সিরাজুল ইসলাম বিজয়, তারাগঞ্জ (রংপুর)
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৪২ পিএম
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৪৪ পিএম
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার অধিাকাংশ কৃষক ধান চাষের বদলে নেপিয়ার ঘাস চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কয়েক বছর ধরে ধানের চেয়ে নেপিয়ার ঘাস চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ছোট-বড় মিলিয়ে গরুর খামার রয়েছে প্রায় ১১০টি। এছাড়া কৃষকের ঘরে গৃহপালিত পশু রয়েছে প্রায় ৬৪ হাজারেরও অধিক। এসব গবাদি পশুর খামারগুলোতে গো-খাদ্যের চাহিদা নিশ্চিত করতে উপজেলার অর্ধশতাধিক একর জমিতে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ করছে কৃষক ও খামারিরা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বুড়িরহাট, চিলাপাক, হাজিরহাট, কাজিপাড়া, রহিমাপুর, জোতপাড়া, ইকরচালী, ডাঙ্গীরহাট, মাঝেরহাট, ঘনিরামপুর, ঝাকুয়াপাড়াসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর ঘাসের ক্ষেত রয়েছে। যে জমিতে ধান চাষ হওয়ার কথা, সেখানে শুধু ঘাস বিচরণ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ধান ক্ষেত, বাস্তবে সবই ঘাস। তবে এখনও বড় উঠানের কিছু জমিতে ধান চাষ হয়।
ঘাস চাষিদের দাবি, ধানের বদলে ঘাস চাষে তাদের পরিবারের স্বচ্ছলতা আসছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় নেপিয়ার ঘাস চাষে ঝামেলা কম, লাভ বেশি হওয়ায় অনেকেই এ ঘাস চাষাবাদ করছেন। বিগত ৫/৭ বছর ধরে শুধু এ ঘাস চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকেই। মিল্কভিটা, আড়ং, প্রাণ ডেইরি, ফার্মফ্রেশসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো দামে দুধ কেনায় নতুন নতুন খামার গড়ে উঠছে। এজন্য উপজেলায় ব্যাপকভাবে শুরু হয় নেপিয়ার ঘাসের চাষ।
বুড়িরহাট দামোদরপুর গ্রামের কৃষক তারিকুল ইসলাম জানান, আমরা গরু পালন করি। তাই ৭/৮ বছর ঘাস চাষ করছি। এক বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষে বেশ লাভবান হই। এর পর থেকে দুই বিঘা জমিতে ঘাস চাষ শুরু করেছি। বছরে নেপিয়ার ঘাসের প্লট থেকে ৭-৮ বার ঘাস কাটা যায়। তিনি আরও জানান, এক বিঘা জমিতে খরচ হয় ৮-১০ হাজার টাকা। খরচ বাদে প্রতি বিঘায় তিনি লাভ করেছেন ৩০-৩৫ হাজার টাকা। অন্যান্য ফসলের তুলনায় এ ঘাসের চাষে সার, কীটনাশক ও মজুরি কম লাগে, উৎপাদন করে লাভও বেশি হয়। তাই ধান বাদ দিয়ে ঘাস চাষের দিকে ঝুঁকছে স্থানীয় কৃষকরা, এমন মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক ঘাস চাষি দুলাল হোসেন বলেন, ঘাস চাষে তার জীবনের সচ্ছলতা এসেছে। আগে একবেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে দায় ছিল, এখন ঘাস চাষ করে পরিবারের ভরণ-পোষণ বাদেও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দিতে পারছি।
রহিমাপুর গ্রামের ঘাস চাষি নুরজামাল হোসেন বলেন, বছরে এক একর জমিতে দুইবার ধান চাষ করা যায়। এতে খরচ বাদে ধান বিক্রি করে বছরে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু বছরে সাতবার ক্ষেত থেকে ঘাস কেটে বিক্রি করা যায়। এতে খরচ বাদ দিয়ে বছরে এক একর জমির ঘাস বিক্রি করে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় করা যায়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কেএম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, মায়ের দুধের যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি গবাদি পশু পালনে উন্নত জাতের ঘাস চাষের কোনো বিকল্প নেই। ঘাস দুগ্ধ বৃদ্ধিসহ গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধ ও প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসাবে কাজ করে। সেই সঙ্গে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে অনেকেই আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, তারাগঞ্জে যে পরিমাণ গরুর খামার রয়েছে, এসব খামারিদের প্রয়োজনে তারা নিজেরাই নেপিয়ার ঘাস চাষ করে। আবার অন্যের কাছে এ ঘাস বিক্রি করে বাড়তি টাকা আয় করে থাকেন। মাঝে মাঝে আমরা তাদের ঘাস চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। প্রকৃতপক্ষে এ ঘাস চাষ একটি লাভজনক চাষাবাদ।