রাজশাহী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৩ ১১:০৫ এএম
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৩ ১১:১৭ এএম
তানোরে জমিতে সেচের জন্য একমাত্র ভরসা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ। প্রবা ফটো
খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর তানোরের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। এখানে জমিতে সেচের জন্য একমাত্র ভরসা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ। এ ছাড়া অনেকে নিজ উদ্যোগেও বসিয়েছেন গভীর ও অগভীর নলকূপ।
বিএমডিএ এসব গভীর নলকূপ অপারেটর (ডিপ অপারেটর) নিয়োগের মাধ্যমে পরিচালনা করে থাকে, যারা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ পান বলে জানা গেছে। নিয়োগ পেয়েই তারা নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা। টাকা না দিলে জমিতে সেচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে কৃষকরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অপারেটর নিয়োগ পেতে লাগে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। আর নিয়োগের পর অসহায় কৃষকদের থেকে সেই টাকা নানা কায়দায় আদায় করে নেওয়া হয়। একে তো সারের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে, সুযোগ বুঝে সার ডিলাররাও আদায় করছে উপরি। তার ওপর জমিতে সেচ দিতে অপারেটরদের দিতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
তবে জমিতে সেচ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় কেউ প্রতিবাদ করতে পারছেন না। আবার এসব নিয়ে কৃষকরা প্রতিবাদ করলে যদি জমিতে নানা কায়দায় সেচ বন্ধ করে ফসলের ক্ষতি করা হয়-- এই ভয়ে কেউ প্রতিবাদও করতে সাহস পান না। পরিস্থিতি বিবেচনায় জমিতে ফসল ফলাতে গিয়ে কৃষকদের এখন জিম্মি দশা।
কৃষকদের দাবি-- পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, জমি কৃষকদের আর রাজত্ব অপারেটরদের। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিপ অপারেটররা।
বিএমডিএ ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, তানোর উপজেলায় বিএমডিএর আওতায় গভীর নলকূপ রয়েছে ৫৩৬টি আর ব্যক্তিমালিকানায় রয়েছে ১৬টি। এ ছাড়াও রয়েছে অগভীর বিদ্যুৎচালিত ৪১১টি, অগভীর ডিজেলচালিত ৫০টি, এলএলপি বিদ্যুৎচালিত ৩টি, এলএলপি ডিজেলচালিত ৩৫০টি। সব মিলিয়ে সেচপাম্পের সংখ্যা ১ হাজার ৩৬৬টি।
উপজেলায় আবাদযোগ্য কৃষিজমি রয়েছে ২৩ হাজার ৯৯৩ হেক্টর। এর মধ্যে সেচের আওতায় ২২ হাজার ৩৩২ হেক্টর। সেচবহির্ভূত জমি রয়েছে ১ হাজার ৬৬২ হেক্টর। এক ফসলি জমি ৩৪৪ হেক্টর। দুই ফসলি ৪ হাজার ৫৪০ হেক্টর। তিন ফসলি ১৯ হাজার ১০৯ হেক্টর। নিট ফসলি জমি ২৩ হাজার ৯৯৩ হেক্টর, মোট ফসলি জমি ৬৬ হাজার ৭৫১ হেক্টর। ভূমি ব্যবহার হচ্ছে ৮২ শতাংশ। উঁচু জমি ২০ হাজার ৩৮৬ হেক্টর, মাঝারি উঁচু জমি ১ হাজার ৫৭৮ হেক্টর, মাঝারি নিচু জমি ১ হাজার ৫৫৩ হেক্টর, নিচু জমি রয়েছে ৪৭৬ হেক্টর।
তানোরের তালোন্দ ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের কৃষক মইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বিএমডিএতে গভীর নলকূপের অপারেটর নিয়োগ হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। যে যখন ক্ষমতায় থাকে তার নেতৃত্বে গভীর নলকূপ নিয়ে চলে বেপরোয়া বাণিজ্য। ডিপ অপারেটররা কৃষকদের বাধ্য করে তাদের জমি অপারেটরদের লিজ দিতে। নয়তো জমিতে সেচ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে নানা সময় অভিযোগের পরেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। অপারেটররা জানেন এটি লাভজন পেশা। এজন্য তারা টাকা দিয়ে হলেও এই পদ নিয়ে থাকেন। এই পদ পান স্থানীয় প্রভাবশালী দলের কোনো নেতা, নয়তো তার সহযোগী।
কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, সরকার সেচে প্রচুর ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে অপারেটরদের দুর্নীতির কারণে এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। যেসব গভীর নলকূপের আওতায় আলুর প্রজেক্ট হয়, সেসব গভীর নলকূপের অপারেটররা কৃষকের জমি লিজ দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হাতিয়ে নেন।
কৃষকরা অভিযোগ করেন, একটি গভীর নলকূপের আওতায় ১০০ থেকে ৩০০ বিঘা জমি থাকে। এসব জমির মালিককে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয় অপারেটরের সঙ্গে। প্রতি বিঘা লিজ হয় ১৪-১৫ হাজার টাকায়। অপারেটর এসব জমি নিজে লিজ নিয়ে জমির মালিককে দেন ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা।
প্রতিবাদ করলে লিজ না নিয়ে জমি চাষ করতে বলেন। আর চাষ করতে গেলে সেচ নানা কায়দায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর বাইরেও কখনও ট্রান্সফর্মার কিংবা মোটর বা ড্রেনের দোহাই দিয়ে আদায় করা হয় অর্থ।
পাচন্দর ইউনিয়নের ডিপ অপারেটর দুরুল হুদা বলেন, কৃষকরা বলে অনেক কথাই। তবে সব অভিযোগ সত্য নয়।
বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান জানান, গভীর নলকূপে প্রকারভেদে ঘণ্টাপ্রতি ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো অপারেটর সেচের বাড়তি টাকা নিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্য কৃষকদের সচেতন হতে হবে। কারণ সরকার সেচে ভর্তুকি দিচ্ছে। আর কেউ বেশি নেবেন, তা বরদাশত করা হবে না।