ওবাইদুল আকবর রুবেল, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৫ ২১:০৪ পিএম
আপডেট : ২৯ মে ২০২৫ ২১:১০ পিএম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা বাগান বাজার ইউনিয়নের প্রান্তিক গ্রাম চিকনেরখীলে দুই তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে গড়ে উঠেছে কৃষি সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ‘রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম’। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত দুই বন্ধু আব্দুল হালিম (অর্থনীতি) ও ওসমান গণি (ব্যবস্থাপনা) ২০২০ সালের করোনা মহামারিকালে শহর ছেড়ে ফিরে আসেন নিজ গ্রামে এবং গড়ে তোলেন সবজি উৎপাদনের স্বপ্নের এই ফার্ম।
অলস-অবসর সময় কাটানোর চিন্তা থেকে মাথায় আসে চাষাবাদের। দুই বন্ধু মিলে গ্রামের এক ফসলি ধানিজমি লিজ নিয়ে শুরু করেন সবজি চাষ। সফলতার মুখ দেখে ধীরে ধীরে তারা ৫ একর জমিতে ‘রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম’ নামে দিগন্তজোড়া সবুজ সবজিক্ষেত গড়ে তুলেন। যেখানে বারোমাসি লাউ, চিচিঙ্গা, ঢ্যাঁড়শ, করলা, কাঁকরোল, পেঁপে, বেগুনসহ নানা প্রজাতির সবজি উৎপাদন করছেন। তিন বিঘা লাউ খেতের মাচায় দুলছে লাউ। নাইচ গ্রিন জাতের বারোমাসি লাউয়ের ডগায় ডগায় ফুল আর ফল।
জ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দুই বন্ধু কৃষিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। অল্প দিনেই তাদের সফলতার গল্প ছড়িয়ে গেছে সারা দেশে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রান্তিক পাহাড়াঞ্চলে দুই তরুণ উদ্যোক্তার ‘রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম’টি এখন সারা দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের হাতে-কলমের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় আরও বেশ কয়েকজন মানুষের। কৃষি সংশ্লিষ্ট দেশে-বিদেশের বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও কর্মকর্তারা তাদের স্বপ্ন প্রকল্পটি দেখে আসছেন এবং এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেরাও সফল হওয়ার চেষ্টা করছেন।
উদ্যোক্তা আব্দুল হালিম বলেন, শুরুতে লাউ, চিচিঙ্গা, পেঁপে চাষ করলেও বর্তমানে শুধু কাঁকরোল চাষ করছি। মূলত কাঁকরোল চাষেই আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা এসেছে। বর্তমানে বছরে ১২ বিঘা জমিতে প্রায় ৮০ হাজার কেজি কাঁকরোল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ টাকার কাঁকরোল বিক্রি করেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন না হলে আরও ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো বিক্রি করা যাবে। ফেনী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সরাসরি মাঠ থেকে সবজি কিনে নিয়ে যান, ফলে বাজারজাতকরণেও বাড়তি ঝামেলা নেই।
অন্য উদ্যোক্তা মো. ওসমান গণি বলেন, তাদের এই সফলতা শুধু স্থানীয় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় পর্যায়েও। ‘নিরাপদ সবজি উৎপাদনে’ শ্রেষ্ঠ কৃষক হিসেবে তারা পেয়েছেন জাতীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কার। তাদের ফার্ম পরিণত হয়েছে দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের হাতে-কলমের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।
সম্প্রতি কৃষি বিভাগের এসএসিপি প্রকল্পের আওতায় ৫০ জন কৃষক রুপাই ভ্যালি পরিদর্শনে আসেন এবং জৈব চাষাবাদের পদ্ধতি দেখে উদ্বুদ্ধ হন। কৃষকরা বলেন, কীটনাশক ছাড়াও জৈব উপায়ে কৃষিকাজ যে লাভজনক হতে পারে, তা রুপাই ভ্যালি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।
রুপাই ভ্যালিতে প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শুধু নিজেদের স্বনির্ভরতা নয়, তৈরি হয়েছে অনেক তরুণের কর্মসংস্থানও। কৃষি প্রযুক্তি ও জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করে কীটনাশক ছাড়া নিরাপদ সবজি উৎপাদন করছেন তারা। হলুদ পাতা, পেরোমোন ট্র্যাপ ও জৈব সার ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবে ফসল উৎপাদনে তারা উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সরকারের জোরাল উদ্যোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রুপাই ভ্যালির এই সফলতা সারাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। আমরা উপজেলার অন্য কৃষক সমিতির নেতাদের রুপাই ভ্যালি পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা বিনিময়েও উৎসাহিত করছি।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, এই দুজন শিক্ষিত তরুণের উদ্যোগ এখন কৃষকদের হাতে-কলমের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তারা প্রমাণ করেছেন প্রযুক্তি, জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়ে কৃষিও হতে পারে আধুনিক ও লাভজনক শিল্প।