× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বায়ু দূষণে বাড়ছে বজ্রপাত

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫ ১৭:০৩ পিএম

আপডেট : ১২ মে ২০২৫ ১৭:০৫ পিএম

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত

বজ্রপাতের পরিমাণ ও মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বৈশাখে বাড়ে কালবৈশাখী আর বজ্রপাতের ভয়। গত ২৮ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন। ১ মে প্রাণ হারান আরও পাঁচজন। চলতি বছরের মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ ঝরেছে ৭৫ জনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বজ্রপাত বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণ। সেই সঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যুর জন্য উঁচু গাছপালা কেটে ফেলাও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশের বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল ‘আর্থ সিস্টেমস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ নামের বিজ্ঞান সাময়িকীতে ‘রোল অব পলিউট্যান্টস অন দ্য বাইমোডাল লাইটনিং ডিস্ট্রিবিউশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ পায়। সেখানে বজ্রপাতের জন্য বায়ুদূষণের কিছু উপাদান তথা ধূলিকণা (ডাস্ট) ও সালফেটের (এসও৪) ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই গবেষণায় ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ছয় বছরের বজ্রপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। ওই তথ্য অনুসারে দেশে বজ্রপাতের ‘শীর্ষ শিখর’ এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এর ‘দ্বিতীয় শিখর’ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর। আর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সবচেয়ে কম বজ্রপাত ঘটে।

উল্লিখিত ছয় বছরে বাংলাদেশে ৮০ লাখের বেশি বজ্রপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল একদিনেই ৮ লাখের বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে বলেও গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, এপ্রিল ও মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা পশ্চিমা বাতাসে প্রচুর পরিমাণে ধূলিকণা ও সালফেট থাকে। এই উপাদানগুলো মেঘের গঠনে প্রভাব ফেলায় বজ্রপাতের আশঙ্কা বাড়ে। আবার শীত মৌসুমে বায়ুমণ্ডলে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা অর্থাৎ পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বজ্রপাতের আশঙ্কা কমে যায়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বজ্রপাতের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে বায়ুদূষণকারী উপাদান; বিশেষ করে অ্যারোসল (যেমন ধূলিকণা, কালো কার্বন এবং পিএম ২.৫) মেঘ ও ঝড়ের গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ ঘনত্বের অ্যারোসল মেঘের ফোঁটার আকার ছোট করে দেয়, যার ফলে মেঘের বৈদ্যুতিক চার্জের বণ্টন পরিবর্তিত হয় এবং বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়ে।

এই পারস্পরিক সম্পর্কের ফলে বজ্রপাত ও বায়ুদূষণের মধ্যে একটি জটিল চক্র গঠিত হয়, যা বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন, বায়ুর মান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে।

প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ২৫০-৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়। যাদের মাঝে ৯৩ শতাংশই গ্রামে থাকেন এবং কৃষকের সংখ্যা ৮৩ শতাংশ। ২০১৬ সালের ১৬ মে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এক্ষেত্রে সরকার বজ্রপাতে আহতদের ১০ হাজার ও নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিল্যান্স ডিপার্টমেন্ট ও সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডার্স্ট্রম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছরে বজ্রপাতে ৫ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডার্স্ট্রম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) তথ্যানুযায়ী ২০১৯ থেকে চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৬১১ জনের।

বজ্রপাত নিয়ে পিএইচডি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম ফারুখ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘দেশে প্রি-মৌসুমে বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকে। কেননা শীতের পরপরই বায়ুমণ্ডল আর্দ্র হয়ে ওঠে। বজ্রপাত ঘটাতে এটা একটা কারণ। শীতের পর দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে উত্তরের হিমালয় থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ দেশের ভেতরে ঘটে বলেই বজ্রপাত হয়। এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাত, কালবৈশাখী ও ঝড় হবে এটা স্বাভাবিক। ক্লাইমেট মডেলিংয়ের কথা বললে বলা যায়, এবার দেশের অভ্যন্তরে ২২ এপ্রিল থেকে প্রচণ্ড মেঘের একটা আস্তরণ ছিল। ঘন মেঘ বা কনব্রিক্টিভ ক্লাউড। এ ঘন মেঘ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে গেছে। তাই ২৭ ও ২৮ এপ্রিলের বজ্রপাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে শুরু হয়ে সিলেট, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা ও সুনামগঞ্জে বজ্রপাত ঘটায়। এতে অনেক মানুষ মারা যায়।’

তিনি বলেন, ‘দেশে বজ্রপাতের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। অল্প সময়ে অধিক বজ্রপাত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শীতের পরই কালবৈশাখী শুরুর কারণÑ এ সময় ঠান্ডা হাওয়া আস্তে আস্তে গরম হতে শুরু করে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রির বেশি হয়ে মৃদু, মাঝারি, তীব্র বা অতিতীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হলে খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যায়। তখন বাতাস প্রচণ্ড উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে ওঠে। এই উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস যখন ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে তখন বজ্রপাতের মাত্রা বাড়ে।’

গত ১৫ মার্চ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিষয়ক পোর্টাল বিজিআরে ‘রিসার্চারস ফাউন্ড অ্যান আনঅ্যাকসেপ্টেড ওয়ে টু স্টপ লাইটনিং ফ্রম স্ট্রাইকিং’ শীর্ষক যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অবলম্বনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা গেছে, সমুদ্রগামী কার্গো জাহাজ থেকে নির্গত সালফার কণার দূষণ বজ্রপাতে প্রভাব ফেলে। কেননা জাহাজে যখন জ্বালানি পোড়ানো হয় তখন তা বাতাসে ক্ষুদ্র অ্যারোসল কণা ছড়িয়ে পড়ে। এসব কণা মেঘ গঠনে জলীয়বাষ্পকে পানির ফোঁটায় ঘনীভূত করে বরফের স্ফটিক আকারে জমা হয়। ঝড়ের সময় এসব স্ফটিকের মধ্যে সংঘর্ষ বেশি হওয়ায় বৈদ্যুতিক চার্জ উৎপন্ন হয়ে বজ্রপাত সৃষ্টি হয়।

কয়েক দশক ধরে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিতে জাহাজের সংখ্যাও বেড়েছে। এতে জাহাজের সালফার কণার নির্গমনও বেড়েছে। ২০২০ সালে নতুন আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী জাহাজের সালফার নির্গমন ৭৭ শতাংশ কমিয়ে আনে। গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসব নিয়মাবলী কার্যকর হওয়ায় শিপিং লেনের ওপর বজ্রপাত প্রায় অর্ধেক কমেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জাহাজ থেকে সালফার নির্গমন কমায় ঝড়ের মেঘে বরফের স্ফটিক কম তৈরি হয়। ফলে কম বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হওয়ায় বজ্রপাতের সংখ্যাও কমেছে।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে না পারলে বজ্রপাত বাড়তেই থাকবে উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু বিনিয়োগ স্ট্র্যাটেজিক ক্লাইমেট ফান্ডের (সিআইএফ) নাগরিক সমাজ পর্যবেক্ষক ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘মেঘের নিচে ও ওপরের তাপমাত্রা যত বাড়ছে বজ্রপাত তত বাড়ছে। আমাদের দেশেও যে অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি সেখানে বজ্রপাত বাড়ছে। হাওর এবং উত্তরাঞ্চলেও বজ্রপাত হচ্ছে। তাই বজ্রপাত কৃষকের গায়ে আসার আগেই ক্যাপচার করে ফেলতে পারে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যেভাবে কৃষক মরছে তাতে এক সময় কৃষকই থাকবে না। তখন তো খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে।’ বজ্রপাত নিরসনে অঞ্চলভিত্তিক ট্যাকিং ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে বৈশ্বিকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় ৩ শতাংশ। ৭-৮ বছর যাবত শিপ অ্যাভিয়েশন ট্যাক্স ধার্যের ব্যাপারে জানানো হচ্ছে। যেসব জাহাজ ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করবে তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণে ট্যাক্স দিতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশে না বরং বৈশ্বিকভাবে করতে হবে। বিশ্বের জাহাজ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে চুক্তি করতে হবে।’

‍রিনিউবল এনার্জি ব্যবহারকারীদের প্রণোদনা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘জাহাজ যে রুটেই চলাচল করুক সমুদ্রবন্দরে ঢুকলেই তাকে ট্যাক্স দিতে হবে। যখন সে দেখবে ফসিল ফুয়েলের চেয়ে ‍রিনিউবল এনার্জিতে ব্যয় কম তখন জাহাজগুলো এদিকে ঝুঁকবে। এতে তাপমাত্রা কমবে।’

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে করণীয়

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছে। সেসবের মধ্যে রয়েছে—

আকাশে ঘনকালো মেঘ দেখা দিলে বজ্রপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়। এ সময় ঘরে অবস্থান করতে হবে।

খুব প্রয়োজন হলে রাবারের জুতা পরে বাইরে যাওয়া যেতে পারে তবে বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, খোলা মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না।

বজ্রপাতের সময়ে ধানক্ষেত বা খোলা মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে, কানে আঙ্গুল দিয়ে, মাথা নিচু করে বসে পড়তে হবে। যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি টিনের চালা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।

উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক তার বা ধাতব খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। 

বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভিতর অবস্থান করলে, গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটানো যাবে না। 

মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ল্যান্ডফোন, টিভি, ফ্রিজসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। 

বজ্রপাতের সময়ে ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা যাবে না। 

এ সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরা যাবে না, তবে নদীতে থাকলে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা