× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিহঙ্গ

অতি সুন্দর নীল দোয়েল

আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১২:৪৪ পিএম

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:১০ পিএম

ঢাকার দিয়াবাড়িতে অতি সুন্দর নীল দোয়েল। ছবি : লেখক

ঢাকার দিয়াবাড়িতে অতি সুন্দর নীল দোয়েল। ছবি : লেখক

১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এর ঘটনা। দিয়াবাড়ি ১২ নম্বর সেতু পার হয়ে খানিকটা এগোলেই একটি দালানের পাশে চমৎকার এক টমেটো বাগান। বাগানভরা থোকায় থোকায় পাকা টমেটো। বাগানের আশপাশে প্রচণ্ড ভিড়। না, সতেজ ও টকটকে লাল টমেটে কেনার জন্য এই ভিড় নয় মোটেও। কারণ তা হলে তো প্রত্যেকের হাতে থাকত থলে বা ব্যাগ। কিন্তু তাদের হাতে তো দেখা যাচ্ছে লম্বা লম্বা লেন্সের দামি দামি ক্যামেরা। কিন্তু সবাই এই লেন্স নিয়ে দালান ও টমেটো বাগানের আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন কেন? সে গল্প বলার আগে আমি কীভাবে ওখানে গেলাম সেটা আগে বলি। 

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাখির সঙ্গে, বিশেষ করে ভুবন চিলের উড়োজাহাজের সংঘর্ষের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সে কারণে ‘বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ’-এর আহ্বানে বিমানবন্দরের ভেতর ও আশপাশে বসবাসকারী ও আনাগোনা করা পাখিগুলো নিয়ে একটি জরিপকার্য পরিচালনা করছি। আর সে কাজে বিমানবন্দর হয়ে প্রায়ই দিয়াবাড়ির পাখিদের খোঁজখবরও নিতে হয়। সেদিনও বিমানবন্দরের কাজ সেরে দিয়াবাড়ি গেলাম। ১২ নম্বর সেতু পার হতেই লোকজনের ভিড় চোখে পড়ল। অবশ্য ডা. নিসর্গ অমি আমাকে আগেই বলেছিল টমেটো বাগানের আশপাশে সম্প্রতি অতি সুন্দর এক পাখি দেখা গেছে। আর সে কারণেই লম্বা লম্বা লেন্স নিয়ে এত আলোকচিত্রীর ঢল নেমেছে ওখানে। 

কাজেই আমার দৈনন্দিন পাখি জরিপকাজের সাথে সাথে এ রকম একটি সুন্দর পাখি দেখার সুযোগ হাতছাড়া করব কেন। কাজেই বিকাল ৩টার আগেই ওখানে পৌঁছে গেলাম। ঠিক ২০ মিনিট পর পাখিটি এসে উঁচু দালানটির পাশের একটি বৈদ্যুতিক তারে বসল। কিন্ত ওখান থেকে ভালো ছবি হচ্ছিল না। তবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাখিটি টমেটো বাগানের কাছে একটি খুঁটিতে গিয়ে বসল। আমরা ওর পিছু নিলাম। কিন্তু কাছাকাছি যেতেই সে পালাল। কয়েকটি প্লট পার হয়ে একটি খালি প্লটের দেয়ালে গিয়ে বসল। বসামাত্রই চমৎকার ভঙিমায় একটি শুয়োপোকা ধরে উদরপূর্তি করল। তবে সেদিন রোদ কম থাকায় ছবি ভালো হলো না। চার দিন পর আবারও ওর খোঁজে দিয়াবাড়ি গেলাম। বেলা ৩:৩৪-এ টমেটো বাগানের উল্টো পাশের একটি দেয়ালের ওপর বসে থাকা অবস্থায় ওকে পেলাম। এবার ওর কিছু ভালো ছবি তোলা গেল। 

পাখিটিকে প্রথম দেখি কাপ্তাইয়ে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে, বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের গেটের উল্টোপাশে। কিন্তু সেদিন ওর ছবি তুলতে ব্যর্থ হই। পরে দেখি কাপ্তাইয়ের পাশে রাঙ্গুনিয়ায় শেখ রাসেল অ্যাভিয়ারি ও ইকোপার্কে, বেশ দূর থেকে। ২০১৫ সালের মার্চে দেখা হলো সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর দেখলাম কক্সবাজারের দরিয়া নগরে, বেশ কাছ থেকে। এরপর ২০১৯ সালের মার্চে রাঙামাটির সাজেক উপত্যকায়। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে দেখলাম জানুয়ারি ২০২০-এ। সর্বশেষ আবারও দেখা হলো ৮ ডিসেম্বর ২০২৪-এ সাজেকে। 

এতক্ষণ অতি সুন্দর যে পাখিটির গল্প বললাম সে আর কেউ নয়, এ দেশের এক দুর্লভ পরিযায়ী পাখি নীল দোয়েল (Blue Rock Thrush)। অবশ্য এ নামে সে বেশি পরিচিত নয়। নীল শিলাদামা বা নীল থ্রাস নামেই বেশি পরিচিত। Muscicapidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Monticola solitarius। মূলত দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আবাসিক পাখি এটি। শীতে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে পরিযায়ী হয়। 

নীল দোয়েল দৈর্ঘ্যে ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার ও ওজনে মাত্র ৩৭ থেকে ৭০ গ্রাম। স্ত্রী ও পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য থাকে। তা ছাড়া পার্থক্য থাকে প্রজনন ও অপ্রজনন মৌসুমের পাখির পালকের রঙে। প্রজননকালে পুরুষের পুরো দেহের পালকের রঙ হয় গাঢ় নীলচে-ধূসর; আর ডানা ও লেজ হয় কালচে-বাদামি। কিন্তু অন্য সময় নীলচে দেহে থাকে বাদামি-পীতাভ আভা। অন্যদিকে প্রজননকালে স্ত্রীর দেহের পালকের রঙ হয় ধূসর-বাদামি; গলা, কান-ঢাকনি ও বুকে থাকে গাঢ় আঁশের মতো ডোরা ও নীলচে আভা। স্ত্রী-পুরুষ-নির্বিশেষে চোখ বাদামি। সরু ও লম্বা ঠোঁটের রঙ কালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে অনেকটা স্ত্রীর মতো; তবে দেহে নীলের আভা নেই ও মাথার চাঁদি ও কাঁধ-ঢাকনিতে পীতাভ রঙের আঁশের মতো ডোরা থাকে। 

নীল দোয়েল মাল্টার জাতীয় পাখি। শীতে এ দেশের প্রায় সবখানেই দেখা মেলে, তবে সংখ্যায় বেশ কম। এরা সচরাচর পাথরের ঢাল, পাথুরে নদীতট, পাথরের খাদ, উন্মুক্ত বন, পতিত জমি ও লোকালয়ে বিচরণ করে। প্রজননকাল ছাড়া অন্য সময় একাকী দেখা যায়। শীতে পোঁতা বাঁশ বা বাঁশের খুঁটি, মরা তাল-নরকেলের শীর্ষদেশ, পুরোনো মঠ, মন্দির ও মসজিদের ছাদ বা চূড়া প্রভৃতিতে বসে থাকে শিকারের খোঁজে। বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, ছোট ব্যাঙ, টিকটিকি, অঞ্জনের ছানা ইত্যাদি শিকার করে ওখানে এসে বসে খায় ও পরবর্তী শিকারের অপেক্ষায় থাকে। তা ছাড়া পাকা ও রসালো ফল খেতেও পছন্দ করে। এমনিতে তেমন একটা ডাকাডাকি না করলেও প্রজননকালে পুরুষ পাখি ‘টক-টক, চ্যার-চিট---’ স্বরে ডাকে। 

এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় মূল আবাস এলাকার খাড়া পর্বত, শিলা, দেয়ালের ফাটল বা গাছের গর্তে ঘাস, গাছের শিকড় ও চুল দিয়ে বাটির মতো বাসা বানায়। বাসা তৈরি হয়ে গেলে তাতে ৩ থেকে ৫টি নীল রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয় ও প্রায় ১৫ দিনে ডিম থেকে ছানা ফোটে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই ছানার যত্ন নেয়। ছানারা ১৫ থেকে ১৭ দিনে উড়তে শেখে। 

লেখক: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা