ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৫ ২০:০৯ পিএম
আপডেট : ২৩ জুন ২০২৫ ২০:১২ পিএম
প্রতীকী ছবি
দেশে গত ৫৪ বছরে প্রায় ৪৭ শতাংশ ভূমি খরায় প্রভাবিত হয়েছে। এসব অঞ্চলে প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষের বসবাস। খরা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিশেষ করে বন, মৎস্য, কৃষি উৎপাদন এবং এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শুধু ১৯৯৫ সালের খরার ফলে চাল ও গমের উৎপাদন কমেছিল ৩.৫ টন। তা ছাড়া বর্তমানে দেশের প্রায় ২২ জেলা খরার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে ‘ডিলাইনেটিং দ্যা থ্রোট বালনারেবিলিটি জোনস ইন বাংলাদেশ’ ও ২০২২ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক অ্যাটল’ শীর্ষক দুটি গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
‘ডিলাইনেটিং দ্যা থ্রোট বালনারেবিলিটি জোনস ইন বাংলাদেশ’ গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গড়ে আড়াই বছর পর পর খরার সম্মুখীন হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৯৭৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১১টি তীব্র খরার সম্মুখীন হয়েছে। এতে দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ ভূমি তীব্র খরার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যেখানে জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ বাস করে।
গবেষণায় গ্রাম, শহর, উপকূল এবং পাহাড়ি অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণায় সামগ্রিকভাবে পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলকে খরার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে এ হার ৫৬.৮৫ শতাংশ, উত্তর-মধ্য অঞ্চলে ৩৫.৮৫, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৪১.৬৮ এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ৪০.৩৯ শতাংশ। নদী ও মোহনা অঞ্চলে খরার ঝুঁকির হার ৩৮.৪৪ শতাংশ। তা ছাড়া দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে ১৮.৯৯, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৩৯.৬০ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চললে খরার হার ৪১.০৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষিবিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান বলেন, খরার কারণে দেশে ১৯৭৪ ও ১৯৯৫ সালে বড় ধরনের দুটি দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। খরা কৃষির জন্য বড় ধরনের বিপদ। এটি বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০২৩-২৪ সালে এল নিনোর প্রভাবে জুন-জুলাই তথা বর্ষা মৌসুমেও খরার কবলে ছিলাম। তা ছাড়া বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম আরও বেশি শুষ্ক হয়ে উঠছে। আরেকটি নতুন বিপদ হচ্ছে আমরা আগে উত্তরাঞ্চলকে খরাপ্রবণ হিসেবে ধরতাম এখন দেশের মধ্যাঞ্চল, উপকূল ও পাহাড়ি অঞ্চলও খরার কবলে পড়বে। উপকূলীয় এলাকায় এমনিতেই লবণাক্ত, তারপর যদি খরাকবলিত হয়ে পড়ে তাহলে দুটি দুর্যোগের মধ্যে পড়বে। তাতে কৃষি ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গবেষণায় বলা হয়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার এবং তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকে। তবে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ধরন, দীর্ঘায়িত শুষ্ক আবহাওয়া এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলটি খরার ঝুঁকিতে রয়েছে। অঞ্চলগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে আমরা খরার কবলে পড়ি। এই খরার প্রবণতা দিন দিন বাড়বে। কেননা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। সেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। এখন বৃষ্টিপাতের ধারা বদলে যাচ্ছে। মৌসুম ভিত্তিক বৃষ্টি হচ্ছে না।
তিনি বলেন, রবি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম। তখন চাষাবাদে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার করতে হয়। দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়ছে। তা ছাড়া নদী, খাল-বিল শুকিয়ে যায়। এসব পানির আধার এখন ধ্বংসের পথে। আর বরেন্দ্র অঞ্চল তো আরও বেশি ক্ষতির মুখে। সেখানে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। তা ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পাশাপাশি খরাকরণের দিকেও যাচ্ছে। সমস্যা মোকাবিলায় তিনি সবুজ তথা গাছপালা রোপণ ও জলাধারগুলো সংরক্ষণের আহ্বান জানান।
ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে
উচ্চ তাপমাত্রা খরার প্রকোপ এবং তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে। তাতে বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় ভূমি পৃষ্ঠের তাপমাত্রা (এলএসটি) ২৩.৮৪ সেলসিয়াস থেকে ৩০.৮১ সেলসিয়াস পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়েছে। যশোর, চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুরের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি তাপমাত্রা থাকে। খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে প্রায়শই বাষ্পীভবনের হার বেশি থাকে। ২০০১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় বাষ্পীভবন (ইটি) প্রতি বছর ০ থেকে ১৭১২ মিমি পর্যন্ত ছিল। পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে বেশি পরিমাণে গাছপালা থাকে, সেখানে বাষ্পীভবনের হার বেশি থাকে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খরার সম্ভাবনা মূল্যায়নের জন্য বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং বাষ্পীভবনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে।
