাইদুল হোসেন, হাজী আব্দুস শুক্কুর ও রহমত আলী। তারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফিরোজ ওয়াহিদ শামীম, শাহাব উদ্দিন, এনামুল করিম চৌধুরী ও এরশাদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান। অভিযোগের বিষয়ে তারা জানান, এ ঘটনায় মামলা চলমান রয়েছে। মামলা শেষে জানা যাবেÑ এটা দখল নাকি জমির প্রকৃত মালিক তারা।
চট্টগ্রামের উপকূলীয় বিভাগের বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, ‘ভূমিদস্যুরা স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য। তারা প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ ১৯টি মামলা করলেও কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা দুই দফা অভিযান চালিয়ে বাঁধ কেটে দিয়েছিলাম। নতুন করে দখল হলে পুনরায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।’ তা ছাড়া জায়গাটা দুর্গম হওয়ায় অভিযান চালানো দুরূহ দাবি করে তিনি বলেন, বাঁধ অপসারণের জন্য এক্সকাভেটর দরকার। কিন্তু কক্সবাজারের কেউ বন বিভাগকে এক্সকাভেটর ভাড়া দেয় না। চট্টগ্রাম থেকে এক্সকাভেটর নেওয়ার খরচ অনেক বেশি। এসব কারণে অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া যায় না। তিনি বন রক্ষার উপায় বলতে পারেননি।
বন রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন জরুরি বলে মত দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড় থেকে মানুষকে যেমন বাঁচায় তেমনি ভাঙন থেকেও রক্ষা করে। বন নিধন ঠেকাতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন জরুরি।’