রফিকুল ইসলাম সান, সাঁথিয়া-বেড়া (পাবনা)
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১০:২৬ এএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৫ ১৩:১৬ পিএম
গন্ধগোকুলের বাচ্চা ঠাঁই নিয়েছে একটি আমগাছে। সম্প্রতি বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লার একটি বাড়ি থেকে তোলা।
পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বৃশালিখা, মৈত্রবাঁধা, আলহেরা নগর, জোড়দাহ-বাঙ্গাবাড়িয়া, দাসপাড়া, হাতিগাড়াসহ কয়েকটি মহল্লায় সন্ধ্যা নামার পর থেকেই সুস্বাদু খাবার পোলাওয়ের সুগন্ধ নাকে আসে। কিন্তু বাড়িতে পোলাও রান্না হয়নি, কোথা থেকে আসে পোলাওয়ের সুগন্ধ? অনেকেরই ধারণা পাশের বাড়িতে হয়তো রান্না হয়েছে, কিন্তু না। লক্ষ করে দেখা যায়, এই সুগন্ধ ছড়াচ্ছে বিপন্ন প্রাণী গন্ধগোকুল। প্রাণীটি দেশের অনেক এলাকা থেকেই বিলুপ্তির পথে। কিন্তু পাবনার বেড়া পৌর এলাকার কয়েকটি মহল্লায় এখনও এ প্রাণীর বিচরণ চোখে পড়ে। গন্ধগোকুল বর্তমানে অরক্ষিত প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। পুরোনো গাছ, বনজঙ্গল কমে যাওয়ায় দিন দিন এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) বিবেচনায় পৃথিবীর বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় উঠে এসেছে এই প্রাণী। প্রাণীটির আসল নাম গন্ধগোকুল হলেও বেড়া উপজেলায় এটি নেউল নামেই পরিচিত। অনেকে এগুলোকে বাগডাশও বলেন। এর শরীর থেকে পোলাও চালের সুগন্ধের মতো মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়। সন্ধ্যার পর অন্ধকার নামলে পৌর এলাকার বিভিন্ন বাড়ির ঘরের চাল ও গাছের ওপর দিয়ে শুরু হয় এর চলাচল। এ সময় এর শরীরের গন্ধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকে রস নিঃসৃত হতে থাকে বলে যে স্থান দিয়েই এরা যাক না কেন, বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেখানে সেই গন্ধ থেকে যায়।
বন্য প্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, গন্ধগোকুল প্রকৃতির উপকারী একটি নিশাচর প্রাণী। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গন্ধগোকুলের রয়েছে বিশেষ এক ভূমিকা। খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান প্রাণীটির। গন্ধগোকুল ব্যাঙ, ইঁদুরসহ ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ফলমূল খেয়ে এর বীজ বিস্তারের মাধ্যমে পরিবেশের অনেক উপকার করে।
কিন্তু ভুল ধারণার কারণে অনেকেই প্রাণীটির জীবন হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কখনও কখনও গৃহপালিত হাঁস-মুরগি বা কবুতর ধরে নিয়ে যায় বলে মানুষ এগুলো ফাঁদ পেতে ধরে হত্যা করে। আবার অনেক সময় রাস্তা পারাপারের সময় গাড়িচাপায়ও মারা যায়। এতে এগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। তবে গত ১০-১২ বছরের মধ্যে পৌরবাসী এই প্রাণীকে ফাঁদ পেতে ধরেছেন বা এগুলোর কোনো ক্ষতিসাধন করেছেন বলে শোনা যায় না।
এরা বছরে সাধারণত দুবার প্রজনন করে। গর্ভধারণকাল দুই মাসের কিছু বেশি। পুরোনো গাছের খোঁড়ল, গাছের ডালের ফাঁক, পরিত্যক্ত ঘর, ধানের গোলা বা তাল-সুপারির গাছের আগায় ছানা তোলে। সাধারণত প্রতিবারই ছানা হয় তিনটি।
বেড়া পৌর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক শিখা রাহা বলেন, আমার বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে প্রায়ই এরা যাতায়াত করে। আমার ধারণা, বাড়ির আশপাশের কোনো গাছে বা পরিত্যক্ত ঘরে এরা বাস করছে। সন্ধ্যার পর ছাদে গেলেই অনেক সময় পোলাওয়ের সুগন্ধ পাই। কখনও কখনও এদের দু-তিনটি যাতায়াত করতে দেখি। তিন-চার মাস আগে আমার ছাদবাগানের ঝোপের মধ্যে দুটি বাচ্চাও দেখেছিলাম। দু-তিন দিন পর আর দেখতে পাইনি। সম্ভবত ওদের মা অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে।
বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, দেশের অনেক এলাকা থেকেই গন্ধগোকুল বিলুপ্ত হতে বসেছে। তবে বেড়া পৌর এলাকায় এগুলোর বিচরণ যেমন কিছুটা বেশি, তেমনি পৌরবাসীও এগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল।
বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, বাগডাশ বা গন্ধগোকুল মানুষের কাছাকাছি থাকে। কিন্তু মানুষ দেখলে খুবই ভয় পায়। খুবই লাজুক স্বভাবের প্রাণী। আবাসভূমি ধ্বংস ও হাঁস-মুরগি বাঁচানোর জন্য ব্যাপক নিধনের কারণে এগুলো এখন বিপন্নপ্রায়। তবে প্রাণীটি প্রকৃতির বন্ধু। তাই সবারই উচিত এগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।