বাকৃবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:০৪ পিএম
বাংলাদেশের নারিকেল গাছে শনাক্ত হওয়া সাদা মাছির নতুন প্রজাতি
বাংলাদেশের নারিকেল গাছে সাদা মাছির নতুন একটি প্রজাতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। এ প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম প্যারালেইরোডেস বোন্দারি (Paraleyrodes bondari) এবং এটি বাংলায় বোন্দার নেস্টিং সাদা মাছি নামে পরিচিত।
এই নতুন প্রজাতি শনাক্ত করেছেন বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. গোপাল দাস ও তার গবেষণা দল। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে ‘রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই-এর বায়ো-ইকোলজি এবং মরফো-মলিকুলার অধ্যয়ন ও গবেষণাগারে এই পোকার বিরুদ্ধে কিছু নতুন জেনারেশনের কীটনাশকের কার্যকারিতা মূল্যায়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায় এ গবেষণা করা হয়। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির সহগবেষক ছিলেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মো. সোহেল রানা।
নারিকেল বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়িতে নারিকেল গাছ দেখা যেত। তবে বর্তমানে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণে নারিকেল গাছের সংখ্যা ও ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নারিকেলের সাদা মাছি (রুগোস স্পাইরালিং হোয়াইট ফ্লাই) এই ক্ষতির অন্যতম কারণ।
২০১৯ সালে নারিকেলের সাদা মাছি প্রথমবার শনাক্ত হয়। এরপর থেকেই সারা দেশে এটির বিস্তার ও ক্ষতির মাত্রা নিয়ে গবেষণা চলছে। এ ধারাবাহিকতায় ড. গোপাল দাসের নেতৃত্বে সাদা মাছির বিভিন্ন প্রজাতি চিহ্নিতকরণ এবং এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়।
গবেষক দল যশোর, খুলনা এবং বাগেরহাট অঞ্চলের নারিকেল গাছ থেকে সাদা মাছি সংগ্রহ করে গবেষণাগারে নিয়ে যান। সেখানে মাছির মরফোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বোন্দার নেস্টিং সাদা মাছির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।
গবেষক ড. গোপাল দাস বলেন, আমরা দেশব্যাপী জরিপের মাধ্যমে এই পোকার ৬১টি পোষক উদ্ভিদ শনাক্ত করেছি, যা আমেরিকার একটি জার্নালে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে আমরা এই পোকার বায়ো-ইকোলজি, প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং এর ওপর বিভিন্ন জৈব-বালাইনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করছি। প্রজাতি শনাক্তকরণের জন্য আমরা দেশের ৩০টি এগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোন থেকে সাদা মাছি সংগ্রহ করেছি।
নতুন প্রজাতির মাছির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষক ড. গোপাল দাস জানান, নতুন প্রজাতিটি আকারে খুবই ছোট (১.১ থেকে ১.২ মিলিমিটার)। এর সামনের পাখায় ধূসর রঙের ক্রস-চিহ্নযুক্ত ব্যান্ড রয়েছে। অন্যান্য সাদা মাছি স্পাইরাল আকারে ডিম পাড়লেও, এরা মোম এবং তুলা দিয়ে পাখির বাসার মতো জায়গা তৈরি করে সেখানে ডিম পাড়ে। এদের ডিমে পাতার বোঁটার মতো থাকে, যা অন্য সাদা মাছিতে দেখা যায় না।
নতুন প্রজাতির মাছি হুমকির কারণ হওয়ার বিষয়ে ড. গোপাল দাস বলেন, ২০১৮ সালে ভারতের কেরালায়, ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে এবং ২০২৪ সালের শুরুর দিকে শ্রীলঙ্কায় বোন্দার নেস্টিং সাদা মাছি শনাক্ত করা হয়। এটি নারিকেলের সাদা মাছির তুলনায় বেশি ডিম পাড়ে ও দ্রুত প্রজনন সক্ষম। ভারতের গবেষণায় দেখা গেছে, সাদা মাছির সংখ্যা কমে গিয়ে এই নতুন প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু ভারতের মতো হওয়ায় পোকাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা নারিকেল উৎপাদনে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এর ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
অধ্যাপক গোপাল দাস বলেন, নতুন পোকাটির ক্ষতির ধরন নারিকেলের সাদা মাছির মতো হলেও এর ভয়াবহতা নির্ধারণে বায়োলজি, প্রজনন সক্ষমতা ও বৃদ্ধির হার নিয়ে গভীরতর গবেষণা প্রয়োজন। তিনি নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করে উপকারী পোকাগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষণের পরামর্শ দেন।