ফারুক আহমাদ আরিফ, ঢাকা ও আবুল হাসান, মোংলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৫ ০৮:৫৯ এএম
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৫ ১৪:২০ পিএম
বিশ্ব বাঘ দিবস আজ। বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বিশ্বে দিবসটি পালন করা হয়। এদিকে খুব একটা ভালো নেই সুন্দরবনের বাঘেরা । গত ২৫ বছরে এ বনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পিটিয়ে এবং শিকার করে হত্যা করা হয়েছে ৫৮টি। আর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৩০টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে ৩টি বাঘ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যাভাবেও সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমছে। তা ছাড়া নোনা পানি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আর বনসংলগ্ন শিল্প-কারখানার ভয়ানক দূষণ বাঘদের টিকে থাকার পরিবেশ নষ্ট করছে। এমন বাস্তবতায় আজ ২৯ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এবারের দিবসটির পতিপাদ্যÑ বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি-সুন্দরবনের সমৃদ্ধি।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিংস্র গতি, দুর্দমনীয় শক্তি আর ভয়ংকর সুন্দরের মিশেলে রাঙানো বনের পশু বাঘ। বিশ্বজুড়ে বাঘের ৯টি উপপ্রজাতি থাকলেও গত শতকে বিলুপ্তি হয়েছে তিনটি।
সুন্দরবন বিভাগের বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান আহমেদ জানান, ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে পিটিয়ে ও শিকার করে হত্যা করা হয়েছে ৫৮টি, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৩০টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে তিনটি বাঘ। তবে গত ১০ বছরে বাঘ হত্যা বা শিকারের মতো ঘটনা অনেক কমেছে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে বাঘের খাদ্য ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলে সুরক্ষা, অবৈধ শিকার, হত্যা বন্ধ এবং সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এজন্য সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান। এ ছাড়া সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প নামে আরেকটি প্রকল্প থেকে বাঘ সংরক্ষণে কাজ চলছে। চলমান এই প্রকল্পে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষণে বাঘের সংক্রমণ ব্যাধি এবং এর মাত্রা নির্ণয়ে গবেষণা চলছে। এ ছাড়া বাঘের খাদ্য হরিণ শিকার বন্ধে সুন্দরবনে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব স্থান ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বন কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ আরও বলেন, বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয় এলাকায় দড়িবেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় বিভিন্ন মনিটরিং চলমান রয়েছে।
এদিকে সুন্দরবন সংলগ্ন শিল্প-কারখানা ও বনের ভেতর দিয়ে চলা জাহাজের দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ নানা কারণে বাঘের রাজত্ব ছোট হয়ে আসছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা শেষে গত ২০২৪ সালে বন বিভাগ বাঘের সংখ্যা বাড়ার আভাস দিলেও পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনে বাঘের টিকে থাকার হুমকি আগের মতোই রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বাগেরহাট শাখার আহ্বায়ক মো. নুর আলম শেখ বলেন, ‘সুন্দরবনে বাঘ না থাকার কারণ, বাঘের খাদ্য হরিণের অপর্যাপ্ততা, এ ছাড়া সুন্দরবনে খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, সেই বিষের পানি খেয়ে বাঘ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে এবং আন্তর্জাতিক বাঘ চোরাকারবারি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়েনি। বাঘ রক্ষা করতে হলে বনে তাদের আবাস্থল রক্ষা করতে হবে।’
সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন টিকিয়ে রাখতে হলে বাঘ টিকিয়ে রাখতে হবে। আর বাঘ টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু বাঘ জরিপ করলে বা বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প নিলেই হবে না, বনের পুরো ইকোসিস্টেম নিয়েই কাজ করতে হবে।
২০ বছরে বাঘ কমেছে ৩১৫টি
বন বিভাগের ২০০৪ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। তা ছাড়া ১৯৯৬-৯৭ সালের জরিপে ছিল ৩৫০-৪০০টি। তবে জরিপ নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২০১০ সালের জরিপে পাওয়া যায় ৪০০টি। ২০১৫ সালে সর্বাধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে একটি জরিপ করা হয়। সে সময় পাওয়া গেছে ১০৬টি। ২০১৮ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ৮টি বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। ২০২৩ সালে সুন্দরবনে বাঘ গণনায় ১১৫টি ও ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘের সংখ্যা জানায় বন বিভাগ। সে হিসাবে ২০ বছরে বাঘ কমেছে ৩১৫টি।
২০০৪ সালের এক গণনায় বাঘের সংখ্যা ৪৪০টি উল্লেখ করা হয়েছে এবং ২০২৪ সালের গণনায় তা ১২৫টি বলা হয়েছে; তবে এ পার্থক্য কেন জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ খান বলেন, ২০০৪ সালের গণনার কোনো ভিত্তি নেই। এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এতে সঠিক তথ্য না মিললেও অনেকটা কাছাকাছি। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যে হারে বাড়ছে, তাতে আমাদের দেশ অনেকটা পিছিয়ে।
গত ২৬ জুলাই বাঘ সংরক্ষণে গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাজধানীর হাতিরঝিলে মিনি ম্যারাথন প্রতিযোগিতা ‘প্যানটোনিক্স টাইগার রান ঢাকা ২০২৫’-এর আয়োজন করেছিল প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। এতে বিপুল সংখ্যক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
বাঘ সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘ সংরক্ষণে সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকাকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করে বনজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বাঘ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী অবাধে বিচরণ ও প্রজনন করতে পারে। বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব কমাতে স্থানীয় গ্রামের সীমান্তে নাইলন ফেন্সিং নির্মাণ করা হচ্ছে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘ ও অন্য প্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য বনের মধ্যে ১২টি মাটির উঁচু কিল্লা নির্মাণ করা হয়েছে। বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা এবং গুরুতর আহতদের ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম। তা ছাড়া বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭) প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় বাঘ সংরক্ষণ, গবেষণা, নজরদারি এবং বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।