বিহঙ্গ
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:২১ পিএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:২১ পিএম
ভারতের হায়দরাবাদের গোলকোন্দা দুর্গে পুরুষ হীরামন টিয়া। ছবি : লেখক
জীবনের প্রথম ওদের দেখি কোনো এক পাখি বিক্রেতার কাছে, সেই ছেলেবেলায়। সেই থেকেই ওদের রূপে মুগ্ধ হয়েছি। তবে প্রকৃতিতে প্রথম দেখি ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে আমার কর্মস্থল গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) ক্যাম্পাসে। এর পর বহু বছর পার হয়ে গেছে। বহুবার ওদের দেখেছি। কিন্তু টকটকে লাল মাথার পুরুষটির দেখা পাইনি কখনও। যদিও ২০১৯ সালের শুরুতে বশেমুরকৃবি ক্যাম্পাসে ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবুডাইং-এ লাল মাথার পুরুষটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কিন্তু ছানা ও স্ত্রী পাখির ছবি তুলতে পারলেও শতচেষ্টা করে পুরুষটির একটি ছবি তুলতে পারলাম না। মনের দুঃখ মনেই রইল।
একই বছর নভেম্বরে ভারতের হায়দরাবাদে গেলাম বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ওপর অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপনার জন্য। সম্মেলন শুরুর আগের দিন অর্থাৎ ১২ নভেম্বর হায়দরাবাদের ঐতিহাসিক স্থান গোলকোন্দা দুর্গ পরিদর্শনে গেলাম। পুরোনো দুর্গের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আবিষ্কার করলাম লাল মাথার সেই পুরুষ পাখিটিকে। সঙ্গে অবশ্য ধূসর মাথার স্ত্রীটিও ছিল। তবে একটি দুটি নয়, অগণিত পাখি ছিল ওখানে। পুরোনো দুর্গের ইটের ফাঁকফোকরে ছিল ওদের বাসা। আর যাবে কোথায়? বহু দিনের জমানো ক্ষোভের পরিসমাপ্তি ঘটল ওদের চমৎকার কিছু ছবি তোলার মধ্য দিয়ে।
লাল ও ধূসর মাথার এই পাখিগুলো লম্বায় ৩৩ থেকে ৩৭ সেন্টিমিটার। এর মধ্যে লেজই ২২ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার। আর ওজন মাত্র ৫৬ থেকে ৮৫ গ্রাম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পালক হলদে সবুজ বা হালকা সবুজ। চঞ্চু হুকের মতো বাঁকানো। নীলচে সবুজ লেজটি সরু, যার আগা সাদা। পুরুষের মাথার রঙ আলুবোখারা (Plum) ফলের মতো গাঢ় বেগুনি-লাল। চিবুক কালচে। ঘাড়-গলাজুড়ে রয়েছে কালো বন্ধনী, যা চিবুকের কালোর সঙ্গে মিশে গেছে। কাঁধে আছে মেরুন-লাল দাগ। স্ত্রীর মাথার রঙ হালকা ধূসর; যা একটি হলদে বন্ধনী দিয়ে ঘেরা থাকে। কাঁধের ওপরের দাগটিও হলুদ। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চোখের মণি হলদে-সাদা, পা ও পায়ের নালা সবুজে ধূসর। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পুরো দেহ সবুজে মোড়ানো। মাথা সবুজ, গাল ও কপাল হলদে।
ওরা বনের প্রান্ত যেখানে কৃষিজমির সঙ্গে মিশেছে সেখানে, ফলের বাগান ও উন্মুক্ত বনে থাকতে পছন্দ করে। সচরাচর ছোট দলে থাকে। পাকা ফল, ফুল ও ফসল দেখলে খেতে নেমে আসে। শস্য, ফল, কুঁড়ি, ফুলের পাপড়ি ও মধুরেণু খেতে পছন্দ করে। ‘হুইট-হুইট-হুইট… ’ শব্দে ডাকে। উড়ন্ত অবস্থায় বেশি ডাকে।
জানুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় যেকোনো গাছের জুতসই কোনো খোঁড়লে ওরা বাসা বাঁধে। কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরি বা অন্যান্য খোঁড়লবাসী পাখিদের বাসা দখল করে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। অনেক সময় কাঠের ছিলকা দিয়ে বাসার গদি তৈরি করে। স্ত্রী ৪ থেকে ৬টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ২১ থেকে ২৩ দিনে। ডিমে তা দেওয়া, ছানাদের খাওয়ানো ও লালনপালনের কাজ স্ত্রী একাই করে। পুরুষ ৩০ মাস ও স্ত্রী ১৫ মাসে প্রজননক্ষম হয়। প্রকৃতিতে ওরা ৭ থেকে ৮ বছর বেঁচে থাকে।
আজকের গল্পের এই লাল ও ধূসর মাথার পাখিগুলো এদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি হীরামন টিয়া। লাল মাথা টিয়া, ফুলটুসী বা আলুবোখারা মাথা টিয়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Plum-headed Parakeet। মাথার রঙ ও লেজের আগার সাদা দাগের মাধ্যমে এদের একই গোত্রের কইরিদি বা ফুলমাথা টিয়া (Blossom-headed Parakeet) থেকে পৃথক করে চেনা যায়। সিটাসিডি (Psit-tacidae) গোত্রের এই টিয়ের বৈজ্ঞানিক নাম Psittacula cyanocephala (সিটাকুলা সায়ানোসেফালা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভুটান, ভারত, নেপাল, চীন, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডেও ওদের দেখা মিলে।
লেখক : পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