× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পার্বত্যাঞ্চলের ৩ জেলা: দীর্ঘমেয়াদি কৃষিঋণের অভাবে বাড়ছে না কর্মসংস্থান

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৩৩ পিএম

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৯:২৪ পিএম

পার্বত্যাঞ্চলের ৩ জেলা: দীর্ঘমেয়াদি কৃষিঋণের অভাবে বাড়ছে না কর্মসংস্থান

দেশের পার্বত্য তিন জেলা- বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কৃষির বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গড়ে ওঠেনি কৃষিজাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফসল ফলাতে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি ঋণ পেলেও পান না দীর্ঘমেয়াদি। অঞ্চলটিতে ধান, গম, ভুট্টার পাশাপাশি উৎপাদিত হচ্ছে আম, কলা, কাঁঠাল, পেঁপে, আনারস, কমলাসহ ৪৪ জাতের ফল। তা ছাড়া প্রচলিত ফলের বাইরে রামবুটান, সফেদা, বলসুন্দরী কুল, কাজুবাদাম, কফি, লটকন ও মাল্টার মতো অপ্রচলিত ও বিদেশি ফলও উৎপাদিত হচ্ছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় কৃষিজ পণ্যের বিশাল ভান্ডারখ্যাত পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের জন্য সৃষ্টি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। সাড়ে ১৮ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষের জীবিকা মূলত জুমচাষ ও ঐতিহ্যগত কাজ। 

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমএম শাহ্ নেওয়াজ বলেন, এখানে কর্মরত ব্যাংকগুলো তেল ফসল, ডাল ও মসলা এবং ভুট্টা জাতীয় ফসলের জন্য ঋণ দেয়। কিন্তু কাজুবাদাম, আমবাগান, ড্রাগন ও অন্যান্য ফল বাগানের জন্য ৫ বছর বা আরও বেশি সময়ের জন্য ঋণ দরকার। এখানে কিষানঘর অ্যাগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজুবাদাম ও কফি প্রসেসিং করে বাজারজাত করে। কিন্তু কাজুবাদাম ব্যবসায় সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ মেলে না। বেসরকারি কিছু ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে। 

তিনি বলেন, বান্দরবানে কৃষিজাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। কেউ কেউ ঘরোয়া পরিবেশে আচার তৈরি করে। ছোটখাটো কিছু পণ্য প্রস্তুত করে বিক্রি করে। কুটিরশিল্পকেও অর্থায়ন করা হচ্ছে না। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। তার কথায়, অর্থের অভাবে আমবাগান বা অন্য বাগানগুলো কৃষকরা ৪-৫ বছরের জন্য বিক্রি করে দেয়। পাইকাররা বাগানের মাটির কোনো যত্ন করে না। কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেলে এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। 

এমএম শাহ্ নেওয়াজ বলেন, ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান করে ফুড প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক ফসলকে প্রাধান্য দিয়ে এটি করলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেত। তাদের পণ্যগুলো নষ্ট হতো না।  

বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও কফি চাষি মেন ইয়াং ম্রো বলেন, আমরা ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত ঋণ পাই না। আর ফল বাগানের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের ঋণ দরকার। অর্থের অভাবে অনেকেই ফল বাগান করে লাভবান হতে পারে না। 

বান্দরবান অগ্রণী ব্যাংকের জেলা শাখার তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যক্তি পর্যায়ে কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৬৮৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সোনালী ব্যাংকের জেলা শাখার তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যক্তি পর্যায়ে কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৪০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যমতে ২০২০ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে ২৪৪ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার এবং ইসলামী ব্যাংক বান্দরবান বিতরণ করেছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। 

