এহসানুল হক সুমন, রংপুর
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৩ এএম
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:১৯ পিএম
তিস্তা নদীর রেলসেতু এলাকায় দেখা মিলল শঙ্খচিলের। প্রবা ফটো
‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে-এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে।’ রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় ধানসিঁড়ি নদীর তীরে এসেছে শঙ্খচিলের নাম। আকাশ, বাতাস, দিগন্তে ছুটে চলা শঙ্খচিল এখন শান্তি খুঁজে পেয়েছে তিস্তার বুকে। হেমন্তের নীল আকাশ আর শীর্ণ নদীর ঢেউয়ের তীরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে এ পাখিকে। তার বরফধোয়া সাদা মাথা আর বুক। আকাশের বুকজুড়ে আঁকা আগুন রেখার মতো খয়েরি ডানা তার।
উজানের পাহাড়ি ঢল না থাকায় তিস্তা নদীর পানি কমে এসেছে। জেগে উঠেছে ছোট-বড় চর। এতে তিস্তা নদীর পানি জমে আছে। সেই স্বচ্ছ পানিতে জলজ প্রাণী, ছোট-বড় মাছের খেলা দেখা যায়। গত সপ্তাহে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ তিস্তা নদী দেখতে গিয়ে রেলসেতু এলাকায় দেখা পান শঙ্খচিলের। হাতে থাকা ক্যামেরায় তুলে নেন পাখিটির কয়েকটি ছবি।
ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, কবি-সাহিত্যকরা বাংলার প্রকৃতির রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে শঙ্খচিলের নাম বারবার উচ্চারণ করেছেন। আমি তিস্তা নদী এলাকা ঘুরতে ঘুরতে রেলসেতুর কাছে শঙ্খচিল দেখতে পাই। ক্যামেরায় ধারণ করা কয়েকটি ছবি দেখে আমি নিজেই মুগ্ধ হই। আকৃতি, রঙসহ অতীব সুন্দর শঙ্খচিল। এটি আমাদের দেশের আবাসিক পাখি। তবে শঙ্খচিলসহ সব পাখিরই আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। ফলে তারা আস্তে আস্তে বিপন্নের দিকে যাচ্ছে। এখনই উচিত পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা।
শঙ্খচিল দেশের অতি সুপরিচিত পাখি। এটি বাংলাদেশ ভারত ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় পাখিটি বেশ পরিচিত। এ পাখির দৈর্ঘ্য ৭৬ থেকে ৮৪ সেন্টিমিটার। শঙ্খের মতো সাদা এদের মাথা, ঘাড়, বুক। পেটের তলার পালক যার ওপর মরচে ধরা খাড়া ছোট রেখা থাকে। পালক কালো, ঠোঁট ছোট, লেজ সব সময় গোলাকার ডগাযুক্ত। ডানা দুটি ও শরীরের অন্যান্য অংশ খয়েরি। পা হলুদ। শঙ্খচিল জীবিত মাছ এবং জলজ প্রাণী খেয়ে জীবন ধারণ করে। ছোট সাপ, হাঁস-মুরগির বাচ্চা এদের প্রিয় খাদ্য।
দক্ষিণ এশিয়ার শঙ্খচিলের প্রজনন ঋতু ডিসেম্বর এপ্রিল হলেও দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়াতে আগস্ট-অক্টোবর এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতে এপ্রিল-জুন মাস হয়ে থাকে। শঙ্খচিল ছোট ছোট ডাল ও শুকনো পাতা দিয়ে উঁচুস্থানে বাসা বাঁধে। একই বাসা তারা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। বাসায় শঙ্খচিল দুটি করে ডিম দেয়। শুধু স্ত্রী পাখি ডিমে তা দেয়। ২৬ থেকে ২৯ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এরা বড় বড় জলাশয়ের পাশে, সুন্দরবনে ঝাঁকে বাস করে। তারা ডানা মেলে শূন্যে ভেসে থাকে দীর্ঘক্ষণ।
সামাজিক বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা স্মৃতি সিংহ রায় বলেন, শীত অনুভূত হওয়ার পর থেকে তিস্তা নদীতে নানা প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি আসতে শুরু করেছে। এসব পাখিদের নিরাপদ বিচরণের জন্য সামাজিক বন বিভাগ কাজ করছে। আমরা পাখি শিকার বন্ধ করতে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ করে যাচ্ছি।