মোস্তাফিজুর রহমান, কয়রা (খুলনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:২২ পিএম
আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৬ পিএম
মহারাজপুর বিলের মাঠে চলছে তরমুজ চাষের প্রস্তুতি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শীতের হিমেল হাওয়া আর লবণাক্ত মাটির কঠিন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার মাঠে মাঠে এখন একটাই ব্যস্ততা—তরমুজ। চোখ যতদূর যায়, বিস্তীর্ণ বিলে শুধু সবুজ স্বপ্নের আভাস।
কোথাও বীজতলা প্রস্তুত হচ্ছে, কোথাও মাদা তৈরি করে বীজ রোপণ করছেন নারী-পুরুষ শ্রমিকরা, আবার কোথাও সেচযন্ত্রের সাহায্যে জমিতে পানি ছিটানো হচ্ছে। নোনা জমিতে যেন নতুন করে আশার বীজ বুনছেন উপকূলের কৃষকেরা।
একসময় আমন ধান কাটার পর কয়রার বিস্তীর্ণ এলাকা পড়ে থাকত অনাবাদি। শুষ্ক মৌসুম এলেই মাটির লবণাক্ততা বেড়ে যেত, চাষাবাদের সাহস পেতেন না কেউ।
সেই পতিত জমিগুলোই এখন বদলে গেছে লাভের খেতে। অল্প সময়ে কম খরচে বেশি লাভ—এই সমীকরণেই কৃষকদের ভরসার ফসল হয়ে উঠেছে লবণসহিষ্ণু তরমুজ।
সম্প্রতি মহারাজপুর, মহেশ্বরীপুর, আমাদী, চণ্ডীপুর, খিরোল, কিনুকাটি, হরিনগরসহ কয়রার অন্তত ১৫টি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। বিলের পর বিল জুড়ে চলছে তরমুজ চাষের প্রস্তুতি।
কোথাও সদ্য বীজ রোপণ শেষ হয়েছে, কোথাও আবার নিয়মিত পানি দেওয়া হচ্ছে। দূরের খাল বা পুকুরের জমা পানি সেচযন্ত্রে এনে পাইপের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খেতে। মৌসুমি শ্রমিকদের ব্যস্ততায় যেন দম ফেলার সময় নেই।
হরিনগর বিলের এক খেতে বীজ রোপণের কাজ করতে করতে কথা হয় মিনাক্ষি মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, “সারাদিন ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতিছি। তরমুজের সময় আইলেই কাজের অভাব থাকে না। ঘরের কাজ শেষ কইরাও আমরা এই মৌসুমে ভালো আয় করতে পারি।”
তরমুজ চাষ শুধু জমির চেহারা বদলায়নি, বদলে দিয়েছে উপকূলের নারীদের আয়-রোজগারের সুযোগও।
আমাদী গ্রামের কৃষক আবিয়ার গাজী জানান, গত বছর তরমুজ চাষে অভাবনীয় লাভ হয়েছে।
“কিছু কৃষক বিঘা প্রতি লাখ টাকার বেশি লাভ করছিল। সেই কারণে এবার সবাই তরমুজের দিকেই ঝুঁকছে। আমি নিজেও ৩০ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। খরচ এবার একটু বেশি, তারপরও আশায় আছি,” বলেন তিনি।
কয়রা উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হলেও চলতি বছর সেই রেকর্ড ভেঙেছে। বিশেষ করে যেসব বিলে আগে বছরে একবার ফসল হতো, সেসব জমিতেও এবার প্রথমবারের মতো তরমুজ চাষ হচ্ছে।
ধানের সঙ্গে তুলনা করলে তরমুজের লাভের অঙ্ক আরও স্পষ্ট। ধান চাষে যেখানে পাঁচ মাস সময় লেগে যায় এবং বিঘাপ্রতি লাভ থাকে সর্বোচ্চ ৮–৯ হাজার টাকা, সেখানে তরমুজে সময় লাগে আড়াই মাসের মতো। খরচ ২০–২৫ হাজার টাকা হলেও বিক্রি হয় ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ভাগ্য ভালো হলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।
মহারাজপুর এলাকার বিলে এবার প্রথমবার ১২০ একর জমিতে তরমুজ চাষ হচ্ছে। নতুন কৃষকদের একজন মোশারফ হোসেন বলেন, “আমনের পর এই বিল পড়ে থাকত। তরমুজ লাভজনক হওয়ায় এবার ঝুঁকি নিছি। আমাদের মতো নতুন কৃষকই এই বিলে বেশি।”
কয়রা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গুরু দাশ মণ্ডল জানান, লবণাক্ততার কারণে একসময় কয়রায় শুধু আমন ধানই ভরসা ছিল। তিনি বলেন, “গত তিন বছরে লবণসহিষ্ণু তরমুজ চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কম বিনিয়োগে বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার উৎপাদন ভালো হবে।”
নোনা মাটিতে যেখানে একসময় ছিল হতাশা, সেখানে এখন জন্ম নিচ্ছে সবুজ স্বপ্ন। তরমুজ শুধু একটি ফসল নয়, উপকূলের কয়রায় এটি হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার নাম—জীবন বদলে দেওয়ার এক নতুন গল্প।