যশোর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১৬:৩০ পিএম
আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১৯:০০ পিএম
নিজের খামারে কেঁচো হাতে উদ্যোক্তা সেতু। ছবি : প্রবা
যশোরের কেশবপুরের বেকার যুবক শেখ মুহাইমিনুল ইসলাম সেতু। ২৮ বছর বয়সি সেতু উপজেলার ২ নম্বর সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের চিংড়া গ্রামের কৃষক শেখ তছলিম উদ্দীনের ছেলে।
নিজের ভাগ্য বদলাতে সেতু শুরু করেন কেঁচো চাষ। সেই চাষের কেঁচো বিক্রি করেই এখন লাখপতি সেতু। ৫ কেজি কেঁচো নিয়ে কেঁচো সার তৈরির মাধ্যমে শুরু হয় তার পথচলা। এখন সেতুর খামারে প্রায় ১০ মণ কেঁচো রয়েছে। এসব কেঁচো ও কেঁচো থেকে উৎপাদিত সার বিক্রি করে প্রতি মাসে তিনি আয় করছেন লাখ টাকা।
সেতুর উৎপাদিত কেঁচো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তা।
সেতুর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেকার অবস্থায় তিনি স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে ৫ কেজি বিদেশি (থাইল্যান্ডের) কেঁচো সংগ্রহ করে ২০১৩ সালে তা থেকে সার তৈরির উদ্যোগ নেন। পরে ২০২০ সালে ‘চিংড়া ভার্মি কমপোস্ট’ নামে কেঁচো ও সার উৎপাদনের একটি খামার তৈরি করেন। সেখানে ৩৫টি হাউসে তিনি গোবর ও কেঁচোর সমন্বয়ে কেঁচো সার তৈরি করেন।
রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে কৃষকেরা ফসলের খেতে কেঁচো সার ব্যবহারে ঝুঁকতে থাকায় তার খামারের উৎপাদিত কেঁচো এবং কেঁচো সারের চাহিদা ব্যাপকহারে বাড়তে শুরু করে। খামারিরা বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার তৈরি করতে সেতুর খামারের কেঁচো কিনতে শুরু করেন।
শেখ মুহাইমিনুল ইসলাম সেতু বলেন, ‘প্রথমে খামারে ১২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের পৃথক ৩৫টি হাউসে ১০ বস্তা করে গোবর ও ১০ কেজি করে কেঁচো মিশিয়ে দেন। এসব কেঁচো গোবর খেয়ে মলত্যাগ করে এবং এর সাথে কেঁচোর দেহ থেকে রাসায়নিক পদার্থ বের হয়ে কেঁচো সার (ভার্মি কমপোস্ট) তৈরি হয়। ওই হাউসের ভেতরেই কেঁচো ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করে।’
তিনি জানান, এক মাস পরে ছাঁকনির সাহায্যে হাউসের কেঁচো ও সার আলাদা করা হয়। পরে পুনরায় গোবর ও কেঁচো হাউসে দেওয়া হয়। ওই হাউসে জন্মানো অতিরিক্ত কেঁচো বিক্রির জন্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রতি হাউস থেকে মাসে প্রায় ৫ মণ কেঁচো সার উৎপাদিত হয়।
সেতুর হাউসগুলো থেকে সবমিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৭০ মণ কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে। যা তিনি প্রতি কেজি ১২ থেকে ১৩ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এখন তার খামারে প্রায় ১০ মণ কেঁচো রয়েছে। প্রতি কেজি কেঁচো তিনি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
প্রতি মাসে এ খামারে উৎপাদিত কেঁচো ও কেঁচো সার বিক্রি করে সেতু প্রায় এক লাখ টাকা আয় করছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, ‘দেশীয় কেঁচো থেকে যে কেঁচো সার উৎপাদিত হয় তা অনেক কম। এজন্য দেশের বিভিন্ন স্থানের নতুন খামারি ও উদ্যোক্তারা অধিক কেঁচো সার উৎপাদন করে লাভবান হতে আমার কাছ থেকে বিদেশি কেঁচো কেনেন।’
সেতু সর্বশেষ খাগড়াছড়ি জেলায় তার খামারে উৎপাদিত কেঁচো পৌঁছে দিয়েছেন বলেও জানান।
সেতুর বাবা কৃষক শেখ তছলিম উদ্দীন বলেন, তার ছেলের ‘চিংড়া ভার্মি কমপোস্ট’ খামারকে এগিয়ে নিতে তিনি সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন। এ খামারের মাধ্যমে ৭ জনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকেরা এলোমেলো ঘোরাফেরা না করে তারা নিজেরা যদি উদ্যোক্তা হয়ে কোনো কাজ করে তাহলে সফলতা অর্জন করতে পারবে।’
খামারে কাজ করা যুবক সুমন হোসেন জানান, তিনি এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার ফাঁকে এখানে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়ে সংসারে সহযোগিতা করেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঋতুরাজ সরকার বলেন, ‘ছোট একটা প্রদর্শনী দিয়েই শেখ মুহাইমিনুল ইসলাম সেতুর ‘চিংড়া ভার্মি কম্পোস্ট’ খামারের পথচলা শুরু হয়। এখন তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। কৃষি অফিস থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শনে গিয়ে তাকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। তার উৎপাদিত বিদেশি কেঁচো ও কেঁচো সার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। সেতুর খামার দেখে অনেক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।’