× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ধানের ভালো ফলনেও মলিন কৃষকের মুখ

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৩ ১৩:০৫ পিএম

এক সপ্তাহের মধ্যে হাওরের ৯৮ ভাগ ধান কাটা হবে। এরপরও কৃষকের মুখে হাসি নেই। প্রবা ফটো

এক সপ্তাহের মধ্যে হাওরের ৯৮ ভাগ ধান কাটা হবে। এরপরও কৃষকের মুখে হাসি নেই। প্রবা ফটো

কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো মৌসুমে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন চলছে ধান কাটার মৌসুম। কাটা হয়েছে এখানকার কৃষকদের ৭৭ ভাগ ধান। আর এক সপ্তাহের মধ্যে হাওরের ৯৮ ভাগ ধান কাটা হবে। এরপরও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধান কাটাতে শ্রমিককে দিতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ভালো নেই ধানের বাজার। উৎপাদন খরচ না ওঠায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। 

রবিবার (৩০ এপ্রিল)  সরেজমিনে হাওরের প্রধান পাইকারি বাজার চামড়া নৌ-বন্দরসহ বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন ধান কেনাবেচা হচ্ছে। নতুন বোরো ধান প্রতি মণ (৪০ কেজি) ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুরুতে ধান ৭৬০ থেকে ৮৬০ টাকা ছিল। তবে এখন প্রতিদিন ধানের দাম মণে ২০/২৫ টাকা করে কমছে।

অথচ এক মণ ধান উৎপাদন করতে তাদের অন্তত ১ হাজার ২০ টাকা খরচ হয়েছে। ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকদের বুকে চাপা কান্না, তারা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সাধারণত ধান বিক্রি করেন। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

একাধিক কৃষক জানান, এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এ বছর ধানের দাম না থাকায় চরম হতাশায় পড়েছেন কৃষক। বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচ উঠছে না তাদের। সুদ ও লগ্নির টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন এ নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন কৃষকরা। হাওরের বিভিন্ন বাজারে নতুন বোরো ধান সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় বর্তমানে এক মণ ধান বিক্রির টাকায় এক কেজি মাংস কেনা যাচ্ছে না। বর্তমানে নিকলী উপজেলার সদর বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে এক কেজি খাসির মাংস ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এক মণ বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে ৭২০ থেকে ৮০০ টাকায়। 

নিকলীর আলিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক জহিরুল ইসলাম বলেন, এভাবে কি আর সংসার করা যায়? এক মণ ধানে এক কেজি মাংস পাওয়া যায় না। ধান বেচে কামলা খরচ আর মানুষের ঋণ দিতে দিতেই টাকা শেষ। 

মিঠামইনের ঢাকি গ্রামের ফরহাদ মিয়া বলেন, অনেক দিন ধরে ছেলেমেয়েদের মুখে খাসির মাংস দিতে পারিনি। গত শুক্রবার জুমার দিন সকালে এক মণ সরস বোরো ধান ৮০০ টাকায় বিক্রি করে বাজারে গিয়ে দেখি এক কেজি খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়। বাধ্য হয়ে মাংস না নিয়ে খালি হাতেই বাড়িতে ফিরে আসি।

ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক লতিফ শেখ জানান, তার তিন একর জমিতে ২৪০ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। সার, কীটনাশক, সেচ ও অন্যান্য খরচ নিয়ে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২০ টাকার বেশি। বর্তমান বাজার মূল্যে ধান বিক্রি করে তার কয়েক হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। একই কথা বললেন ইটনা উপজেলার শিমুলবাগ গ্রামের কৃষক রশিদ মিয়া, বড়হাটি গ্রামের বাদল মিয়া, মিঠামইন উপজেলার গোপদীঘি গ্রামের মোতালিব মিয়া। 

হাওর উপজেলা মিঠামইনের চারিগ্রামের আমজাদ হোসেন জানান, এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় ফলন আশাতীত হয়েছে। তার ৩ একর জমিতে ৩০০ মণ ধানের ফলন হয়েছে। তবে এবার বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য নেই। উৎপাদন ব্যয় এ বছর কিছুটা বেশি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। 

অষ্টগ্রাম উপজেলার পূর্ব অষ্টগ্রামের রঞ্জিত চন্দ্র জানান, এবার ব্রি-২৮ মার খাওয়ায় কিছু মানুষের সর্বনাশ হয়েছে। তবে সার্বিক বিচারে এবারের বোরোর বাম্পার ফলন আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছে হাওরবাসী। এরপরও ধানের দাম খুব কম হওয়ায় অভিশাপ নেমে এসেছে কৃষকের ভাগ্যে। একফসলি জমির ওপর নির্ভরশীল কৃষক দাদনের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন না। সরকার উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না, এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। উপযুক্ত মূল্য না পেলে কৃষকদের পথে বসতে হবে। তিনি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। 

কিশোরগঞ্জ বড় বাজারের ব্যবসায়ী মো. আঞ্জু মিয়া বলেন, বৈশাখের শুরুতে কৃষক আর্থিক অনটনে থাকে। বিশেষ করে হাওরের কৃষকদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে তারা ধান কেটে মাড়াই করে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়।এই সুযোগটি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা লুফে নিয়ে পানির দরে ধান কিনে নেন। ফলে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। আজ বাজারে ধানের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৮২০ টাকা।

চামড়াঘাট মোকামের ধান ব্যবসায়ী হান্নান মিয়া বলেন, নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে হাওরের কৃষক ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কাটা-মাড়াইয়ের পর সে ধান শতভাগ শুকনো থাকে না। ফলে ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কেনে। শতভাগ শুকনো ধান শুরুর সময় পাওয়া কঠিন। এ সময় বাধ্য হয়ে কৃষক ও বর্গাচাষিরা ধান বাজারে নিয়ে এসেছে এটা ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা সহজেই বুঝে যান। ফলে তারা কম দামে ধান কেনে। কৃষকও বাধ্য হয় ধান বিক্রি করে দিতে। তাই কৃষকের উৎপাদন খরচ ওঠে না। তবে অপেক্ষা করলে কৃষক তিন-চার মাস পরে এই ধান ১২০০/১৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারবে।

এবার সারা জেলায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কৃষান-কৃষানি থেকে শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ রাজনীতিবিদরাও ধান কাটা উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। হাওর ও নদীর পাড়ে অস্থায়ী ঘর (বাথান) নির্মাণ করে দিন-রাত কৃষিশ্রমিকরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ করছেন।

হাওরের কৃষকরা জানান, এবার বৈশাখে বৃষ্টিপাত তেমন না হওয়ায় কৃষকদের ধান মাড়াই ও শুকাতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। এবার তারা ১০০ ভাগ ধান গোলায় তুলবেন বলে জানান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আবদুস সাত্তার গোটা হাওর এলাকা ঘুরে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বাম্পার ফলনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন এবার ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা চালের হিসেবে ৭ লাখ মেট্রিক টন। এবার লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে বলে তিনি জানান। 

এই কর্মকর্তা বলেন, তবে, ন্যায্যমূল্য না পেলে সার্বিক বাম্পার ফলন আর্থিকভাবে কৃষকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সরকার ন্যায্যমূল্য পরিশোধ করতে বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কীভাবে ধান কেনা যায় তা নিয়ে আমরা ভাবছি। প্রয়োজনে সরকারের কাছে পরিকল্পিত প্রস্তাব রাখার কথাও ভেবে দেখা হচ্ছে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা