বিশ্ব জলাভূমি দিবস
আমিনুল ইসলাম মিঠু
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:০২ এএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১১:১৯ এএম
উজানের পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ যাতে আগামীতে পানি সংকটে না পড়ে, তার জন্য বর্তমান সরকার টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১০০ বছর মেয়াদের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান-২১০০) গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনায় অভিন্ন নদনদীর পানির পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জলাভূমিকে। এ পরিকল্পনায় ৯টি জলাশয় রয়েছে। এজন্য হাওর ও জলাধার উন্নয়ন বোর্ড থেকে অধিদপ্তরও করা হয়েছে; গঠন করা হয়েছে জাতীয় কমিটি। এসব আয়োজন থাকা সত্ত্বেও জলাভূমি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে নেই কার্যকর পদক্ষেপ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ভূমির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিন ভাগের দুই ভাগ প্লাবনভূমি (নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ইত্যাদি)। দেশের ৬৭ শতাংশ জমি বর্ষায় প্লাবিত হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে এ ভূমিতেই ফসল আবাদ হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণের নামে নিচু জমি ভরাট করে তৈরি হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অঞ্চল। প্রাণবৈচিত্র্যের বিষয়টি মাথায় না রেখে কেবল ভূমি ভরাট করে দেশের উন্নয়ন করতে গিয়ে উল্টো ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্য উৎপাদন। বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে পানি আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছিল। আইনটির মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। পানি আইনে বলা আছে—দেশের কোন জেলায় কতটুকু খাল, বিল বা জলাশয় আছে তা চিহ্নিত করতে হবে জেলা প্রশাসকদের। তাই জেলাভিত্তিক পানি কমিটির প্রধান থাকবেন জেলা প্রশাসক। ২০১৩ সালে আইন হলেও এখনও গঠন হয়নি জেলা কমিটি। ফলে দেশের জলাধার সংরক্ষণে সব কার্যক্রম কাগজকলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এমন অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জলাভূমি দিবস।
জলাভূমি রক্ষার বিষয়ে রিভার ও ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোন জেলায় কতটুকু জলাভূমি, খাল, হাওর রয়েছে তা চিহ্নিত করতে হবে জেলা প্রশাসকদের। অনেক জেলা প্রশাসক হয়তো জানেনই না এ কমিটির নাম কী বা কাজ কী। নদী বা জলাভূমি সংরক্ষণের বিষয়টিতে আগামী ১০০ বছরের পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এখনই যদি উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে জলাভূমি সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন তো হবেই না, বরং অস্তিত্ব সংকটে পড়বে আগামী দিনের পানি ব্যবস্থাপনা।’
জলাভূমি পুনরুদ্ধারে পাউবো কিছু প্রকল্প নিলেও হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর এখনও কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের অধিদপ্তরটি এখনও নতুন, জনবলও নিয়োগ হয়নি। তবে প্রক্রিয়া চলছে, এরপর কাজ শুরু হবে।’
হাওর ও জলাভূমি উন্নয়নে জাতীয় কমিটিতে পানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতকে মনোনীত করে সরকার। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাভূমি সংরক্ষণের কাজ করে না, বরং উল্টোটা করে; নদী বন্ধ করে দেয়, বেড়িবাঁধ বানায়, স্লুইসগেট, রাবার ড্যাম বানায়। জলাভূমি প্রাকৃতিক সম্পদ। এটা সংরক্ষণে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
জাতীয় কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জলাভূমি মানে মাছ, হিজল-করচের বন, নৌ-চলাচল। জলাভূমি বলতে নদীও বোঝায়। তাই তাদের কাজ সংরক্ষণ হওয়া উচিত। তো এ কাজটি যদি জাতীয় কমিটির গাইড করার কথা থাকে, তার তো মিটিং হয় না। আমি কবে সদস্য হয়েছিলাম তা-ও আমার মনে নেই। মূল কথা হচ্ছে, জলাভূমি সংরক্ষণ জাতীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নিয়ামুল নাসের বলেন, ‘সারা দেশে জেলা পর্যায়ের কমিটি কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প পরিকল্পনা এবং তহবিল গঠনও প্রয়োজন। এতে কমিটিগুলোকে কার্যকর করা যাবে।’
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ান বলেন, ‘গেল বছর বাংলাদেশে ৬৭ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। এ বছরও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে পারে। দেশে সুপেয় পানির সংকট এমনিতেই আছে। পানির দেশ হওয়া সত্ত্বেও উচ্চমূল্য দিয়ে এ দেশের মানুষকে পানি কিনে খেতে হয়। এখন যদি বৃষ্টিপাত কম হয় তবে জলাভূমিগুলোও পানিশূন্য থাকবে। সে ক্ষেত্রে জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের নিরাপদ পানি এবং খাদ্য নিরাপত্তাও অনিশ্চয়তায় পড়বে।’