প্রাণ-প্রকৃতি
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:১১ পিএম
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪ ১৮:৩৮ পিএম
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় লেখকের হাতে পঙ্কসুধা প্রজাপতি। ছবি : লেখক
২৪ এপ্রিল ২০১৫ সালের ঘটনা। বুনো প্রাণের ছবি তুলতে রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে এসেছি। সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমেই পিকনিক স্পটের উল্টো দিকে অবস্থিত বিজিবি ক্যাম্পের পাশ দিয়ে উদ্যানের বড় ছড়ায় নেমে পড়লাম। ক্যাম্প থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে ছড়ার শীতল পানিতে পা ভেজালাম। মুহূর্তেই যেন পুরোটা শরীর জুড়িয়ে গেল। ছড়ায় মিনিট দশেক হাঁটাহাঁটি করে বড় ভিংরাজ, শ্যামা, তুর্কিবাজ ও চোরা বকের ছবি তুললাম। এরপর ছড়া ধরে বনের ভেতরে হাঁটা দিলাম। বেশকিছু প্রজাতির প্রজাপতিকে ছড়ার বালুমাটির রস চুষতে দেখা গেল। ওদের ছবি তুলে পাখি ও প্রজাপতির খোঁজে সামনে এগিয়ে গেলাম। পরপর দুই বাঁক ঘুরে এক জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। কিছুটা ঘেমে গেছি। ক্যামেরা হাতে এদিক-ওদিক পাখি-প্রাণী খুঁজছি, এমন সময় ছোট্ট একটি সাদা-কালো পতঙ্গ এসে আমার ঘর্মাক্ত বাম হাতের ওপর বসল। গায়ে প্রজাপতি বসায় বেশ ভালো লাগল। দ্রুত চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র ইয়াসিন হায়দারের কাছ থেকে আমার পয়েন্ট অ্যন্ড শুট ক্যামেরাটি নিয়ে নিজের বাম হাতে থাকা প্রজাপতির ছবি তুললাম ডান হাতে থাকা ক্যামেরাটি দিয়ে। এর মাস ছয়েক আগে মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান থেকে ওর একটি ছবি তুলেছিলাম।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়া ও মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা সাদা-কালো রঙের পতঙ্গটি এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান ও বিপন্ন প্রজাপতি পঙ্কসুধা। ইংরেজি নাম মালয়ান (Malayan)। লাইকিনিডি (Lycaenidae) গোত্রের সদস্যটির বৈজ্ঞানিক নাম Megisba malaya (মেগিসবা মালাইয়া)। সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে বসবাসকারী প্রজাপতিটিকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।
পঙ্কসুধা ছোট আকারের প্রজাপতি। সাদা-কালো প্রজাপতিটিকে বেশ আদুরে ও স্নিগ্ধ লাগে। প্রসারিত অবস্থায় এর এক ডানার একপ্রান্ত থেকে অন্য ডানার বিপরীত প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য মাত্র ১৯ থেকে ৩০ মিলিমিটার। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রজাপতিটির ডানার মাঝ আঁচলে সাদা ছোপসহ ডানার ওপরাংশ গাঢ় বাদামি। মাঝ আঁচলে এই ছোপটি স্ত্রীর ডানায় সুস্পষ্ট। ডানার নিচটা সাদা থেকে ফ্যাকাশে ধূসর। সামনের ডানার ওপরে পার্শ্বপ্রান্তে একসারি ফুটকি থাকে। খোপেও একটি ফুটকি রয়েছে। ডানার বার-আঁচলে থাকা তির্যক ফুটকিগুলো বক্ররেখা তৈরি করেছে। পেছনের ডানায় পক্ষমূলে তিনটি ফুটকি দেখা যায়।
ওরা স্বল্প উচ্চতার আর্দ্র বনাঞ্চল, বনের কিনারা ও ঝোপঝাড়ে থাকতে পছন্দ করে। সচরাচর দুর্বলভাবে ভূমির কাছাকাছি ওড়ে। পুরুষগুলো কাদামাটি, পাখি ও প্রাণীর মল চুষতে পছন্দ করে।
পঙ্কসুধার জীবনচক্র রাখালচিতা বা রাখালফুলে সম্পন্ন হয়। স্ত্রী প্রজাপতি পোষক গাছের ফুলের কুঁড়ি, ডাঁটি ইত্যাদিতে একটি করে ফ্যাকাশে সবুজাভ ছোট্ট গোলাকার ও চ্যাপ্টা ডিম পাড়ে। ডিমের দেহে বহুভুজাকৃতির অসংখ্য রেটিকুলাম থাকে। তিন দিন পর ডিম ফুটে কালো মাথা ও হলুদ দেহের শুককীট বের হয়। পনেরো থেকে সতেরো দিনে পাঁচবার খোলস পাল্টে শুককীট মুককীটে পরিণত হয়। প্রতিবার খোলস পাল্টানোর পর শুককীটের দেহের বর্ণ গাঢ় হতে থাকে। মুককীটের খোলসাবদ্ধ হতে প্রায় এক দিন সময় লাগে। প্রায় সাত দিন পর খোলসাবৃত মুককীট কালো বর্ণ ধারণ করে। এর এক দিন পর খোলস কেটে বের হয় সাদা-কালো এক সিগ্ধ ছোট্ট প্রজাপতি। ডিমপাড়া থেকে পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি হওয়া অর্থাৎ পুরো জীবনচক্র সম্পন্ন হতে পঙ্কসুধার ২৮ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে।
লেখক: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