খাগড়াছড়ির সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক সমীর কান্তি চাকমা বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা কৃষি খাতে ৮০ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছি। আমাদের ঋণ এক বা দুই বছর মেয়াদি। খাগড়াছড়ি কৃষি ব্যাংক আঞ্চলিক শাখার ব্যবস্থাপক দেবাশীষ ত্রিপুরা বলেন, ৬৭৬ কোটি ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ২০১৫ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত। আমাদের ৪ বা ৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। কৃষিজ শিল্প-কারখানা স্থাপনে কী পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ‍কৃষিজাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। কোনো উদ্যোক্তা এগিয়েও আসছে না। আমাদের ঋণ কৃষক পর্যায়ে। 

রাঙামাটিতে চিপস বাজার নামে একটি ক্ষুদ্র কারখানা করছেন প্রমথ চাকমা। তিনি, কাঁঠাল ও কলা দিয়ে চিপস তৈরি করছেন। বর্তমানে ঘণ্টায় ৩ কেজি পর্যন্ত চিপস তৈরি করতে পারেন প্রমথ। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সহযোগিতায় কারখানা স্থাপন করেছি। এতে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কোনো ব্যাংক ঋণ পাইনি।

বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা

রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারি মো. মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাসাবাড়ি, জমি মর্টগেজ বা বন্ধক রাখা হতো। ২০১৯ সাল থেকে সরকার এই দায়িত্ব দিয়েছে জেলা প্রশাসকের কাছে। এখন আর বন্ধক দেওয়া যায় না। এতে করে ঋণও পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। 

কৃষিজাত পণ্যের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানকার কৃষি ফসল, ফলফলাদি প্রচুর আবাদ হচ্ছে। বাজার ব্যবস্থা ভালো না থাকায় লোকসান হচ্ছে। 

মো. মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, এখানকার কফি, কাজুবাদাম, পর্যটন, পাহাড়িদের তৈরি পোশাক এসবের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। গত ১৫ বছর আগে বিসিক নগরীতে অনেককে প্লট দেওয়া হয়েছিল। কেউ সেখানে প্রতিষ্ঠান করেনি। একদিকে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি, অন্যদিকে নিজেরা ঋণ নিয়ে কারখানা করবে অবস্থাও নেই। 

কিষানঘর অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে ফুড প্রসেসিং বা কোনো প্রসেসিং ফ্যাক্টরি গড়ে উঠছে না। এখানে ৮ ঘণ্টার কাজে প্রায় ৩০ শতাংশ সময় বিদ্যুতের অভাবে নষ্ট হয়। তা ছাড়া বান্দরবানে নামসর্বস্ব বিসিক আছে। তারা অল্প কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু কোনো শিল্প-কারখানা নেই। এখন পর্যন্ত কোথায় বিসিক করবে, সেটিই নির্ধারণ করতে পারেনি। 

তিনি বলেন, বাইরের মানুষ জায়গা কিনতে পারে না। এই বাধ্যবাধকতার কারণ ও স্থানীয়রাও নেতিবাচকভাবে দেখে। ফলে উভয় পক্ষের জন্য জটিল ও বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে বিসিক থাকলে এই সমস্যায় পড়তে হতো না। 

পার্বত্যাঞ্চলে আর্থিক সুবিধা খুবই কম উল্লেখ করে মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো খুবই অল্প মাত্রায় ঋণ বিতরণ করে থাকে। আর যাদের প্রচুর অর্থ আছে তাদেরকেই ঋণ দেয়। নতুন উদ্যোক্তাদের দেয় না। কৃষকরাও ২০ হাজার টাকা ঋণ পায় না। ফড়িয়াদের ঋণ দেয়।

তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে কীটনাশক সরবরাহকারীরাও নিম্নমানের কীটনাশক বিক্রি করে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলন কমে যায়। বীজও নিম্নমানের। ফলে কৃষক বারবার ঠকছে। এসব দেখভাল সঠিকভাবে হচ্ছে না। 

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন বান্দরবান প্রতিবেদক সুফল চাকমা, খাগড়াছড়ির খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক ও রাঙ্গামাটির আরমান খান।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা