আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:১৪ পিএম
ছেঁড়া দ্বীপের প্রবাল প্রাচীরের ওপর দিয়ে উড়ন্ত একজোড়া ছোট কোঁরচে বক। ছবি : লেখক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিনের (প্রাণিচিকিৎসা) চতুর্থ বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে ১১ ডিসেম্বর নারিকেল জিঞ্জিরা (সেন্টমার্টিন) দ্বীপে এসে পৌঁছেছি। পরের দিন বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রধান সৈকতে ঘোরাঘুরি করে শাহাবুদ্দিনের অটোরিকশায় চাপলাম ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়ার জন্য। প্রথমে দ্বীপের ভেতরের রাস্তা দিয়ে অটো এগিয়ে চললেও ২৭ মিনিট পর অটো সৈকতের বালির ওপর দিয়ে চলতে শুরু করল। মাঝে মাঝেই বালিতে চাকা আটকে যাচ্ছিল। আর আমরা অটো থেকে নেমে সেটিকে ঠেলে ঠেলে তুলছিলাম। একপাশে প্রবাল প্রাচীরসহ সৈকত ও অন্যপাশে কেয়ার প্রাকৃতিক বাগান। মাঝখান দিয়ে চলছে আমাদের অটো। বেশ ভালো লাগছে।
আমি প্রবালের ফাঁকে ফাঁকে পাখি আছে কি না দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনো পাখিরই দেখা পাচ্ছিলাম না। সোনাদিয়া দ্বীপে প্রচুর পাখির সমাগম হলেও সেন্টমার্টিনে পাখির সংখ্যা নগণ্য। তবে কাকের সংখ্যা প্রচুর। অবশ্য, মাঝে মধ্যে আকাশে কিছু পায়রাও উড়তে দেখা যাচ্ছিল। এভাবে সৈকত দিয়ে আরও ২৫ মিনিট চলার পর প্রবাল প্রচীরের কিছু ছবি তোলার জন্য অটো থামালাম। অবশ্য অতি বিরল প্যাসিফিক রিফ ইগ্রেট বা প্রশান্ত শৈল বগাও খুঁজছিলাম। কিন্তু পাখিটির কোনো চিহ্নও চোখ পড়ল না। এ বছর বোধহয় পরিযায়ী এই পাখিটি আসেনি। যাই হোক ছবি তোলার একপর্যায়ে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে সাদা কিছুর নড়ন-চড়ন চোখে পড়ল। আর খানিক পরেই প্রবাল প্রাচীরের গোপন আস্তানা থেকে তিনটি সাদা রঙের ছোট বক আকাশে উড়ল। বক তিনটির হলুদ পায়ের তলা দেখে ওদের চিনতে মোটেও কষ্ট হলো না। যদিও এগুলো এদেশে প্রচুর দেখা যায়, কিন্তু এরকম প্রবাল প্রাচীরের ওপর উড়তে থাকা সাদা বক দেখা সহজ নয়। তবে পাখিগুলো আমাদের থেকে বেশ দূরে থাকায় ভালো ছবি তুলতে পারলাম না। তবে যা পেলাম তাতেই খুশি। কারণ, পাখি, সমুদ্র ও প্রবাল মিলে একটি অনন্য সাধারণ কম্পেজিশন সৃষ্টি হয়েছে।
ছেঁড়া দ্বীপের প্রবাল প্রাচীরে দেখা হলুদ পায়ের ধবধবে সাদা বকগুলো এদেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি ছোট কোঁরচে বক। ছোট বক, সাদা বক বা ধূপ বক নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Little Egret। আরডেইডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Egretta garzetta। ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশে ওদের দেখা মেলে।
ধবধবে সাদা ছোট কোঁরচে বকের দেহের দৈর্ঘ্য ৫৫ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৮৮ থেকে ১০৬ সেন্টিমিটার ও ওজন ৩৫০ থেকে ৫৫০ গ্রাম। আকারে বেশ ছোট বকটির পুরো দেহ ধবধবে সাদা। তবে পা কালো, পায়ের তলা ও আঙুল হলুদ। চঞ্চু কালচে। প্রজনন মৌসুমে মাথার ওপর থেকে পেছন দিকে দুটি ঝুঁটির পালক ঝুলে থাকে। তা ছাড়া বুক ও পিঠে কিছু সুতোপালক গজায়। চঞ্চু ও চোখের মাঝখানের নীল-ধূসর চামড়া লালচে রঙ ধারণ করে। চোখের রঙ হয় হলুদ। মুখের সংযোগস্থল ও নিচের চঞ্চুর গোড়া হয় হলদে। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। প্রজননহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির সুতোপালক ও ঝুঁটি থাকে না। চিকন গলা, সরু কালো চঞ্চু এবং কালো পা ও হলুদ আঙুলের মাধ্যমে গো-বক থেকে সহজেই ওদের পৃথক করা যায়।
পুরো দেশের যেকোনো ধরনের জলাশয়ে ওদের দেখা মেলে। সচরাচর অন্যান্য প্রজাতির বক ও জলচর পাখির মিশ্র দলে বিচরণ করে। অগভীর পানিতে ধীরে ধীরে হেঁটে বা দাঁড়িয়ে থেকে শিকার খোঁজে ও ড্যাগারের মতো চোখা চঞ্চুটি দিয়ে ছোট মাছ, ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ, ছোট সাপ, চিংড়ি ইত্যাদি শিকার করে খায়। সচরাচর নীরব থাকে, তবে মাঝেমধ্যে নাকি সুরে ‘ক্র্যায়াক…’ শব্দে ডাকে।
বর্ষা অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস ওদের প্রজননকাল। এ সময় অন্যান্য জলচর পাখির সঙ্গে গাছের শাখায় সাধারণত উপনিবেশ বা কলোনি বাসা গড়ে তোলে। ডালপালা দিয়ে তৈরি এ বাসা দেখতে অনেকটা থালার মতো। ডিম পাড়ে ৩ থেকে ৫টি, রং ফ্যাকাশে নীলাভ-সবুজ। ডিম ফোটে ২১ থেকে ২৫ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ দুজনেই পালাক্রমে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের যত্ন করে। ছানারা ৪০ থেকে ৫০ দিনে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। ওরা প্রায় ছয় থেকে সাত বছর বেঁচে থাকে।
লেখক : পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