খরায় বৈশ্বিক ক্ষতি
গবেষণায় খরায় বৈশ্বিক কী ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয় তার একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়, পৃথিবীর বেশ কয়েকটি অঞ্চলে প্রায়ই বারবার খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এতে প্রতি বছর মানুষের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ৪১০টিরও বেশি বড় খরা দেখা দিয়েছে। ফলে বার্ষিক ৫৩.৫ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খরাজনিত বিপর্যয়ের ফলে বিশ্বব্যাপী বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
খরায় কবলিত দেশের ২২ জেলা
বাংলাদেশ ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক অ্যাটলাস শীর্ষক গবেষণায় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের ২২টি জেলাকে খরা প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসবের মধ্যে খরাপ্রবণ জেলা ১৩টি, ৬টি খরা ও বন্যাপ্রবণ জেলা, ৩টি খরা ও আকস্মিক বন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জেলায় মোট জমির পরিমাণ ৫৪ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর।
গবেষণায় বলা হয়, খরার কারণ ছিল দেরিতে বৃষ্টি হওয়া অথবা মৌসুমি বৃষ্টি দ্রুত শেষ হওয়া। ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে এ ধরনের খরায় দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখন চালের উৎপাদন কমেছিল ২০ লাখ টন। তা ছাড়া ১৯৯৭ সালে খরায় ১০ লাখ টন ধানের ক্ষতির হয়েছিল। তারমধ্যে রোপা আমন ছিল ছয় লাখ টন। ফলে কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৫০ কোটি ডলার।
গত ৩০ বছরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে
চলতি বছরের এপ্রিলে ক্লাইমেট সার্ভিস জার্নালে ‘ফার্মারস ক্লাইমেট চেঞ্চ পারসেপশন, ইমপেক্ট অ্যান্ড অ্যাডাপটেশন স্ট্যাটেজিস ইন রেসপোন্স টু দ্রোট ইন দ্য নর্থওয়েস্ট আরিয়া অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে খরা মোকাবেলায় অভিযোজনের ভূমিকা সুসংগঠিত নয়। অথচ কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে দেশের উত্তর-পশ্চিম খরাপ্রবণ অঞ্চলের ৪টি জেলার (রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ৩৭৫টি কৃষি পরিবারের ওপর গবেষণা করা হয়। সেখানে ৯৫.৬% কৃষক দাবি করেন, গত ৩০ বছরে জলবায়ু নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, এ সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে। বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার ব্যাঘাতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘায়িত হওয়া, কম বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উষ্ণ দিনের সংখ্যা বৃদ্ধি, বৃষ্টির দিনের সংখ্যা হ্রাস ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণ ইত্যাদি।
এ সম্পর্কে নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ বিশেষজ্ঞ বিধান চন্দ্র দাস বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি এবং আবহাওয়া দেশের অন্যান্য এলাকার থেকে বেশি রুক্ষ। এ অঞ্চলে সৃষ্ট খরার তীব্রতার জন্য শুধু বৃষ্টি দায়ী নয় বরং ভূগর্ভস্থ পানির ঘাটতি, খাল ও নদীতে স্রোতের অভাব, উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব, বন উজাড় ইত্যাদি কারণও দায়ী। এক কথায় এই খরা মূলত মানবসৃষ্ট কারণেই।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপউপাচার্য এবং ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, খরার সঙ্গে মূল সম্পর্ক হচ্ছে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, রংপুর, দিনাজপুর থেকে খুলনা পর্যন্ত গত বছর যে তাপপ্রবাহ বিস্তৃত ছিল তা খরা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের আগামী ১০০ বছরে কী ধরনের খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটি নিয়েও আমরা গবেষণা করেছি। তাতে এই তাপপ্রবাহটিই প্রাধান্য পেয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের অঞ্চলে গাছপালা ও জলভাগের প্রভাব ছিল তা অনেক কমে গেছে। এজন্য আমাদের করণীয় হচ্ছে গাছপালা রোপণ ও জলাধারের পরিমাণ বাড়তে হবে। সম্প্রতি নেপালে ভারত, চীন ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সম্মেলন হয়েছে। সেখানে হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বর্ষায় নদীর পানিপ্রবাহ এবং খরা মৌসুমে চলমান স্রোত ধরে রাখার বিষয়ে কথা হয়েছে।
ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, আমরা যদি পানি ব্যবস্থাপনাটি ভালোভাবে করতে পারি তাহলে খরাপ্রবণতাটা কমবে। এজন্য ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পানির উৎসগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।