× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্ব বাঁশ দিবস আজ

বাঁশের মতো যত উঁচুতে উঠবে বিনয়ে ততই ঝুঁকে পড়বে

সাইফুদ্দিন সাইফ

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০১:২০ এএম

বাঁশের মতো যত উঁচুতে উঠবে বিনয়ে ততই ঝুঁকে পড়বে

আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব বাঁশ দিবস। ২০০৯ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ৮ম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেসে প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে বিশ্ব বাঁশ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘বিশ্ব বাঁশ দিবস ২০২৫’-এর অফিসিয়াল প্রতিপাদ্য বা থিম হচ্ছে, ‘Next Generation Bamboo: Solution, Innovation, and Design.’ সহজ বাংলা বলতে গেলে থিমটির লক্ষ্য হলো- বাঁশ ব্যবহারে আধুনিক, সৃজনশীল এবং টেকসই উপায় আবিষ্কার করতে উদ্ভাবক এবং ডিজাইনারদের অনুপ্রাণিত করা। 

বাঁশ দিবসকে প্রথম দেখায় ভুল করে কেউ কেউ বাঁশ দেওয়া দিবস মনে করতে পারেন। বাঙালির জীবনে বাঁশের ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার এত বেশি যে, ‘কাউকে বাঁশ দিয়েছি’, ‘বাঁশ খেয়েছি’ এই সরল স্বীকারক্তিগুলো একেবারে প্রবাদ পর্যায়ে চলে গেছে। তবে বাঁশ দেওয়া/বাঁশ খাওয়া শব্দটি শুধুমাত্র বাংলাতেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। উপরন্তু জনপ্রিয় চাইনিজ প্রবাদ, ‘Like Bamboo, the higher you grow, the lower you bow,’ থেকে আমরা বলতে পারি, বাঁশ আমাদের বিনয় শিক্ষা দেয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শুধু বাঁশ দেওয়া-নেওয়া চললেও সত্যিকার অর্থে বাঁশের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম।

বাঁশ আসলে গাছ নয়, এটা ঘাস প্রজাতির উদ্ভিদ। উন্নত বিশ্বে কাঠের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাঁশ। বাঁশকে বলা হয় Green Gold (সবুজ সোনা)। বলা যায়, বাঁশ ও বেত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব উদ্ভিদ। অন্যান্য গাছ যেখানে পরিপক্ব ও ব্যবহার উপযোগী হতে ৩০/৪০ বছর সময় নেয় এবং কেটে ফেললে সেটির জীবনচক্র শেষ হয়ে যায়। সেখানে বাঁশ ৪ থেকে ৫ বছরে পরিপক্ব হয়। পরিপক্ব বাঁশ কাঁটার পরে বাঁশের গোড়া থেকে নতুন বাঁশের জন্ম হয়। এই চক্র চলতে থাকে বাঁশঝাড়ে ফুল আসা পর্যন্ত। ফুল আসার পর বাঁশ ঝাড় মারা যায়। এই ফুল থেকে ফল/বীজ হয়।

বাঁশের জীবনচক্র বড়ই অদ্ভুত। বাঁশের বীজ বা রাইজোম নিয়ে যদি একই সময়ে লাগানো হয় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, তবু একই সময়ে ফুল ফুটবে সব জায়গায়। পরিবেশ, আবহাওয়া কোনোকিছুই তাদের এই নির্দিষ্ট সময় পর ফুল ফোটার নিয়মকে ভাঙতে পারবে না। কেন এমন হয়, এর সঠিক কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও অনুসন্ধান করে চলেছেন। 

পৃথিবীতে ১৬৭৮ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৩০-৪০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। বাঁশ অতিমাত্রায় সহনশীল ও দ্রুতবর্ধনশীল উদ্ভিদ। উপযুক্ত আবহাওয়ার কিছু কিছু প্রজাতির বাঁশ দিনে ৩ ফুট বা ৩৬ ইঞ্চি করে বাড়তে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বাঁশ জন্মাতে পারে। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমাতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর প্রথম যে উদ্ভিদ জন্মে তা হলোÑ বাঁশ।

প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণিকুল রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে দুর্যোগ মোকাবিলা, পাহাড়ধস, ভূমিক্ষয়, নদীভাঙন রোধসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা বলে শেষ করা যাবে না। বাঁশ অন্য গাছগাছালির চেয়ে ২০-৩৫% বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে, আর বেশি মাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। বাঁশের মধ্যে সেলুলোজের পরিমাণ ৭৪% যেখানে সাধারণ কাঠে থাকে ৪০-৪৪ শতাংশ। এজন্য বাঁশে দ্রুত ঘুণে ধরে যায়। তবে বাঁশকে যদি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তবে ৫০ বছর বা ততোধিক সময় বাঁশকে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়। 

বাঁশের ব্যবহারিক প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যাপক। বাঁশ থেকে কমপক্ষে ৮০টি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। গৃহের কাঠামো, ছাউনি, সাঁকো, মঞ্চ, মই, মাদুর, ঝুড়িসহ দৈনদিন ব্যবহার্য বিবিধ জিনিসপত্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় বাঁশ। হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের বিকাশে বাঁশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতে কাগজ তৈরির প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে বাঁশ। খাদ্য হিসেবেও বাঁশ ব্যবহৃত হচ্ছে। পুষ্টি উপাদান ও মুখরোচক স্বাদের জন্য পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে বাঁশ কোড়ল নামে পরিচিত। এর তৈরি স্যুপ, সালাদ, তরকারি বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত বাঁশের অঙ্কুরোদগম হওয়ার পর চার থেকে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত যে কচি বাঁশ হয়, সেটাই রান্না করে খাওয়া যায়। বাঁশের পাতার নির্যাস থেকে এক প্রকার পানীয় তৈরি করা হয়, যেটা ‘ব্যাম্বো লিফ টি’ নামে পরিচিত।

চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশÑ বাঁশের ব্যবহার শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বাঁশের প্রক্রিয়াজাতকরণ করে অসাধারণ সব হস্তশিল্প ও স্থাপত্য নির্মাণশৈলী তৈরি হচ্ছে। সুতা ও কাগজ তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার হচ্ছে আরও আগে থেকেই। বর্তমানে বাঁশের প্লাই তৈরি হচ্ছে। বাঁশকে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। 

বাংলাদেশের মাটি, মৌসুমি জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থান বাঁশের জন্যে আদর্শ স্থান। তবে সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও নির্বিচারে বাঁশ উজাড় করায় প্রকৃতির এ মূল্যবান সম্পদ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। বর্তমান বিশ্বে বাঁশের বাজার প্রায় ৭০-৮০ বিলিয়ন ডলারের, যেটা অদূর ভবিষ্যতে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীর ৮০ ভাগ বাঁশই এশিয়া মহাদেশে জন্মে। তবে বর্তমানে ইউরোপ ও আফ্রিকাও বাঁশের পেছনে ছুটছে। কারণ বাঁশ জন্মানো সহজসাধ্য, অন্যান্য বনজ সম্পদের চেয়ে লাভজনক ও এর বহুবিধ ব্যবহার। মাটির ওপর দণ্ডায়মান এ খাড়া উদ্ভিদ সামান্যতম জায়গা দখল করে অনেকগুণ অর্থকরী ফসল প্রদান করে। একই সঙ্গে পতিত জমি আবাদযোগ্য করে তোলে, ভূমির ক্ষয়রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণের উপাদান হিসেবে সহজেই সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলে। আসুন তাই বাঁশকে ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার না করে বিনয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করি। সকলকে বিশ্ব বাঁশ দিবসের শুভেচ্ছা। 

লেখক : কিউরেটর, কোয়ান্টাম ব্যাম্বোরিয়ান

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা