সাইফুল হক মোল্লা দুলু, হাফিজুর রহমান চয়ন হাওরাঞ্চল ও সাইদুর রহমান আসাদ
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৫ ১১:৩৯ এএম
ধান কাটা উৎসব চলছে হাওরজুড়ে
হাওরজুড়ে উৎসবের
আমেজ। বাতাসে দুলছে বোরো ধানের সোনালি শিষ। মাঠের সোনারঙা ধানের সঙ্গে কৃষকের হাসিতে
মাখামাখি হাওরের পরিবেশ। কারও মাথায় গামছা, কারও মাথায় মাথাল আর হাতে কাস্তে নিয়ে মাঠে
ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করছেন কৃষক-শ্রমিক। বৈশাখের খর রৌদ্রে পুড়ে যাওয়া চরাচরে
রাশি রাশি ধান কাটা, বাড়িতে নেওয়া, মাড়াই এবং সেদ্ধ করায় ব্যস্ত হাওরের নারী-পুরুষ।
সব মিলিয়ে হাওরের চোখ-ধাঁধানো সাজ প্রকৃতিকেও রাঙিয়ে তুলেছে। কৃষকের দীর্ঘ অপেক্ষা
শেষে ঘরে উঠছে সোনালি ধান। তবে এমন বাম্পার ফলনে হাসি থাকলেও ধানের দাম নিয়ে খুশি
নন কৃষক। ধান কেটে গোলায় তোলার পরও দুশ্চিন্তা রয়েছে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া নিয়ে।
বিস্তীর্ণ হাওরের
যতদূরে চোখ যায় শুধু ধান আর ধান। এবার অনাবাদি ছিল না কোনো জমি। এমনকি অনাবাদি ছিল
না বাড়ির আঙিনাও। তাই যেকোনো আগন্তুকের কাছে হাওরকে মনে হবে ধানের সমুদ্র।
এবারে ৮০ ভাগ পাকলেই
ধান কাটার তাগিদ ছিল কৃষি বিভাগের। কৃষকও চাইছেন শতভাগ ধান গোলায় তুলতে। কৃষকরা জানান,
২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে
আগেভাগে ধান কাটা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব ধান কেটে ঘরে তুলতে চান তারা। এ কারণে হাওরে
অন্যবারের চেয়ে ব্যস্ততা বেশি।
এদিকে ধান সংগ্রহের
জন্য মাঠে ভিড় করছে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা। তারা মাঠ ও গোলা থেকে নতুন
ধান মজুদ করে বাড়তি ফায়দা লোটার পাঁয়তারা করছে। রয়েছে পাওনাদার-দাদনদারদের সুদের অর্থ
আদায়েরও তাগিদ।
এদিকে ধান কাটার
পাশাপাশি ধানের কেনাবেচাও শুরু হয়েছে। বাল্কহেড ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রতিদিন শত শত
মণ ধান আসছে হাওরের প্রধান পাইকারি বাজার চামড়া নৌ-বন্দরসহ বিভিন্ন বাজারে। নতুন বোরো
ধান প্রতি মণ (৪০ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা থেকে ৮৩০ টাকায়। অথচ শুরুতে ধানের দাম
ছিল মণপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা।
অথচ ধানের দাম মণপ্রতি
২০/২৫ টাকা কমে যাচ্ছে। হাওরের কৃষক বলছেন, এক মণ ধান উৎপাদন করতে তাদের খরচ হয়েছে
এক হাজার ৫০ টাকা। ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে
কৃষককে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
অথচ সরকার চলতি
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে ধান, চাল ও গমের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে। চলতি
বোরো মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান কেনা হবে। আর ৪৯ টাকা কেজি দরে ১৪
লাখ টন সিদ্ধ চাল কেনা হবে বলে গত ৯ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠক
শেষে জানিয়েছেন খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। এ সময় তিনি বলেন, আগামী
২৪ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান-চাল সংগ্রহ করা হবে।
তবে সরকার ধান-চালের
মূল্য নির্ধারণ করে ক্রয় অভিযান শুরুর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে সরকারি ধান-চাল ক্রয়কেন্দ্রগুলো
এখনও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাষিরা।
এ বিষয়ে একাধিক
কৃষক জানান, ‘এমন চলতে থাকলে একসময় কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারাবে।’ তাদের মাথায় দুশ্চিন্তা
ভর করছে, সুদ ও লগ্নির টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে।
কিশোরগঞ্জ জেলা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ‘চলতি বছর জেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ১১৫ হেক্টর
জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ হেক্টরই হয়েছে হাওরের তিন উপজেলাÑ ইটনা,
মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে।’
সরেজমিনে নিকলী
উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত বড় হাওরে গেলে কৃষকরা জানান, জমিতে ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা
পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, ধান বিক্রি করে তা দিয়ে পোষায় না। বর্তমানে ভেজা ধান
৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা
জানান, ভেজা ধান কেনার পর তাদের শুকাতে হচ্ছে। তাই বর্তমানে ধানের দাম কম। এ ছাড়া মিলমালিকরা
এখনও ধান কেনা শুরু না করায় কৃষকরা বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন না।
নিকলীর সিংপুর গ্রামের
কৃষক ফজলু মিয়া বলেন, ‘ধারকর্জ করে এবার চার একর জমিতে বোরো চাষ করেছি। সেচ খরচ, সার
খরচ আর ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় শ্রমিকের মজুরি খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ
পড়ে যায় প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। ঋণের টাকা পরিশোধ ও শ্রমিক খরচ মেটাতে শুরুতে কিছু
ধান বেচতে হয় আমাদের। কিন্তু আড়ত মালিকরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম কম দিচ্ছেন। এখন
ধান বেচতে হচ্ছে ৮০০ টাকা মণ দরে। অথচ এক মণ ধান চাষে খরচ হয়েছে এক হাজার টাকারও বেশি।’
নিকলীর মজলিশপুর
গ্রামের কৃষক হায়দার আলী বলেন, ‘ধান কাটার মেশিন খরচসহ অন্যান্য খরচে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে
খরচ হয়েছে ৯০০ থেকে সাড়ে ৯০০ টাকা। তবে ১ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে যদি ধান বিক্রি করতে
পারতাম তাহলে প্রকৃত সুফল পেতাম।’
কিশোরগঞ্জ জেলা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
‘হাওরে পাকা ধান দ্রুত কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো ক্ষতি
না করতে পারে। ইতোমধ্যে জেলায় ২৫ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আর
কিছু দিনের মধ্যেই শতভাগ ধান ঘরে উঠবে।’
এদিকে নেত্রকোণার
মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ি এবং সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন হাওরের
পাকা বোরো ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন হাওরের কৃষাণ-কৃষাণী।
পরিবারকে সহায়তা করতে বসে নেই স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও। তারাও আনন্দের সঙ্গে
ধান শুকানো, বস্তায় ভরা ও গো-খাদ্যের জন্য ধানের খড় শুকানোসহ পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা
করছে। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দিনভর হাওর অধ্যুষিত নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি
ও পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগরÑ এ চারটি উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকা
ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কৃষি
কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে এ চারটি উপজেলার বিভিন্ন হাওরে বোরো ধান
আবাদ হয়েছে ৬৯ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে প্রায় ১৬ হাজার
৯৮০ হেক্টর জমিতে এবং খালিয়াজুড়িতে ২০ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জের
ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় বোরো আবাদ হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে। স্থানীয়
কৃষি অফিস জানায়, এ চারটি উপজেলায় হাওরের পাকা বোরো ধান কাটায় প্রায় সাড়ে চারশ হারভেস্টার
মেশিন এবং প্রায় ১৪ হাজার বহিরাগত শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি
মাসের শেষের দিকে সব ক’টি হাওরের বোরো ধান কাটা শেষ হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ জেলার
মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের রৌহা গ্রামের বাসিন্দা কৃষক নজরুল ইসলাম
বলেন, ‘এবার ফলন ভালো হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে কয়েকদিন লাগবে গোলায় ধান তুলতে।’
সুনামগঞ্জ জেলা
কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোস্তফা ইকবাল আজাদ বলেন, ‘এবার সময়মতো বৃষ্টি এবং রোদ
থাকায় জেলায় বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই ধান কাটা শেষ হবে।’
মোহনগঞ্জ উপজেলার
চাঁনপুর গ্রামের কৃষক রতন মিয়া বলেন, ‘আমার প্রতি একর জমিতে ৬৫-৭০ মণ করে ধানের ফলন
হয়েছে। প্রথম দিকে প্রতিমণ ধান বিক্রি করেছি ১০৮০ টাকা দরে। এখন তা বিক্রি করতে হচ্ছে
১০০০ টাকা মণ দরে।’
মোহনগঞ্জ উপজেলা
কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস শাকুর শাদী জানান, ‘উপজেলার ১৬ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে বোরো
ধান আবাদ হয়েছে। গত প্রায় ১৫ দিনে শতাধিক হারভেস্টার মেশিন ও প্রায় আড়াই হাজার বহিরাগত
ধান কাটার শ্রমিক দিন-রাত হাওরের পাকা বোরো ধান কাটায় ব্যস্ত রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে
থাকলে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই হাওরের সব ধান কাটা শেষ বলে আশা করা হচ্ছে।’
এদিকে, নেত্রকোণার
খালিয়াজুড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনও উপজেলার ২০ হাজার ২৩০ হেক্টর
জমির পাকা বোরো ধান এপ্রিলের মধ্যেই কাটা শেষ হবে বলে ধারণার কথা জানান। তিনি বলেন,
‘কৃষকের ফসল কাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পক্ষ থেকে দ্রুত ধান কাটার জন্য প্রতিদিন
মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাওর এলাকায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং অব্যাহত রাখছি।’
নেত্রকোণার সুসং
দুর্গাপুর থেকে কামাল হোসেনসহ ২১ জনের একটি দল নিয়ে সপ্তাহখানেক আগে কিশোরগঞ্জের হাওরে
এসেছেন। দৈনিক এক হাজার টাকা মজুরিতে তারা ধান কাটছেন। কামাল হোসেন জানান, ‘আর ২০ দিনের
মতো থাকবেন। তবে ধান কাটার মেশিন আসায় তাদের কদর অনেক কমে গেছে।’ না হলে এ সময়ে হাওরে
বেশি সময় থেকে আরও বেশি রোজগার করতে পারতেন বলেও জানান তিনি।