গোপালগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৩ ২১:২৭ পিএম
আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৩ ২১:৫০ পিএম
বোরো ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে ব্লাস্ট রোগ। ছবি : সংগৃহীত
গোপালগঞ্জে বোরো ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে ব্লাস্ট রোগ। এতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জমির ধান। বিশেষ করে উফসি-২৮ জাতের ধানে এ রোগ আক্রমণ করেছে বেশি। রোগের প্রভাবে ধান চিটা হওয়ায় অর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। সেই সঙ্গে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করতে না পারলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
বোরো মৌসুমে এ বছর গোপালগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। তবে সরু চাল ও খেতে সুস্বাদু হওয়ায় কৃষকেরা হাইব্রিড জাতের পাশাপাশি উফসি-২৮ জাতের বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কিন্তু জেলার ব্লাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
সোমবার (৩ এপ্রিল) বিকালে সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জমিতে উফসি-২৮ জাতের ধানের শীষ আসার সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে গিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ইঁদুর গাছের গোড়া কেটে দেওয়ায় নষ্ট হচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার কৃষক। তাদের অনেকে ধার-দেনা করে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। ফসল নষ্ট হওয়ায় তা শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। তা ছাড়া সারা বছর খাদ্যের জোগান নিয়েও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ৫৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর, উফসি জাতের ২২ হাজার ২০০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩০৭ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ধান নষ্ট হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে কৃষি বিভাগ।
সদর উপজেলার বোড়াশী গ্রামের কৃষক ফোরকান মোল্লা জানান, এ বছর তিনি সোয়া তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে হাইব্রিডের পাশাপাশি উফসি-২৮ জাতও রয়েছে। কিন্তু এসব গাছে ব্লাস্ট রোগ হওয়ায় ধান চিটা হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে ইঁদুর গোড়া কেটে দিয়েছে। ফলে তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই গ্রামের কৃষক রেজাউল করিম দাঁড়িয়া বলেন, ’২৮ জাতের বোরো ধানের গাছে শীষ আসার পর ফুলে উঠলে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব জমি থেকে এক ছটাকও ধান ঘরে তোলা যাবে না। কিন্তু ধান গাছ রোগে আক্রান্ত হলেও কৃষি কর্মকর্তারা কোনো ধরনের পরামর্শ দেয়নি। ফলে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।’
নূর আলম মোল্লা নামে একজন কৃষক বলেন, ’যে ডিলারের কাছ থেকে ধান বীজ কিনেছি, ভালো না খারাপ তারা কিছুই জানায়নি। বীজ খারাপ হওয়ায় ধান ফোলার পর রোগে আক্রান্ত হয়ে তা নষ্ট হয়ে চিটা হয়ে গেছে। কৃষি বিভাগ পরামর্শ দিয়ে কোনো উপকার করতে পারবে না। এখন সরকার যদি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা না করে, তাহলে আমাদের পথে বসতে হবে।’
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি গ্রামের কৃষক মোহাব্বত আলী বলেন, ’এ বছর দুই বিঘা জমিতে বোরো-২৮ জাতের ধান রোপণ করেছি। ধানের শীষ আসার সঙ্গে সঙ্গে তা পুড়ে গিয়ে চিটা হয়ে গেছে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারব না। সারা বছর কী খেয়ে বাঁচব, সেই চিন্তায় আছি।’
জানতে চাইলে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাদের সরদার বলেন, ’এ বছর জেলায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। বেশির ভাগ হাইব্রিড ধানের আবাদ হলেও উফসি জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে। বোরো-২৮ জাতের ধান গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এ জাতের গাছ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ব্লাস্ট রোগে জমির ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। রোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কৃষকদের ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ’ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ নিরূপণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। সেখান থেকে সরকারের উচ্চমহলে পাঠানো হবে। এরপর কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা করলে তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেওয়া হবে।’