মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম, হিলি (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:২৩ পিএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৪ ১৪:২২ পিএম
ফাইল ফটো
দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলায় আমন ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। আবার হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আসছে ভারতীয় চাল। তার পরও খুচরা বাজারে কমছে না চালের দাম।
চলতি মৌসুমে ধানের দাম বেশি, যার কারণে কমছে না চালের দাম বলছেন, অটো রাইস মিল মালিক ও ধান ব্যবসায়ীরা। ভারতে চালের দাম বেশি, এজন্য আমদানিকৃত চাল কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না বলছেন আমদানিকারকরা। এদিকে ভরা মৌসুমেও কম দামে চাল না কিনতে পেরে ক্ষুব্ধ সাধারণ ক্রেতারা।
ধানের জেলা দিনাজপুর, দেশের সিংহভাগ ধান উৎপাদন হয় এ জেলায়। চলতি মৌসুমে হাকিমপুর উপজেলায় ৮ হাজার ১৭ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। মাঠে মাঠে পাকা ধানের সমাহার। দেখে মনে হবে সোনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কৃষক ব্যস্ত হয়ে পড়েন ধান কাটা-মাড়াইয়ে। জেলায় প্রায় ৭৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে অধিকাংশ কাটা ধান মাঠে রয়েছে। এবার ধানের বাজার চড়া, ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকা মণ দাম পাচ্ছেন কৃষক। সরকার নেবে এসব ধান ১৩২০ টাকা মণ দরে।
জেলার বিভিন্ন অটো রইস মিল ঘুরে দেখা যায়, এখনও এ অঞ্চলের ধান মিল মালিকরা কিনতে পারেননি। কেননা কৃষকের ধান মাঠেই পড়ে আছে। তবে মিল মালিকরা বাইরের জেলা থেকে বেশি দামে, ৩২ থেকে ৩৪ টাকা কেজি দরে কিনে আনছেন। এসব ধান থেকে চাল প্রস্তুত করে দাম পড়ে ৫০ টাকার ওপরে। আবার চিকন জাতের চালের পড়তা পড়ে ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা কেজি।
দেশের বাজারে চালের দাম স্বাভাবিক রাখতে বিনা শুল্কে ভারত থেকে চাল আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এরই আলোকে ১১ নভেম্বর ভারত থেকে হিলি স্থলবন্দরে শুরু হয় চাল আমদানি। দুই সপ্তাহে এ বন্দরে ২৮৫ গাড়িতে প্রায় ১০ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন চাল আমদানি হয়েছে। এসব চাল ৪১০ মার্কিন ডলারে আমদানি করছেন আমদানিকারকরা।
আমন ধানের কাটা-মাড়াই শুরু এবং পর্যাপ্ত ভারতীয় চাল আমদানি হলেও তার কোনো প্রভাব পড়েনি হিলির খুচরা বাজারে। ভারত থেকে আমদানি স্বর্ণা-৫ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। আর দেশি মিনিকেট ও সম্পাকাটারি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৭০ টাকা কেজি দরে। ভরা মৌসুমে কম দামে চাল কিনতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
হিলি বন্দর খুচরা বাজারে চাল কিনতে আসা হাবিবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখন ধানের মৌসুম, আবার ইন্ডিয়া থেকে গাড়ি গাড়ি চাল আমদানি হচ্ছে। তার পরও চালের দাম কম হচ্ছে না কেন? প্রতি বছর এ সময় নতুন ধান উঠলে বাজারে চালের দাম অনেক কমে যায়। কিন্তু এবার বাজারের চিত্র উল্টো।’
আইনুল নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত ধানের আবাদ হয়েছে। তার পরও দাম কমছে না কেন? আমরা গরিব মানুষ, দাম না কমলে কীভাবে চলব। হয়তো সিন্ডিকেটের কারণে দাম কমছে না। তাই আমি মনে করি প্রশাসন বাজার মনিটরিং করলে দাম অনেকটা কমে যাবে।’
