এহসানুল হক সুমন, রংপুর
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:০২ এএম
রংপুরের তিস্তা নদীতে দাগি রাজহাঁস। প্রবা ফটো
পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড়তে সক্ষম বিরল দাগি রাজহাঁস শীত মৌসুমে তুষারে ঢাকা পর্বত পেরিয়ে উষ্ণ আবহাওয়া ও খাবারের খোঁজে বাংলাদেশে আসে। সম্প্রতি রংপুরের তিস্তায় এ পাখির দেখা মিলেছে, যদিও সংখ্যায় ছিল মাত্র এক জোড়া। পরিযায়ী পাখির ছবি তোলায় আগ্রহী প্রকৌশলী ফজলুল হক গত সপ্তাহে তিস্তা নদীর চরে এ পাখি দেখতে পান এবং ছবি ধারণ করেন। তিনি জানান, কয়েক বছর পর আবারও তিস্তায় দাগি রাজহাঁস ফিরে এসেছে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আনন্দের বিষয়। তার মতে, পাখিটি শিকারিদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশ্বের অন্যতম উচ্চতাতেই উড়তে পারা এ পাখি মূলত মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, তিব্বত ও কাজাখস্তানের পার্বত্য হ্রদ থেকে শীতকালে দক্ষিণ এশিয়ায় পরিযায়ী হয়ে আসে। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে শীতকালীন অভিবাসনের পর তারা আবার নিজেদের মূল আবাসে ফিরে যায়। সেখানে ফিরে পার্বত্য হ্রদগুলোতে বিচরণ ও প্রজনন করে। দাগি রাজহাঁস বড় জলচর পাখি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ সেন্টিমিটার, ওজন দেড় কেজি থেকে তিন কেজির বেশি হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে ধূসর। সাদা মাথা থেকে সাদা একটি লাইন ধূসর গলার নিচ পর্যন্ত চলে গেছে। মাথায় দুটি স্পষ্ট কালো ডোরা থাকে। ওড়ার সময় এদের সাদা মাথা, ফিকে দেহ ও ডানার কালো আগা স্পষ্ট চোখে পড়ে। এদের চোখ বাদামি, ঠোঁট হলুদ, ঠোঁটের আগা ও নাক কালো। পা ও পায়ের পাতা গাঢ় হলুদ। স্ত্রী ও পুরুষ হাঁসের চেহারা একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথায় ডোরা নেই। মাথার চাঁদি ধূসর-বাদামি, পিঠ ও পেটের রঙ একই রকম। দাগি রাজহাঁস পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতা দিয়ে উড়তে সক্ষম পাখিদের মধ্যে একটি। পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম ৮ হাজার ৪৮৫ মিটারের নেপালের পর্বতশৃঙ্গ মাকালু পার হয়ে শীতকালে এরা দক্ষিণে আসে। প্রকৃতিবিদ ও শারীরতাত্ত্বিকদের প্রশ্ন, কেন দাগি রাজহাঁস হিমালয় পর্বতমালার কম উচ্চতার গিরিপথ দিয়ে না এসে এত বেশি উচ্চতা দিয়ে পরিযান করে। যেখানে অন্য সব পরিযায়ী পাখি অহরহ সেসব গিরিপথ ব্যবহার করে। কয়েক দশক ধরে দাগি রাজহাঁসের সংখ্যা
ক্রমেই কমলেও এখন পর্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছয়নি। সে কারণে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার-আইসিএন এ প্রজাতিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে দাগি রাজহাঁস প্রজাতিটি সংরক্ষিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাগি রাজহাঁস এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার বাহক হতে পারে এবং কাক, দাঁড়কাক, শিয়াল ও ঈগল এদের প্রধান শত্রু। যদিও আইইউসিএন একে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশে এটি সংরক্ষিত পাখির তালিকায় রয়েছে।
সামাজিক বন বিভাগ রংপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, পরিযায়ী পাখিরা যেন তিস্তাসহ অন্যান্য নদীতে নিরাপদে থাকতে পারে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ ছাড়া পাখি শিকার রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।