হিলি বাজারের চাল ব্যবসায়ী স্বপন শাহ বলেন, ‘বাজারে এখনও নতুন চাল আমদানি হয়নি। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে নতুন চাল বাজারে আসবে। আমরা ভারত থেকে আমদানি স্বর্ণা-৫ চাল ৫৩ টাকা কেজি হিসেবে পাইকারি কিনছি। তা ৫৪ টাকা কেজি দরে খুচরা বিক্রি করছি। বাজারে দেশি মিনিকেট ও সম্পাকাটারি ৭০ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি করছি। তবে বেচাকেনা অনেকটা কম, নতুন চাল উঠলে দামটাও কমে যাবে।’
হিলি বন্দরে চাল আমদানিকারক ললিত বাবু বলেন, ‘কয়েক দিন থেকে আমাদের চাল তেমন কোনো বিক্রি নেই। তিন দিন আগে মোটা চাল ৫৩ টাকায় বিক্রি করেছিলাম, বর্তমান ৫১ বা ৫২ টাকা কেজি হিসেবেও কেনার ক্রেতা নেই। নতুন চাল বাজারে উঠে যাবে যার কারণে কেউ ভয়ে চাল কিনছে না, হয়তো দাম কমে যাবে। যেহেতু আমদানি করা চাল বিক্রি নেই, তাহলে ভারতে দামটা কমতে পারে।’
হিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম রেজা আহমেদ বিপুল বলেন, ‘বাংলাদেশে চালের ঘাটতির কারণে সরকার ভারত থেকে চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। হিলিসহ বিভিন্ন বন্দর দিয়ে পর্যাপ্ত চাল আমদানি হচ্ছে। তার পরও দাম কমছে না কেন? আমার মনে হয় দেশে বড় একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে। যার কারণে বাজারে চালের দাম কমছে না। আমি মনে করি ভোক্তা অধিকার যদি ঠিকমতো বাজার মনিটরিং করে তাহলে দাম কমে যাবে।’
হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী বলেন, ‘১১ থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত এ বন্দরে ২৮৫টি গাড়িতে ১০ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন চাল আমদানি হয়েছে। চালগুলো ৫২ থেকে সাড়ে ৫২ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। ভারতে শুল্ক কমানোর জন্য চালের দাম বৃদ্ধি করে দিয়েছেন সে দেশের রপ্তানিকারকরা। এ বন্দরে আমদানিকারকদের অনেক চালের এলসি করা আছে। এসব চাল আমদানি হলে দামও অনেকটা কমে যাবে বলে আশ করছি।’
হিলি কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল ইসলাম বলেন, ‘শুল্কমুক্তভাবে হিলি বন্দরে ৪১০ ডলারে চাল আমদানি হচ্ছে। ১১ নভেম্বর থেকে ভারতীয় ২৮৫ ট্রাকে দুই সপ্তাহে ১০ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন চাল আমদানি হয়েছে এ বন্দরে। যেহেতু চাল একটা নিত্যপণ্য এবং দেশের বাজারে চাহিদা রয়েছে; সেহেতু কাস্টমসের সব কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে ছাড়করণ করা হচ্ছে।’
ফুলবাড়ীর অটো রাইস মিল (মির্জা গ্রুপের) মালিক নুর আলম মির্জা বলেন, ‘নতুন ধান উঠেছে, আবার আমদানিকারকরা ভারত থেকে চাল আমদানি করছেন। কিন্তু চালের দাম কমছে না। আসলে ভারতীয় চাল ৫৩ টাকা কেজি পড়ে যাচ্ছে। আবার আমরা মিল মালিকদের নতুন দেশি গুটি স্বর্ণা জাতের ধান প্রায় ৩৪ টাকা কেজি কিনতে লাগছে। এসব ধান থেকে চাল প্রস্তুত করতে ৫১ টাকা কেজি পড়ছে, স্বর্ণা-৫ চাল ৫৪ টাকা পড়তা পড়ছে। ধানের দাম যদি কম হতো তাহলে আমরা কম দামে বাজারে চাল বিক্রি করতে পারতাম। এ ছাড়া দেশে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী আছেন, যাদের টাকার অভাব নেই, তারা বেশি দামে ধান কিনে মজুদ করে রাখেন; যার কারণে আমরা মিল মালিকরা হিমশিম খাচ্ছি। যদি সরকার এ বিষয়গুলো দেখে তাহলে হয়তো ভালো হয়।’
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোছা. আরজেনা বেগম বলেন, ‘উপজেলায় এবার ৮ হাজার ১৭ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। শীতকালীন সবজি চাষের জন্য কৃষক আগাম জাতের ধান চাষ করেছে। বাজারে বর্তমান ধানের দাম পাচ্ছেন কৃষক ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকা মণ। আশা করছি আমন চাষিরা লাভবান হবেন।’