আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৪ ১৬:৫৩ পিএম
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ছড়ার পাড়ে ঝুলে পড়া বাঁশপাতার ওপর লাল চন্দ্রাবল্লী প্রজাপতি। ছবি : লেখক
প্রায় সাড়ে আট বছর আগের ঘটনা। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের গ্রিন ভিউ রেস্ট হাউসে উঠেছি। পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরেই আব্দুর রউফের সিএনজি অটোরিকশায় সোজা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গেলাম। সকাল ৯টা বেজে গেছে। রোদ মোটামুটি উঠেছে। কাজেই রঙিন ডানার ক্ষুদ্র পতঙ্গগুলো ইতোমধ্যে নিশ্চয় রাতের নিবাস থেকে বেরিয়ে এসে প্রাত্যহিক জৈবিক কাজকর্মে লিপ্ত হয়েছে। দ্রুত টিকিট কেটে উদ্যানে প্রবেশ করলাম। তবে চিরাচরিত সোজা পথে না গিয়ে ফটকের ৩০ মিটার সামনে গিয়ে ডান পাশ দিয়ে ছড়ার দিকে নেমে গেলাম। ঘড়ির কাঁটায় ৯টা বেজে ১৭ মিনিট। ভেবেছিলাম নতুন কোনো প্রজাপতি পেতে বেশ সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু না; ছড়ায় নামার সঙ্গে সঙ্গেই দেখি ছড়ার পানি থেকে উঁকি মেরে থাকা একটি পাথরের ওপর কুচকুচে কালো রঙের লেজওয়ালা বড় আকারের একটি প্রজাপতি বসে আছে। একটু ভালোভাবে লক্ষ করতেই দেখলাম ওর কালো রঙের পেছনের ডানার ওপর কতকগুলো লাল চন্দ্রাকার দাগে ঘেরা কালো কালো ফুটকি। বুঝতে আর বাকি রইল না যে দুর্লভ এক প্রজাপতির দেখা পেয়েছি। বছরখানেক আগে মূল সড়ক ধরে হেঁটে গেলে প্রথমেই যে কালভার্টটি পড়ে তার নিচে ওরই এক জাতভাইয়ের দেখা পেয়েছিলাম। যাই হোক, দ্রুত পতঙ্গটির কিছু সাক্ষী ছবি তুলে নিলাম। এরপর অপেক্ষা করতে থাকলাম ভালো কিছু ছবির জন্য। ঠিক ১৩ মিনিট পর একই প্রজাতির আরেকটিকে প্রজাপতি ওর পাশে এসে বসল। এবার দুটিকে একই ফ্রেমে পেয়ে গেলাম। ছয় মিনিট পর পাথরের ওপর থেকে একটি প্রজাপতি উঠে গিয়ে ছড়ার পাড়ে ঝুলে পড়া বাঁশপাতার ওপর বসল। আর সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিলাম ওর কিছু চমৎকার ছবি।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ছড়ায় দেখা এই পতঙ্গটি আর কেউ নয়, এদেশের এক দুর্লভ ও সংকটাপন্ন প্রজাপতি লাল চন্দ্রাবল্লী। পশ্চিমবঙ্গে চান্দা নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Red Helen। চেরালেজি (Swallowtail) গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio helenus (প্যাপিলিও হেলেনাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা যায়।
লাল চন্দ্রাবল্লী বড় আকারের ও কালো বর্ণের লেজওয়ালা প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় বামপাশের ডানার এক প্রান্ত থেকে ডানপাশের ডানার বিপরীত প্রান্ত পর্যন্ত ১০০ থেকে ১৩০ মিলিমিটার লম্বা। পেছনের ডানার ওপরে তিনটি ঘিয়ে সাদা রঙের পোঁচ রয়েছে। পেছনের ডানা ঢেউ খেলানো। পেছনের ডানার ওপর ও নিচের দিকে বাইরের প্রান্তে একসারি পরিপূর্ণ অর্ধচন্দ্রাকৃতির ফ্যাকাশে লাল দাগ রয়েছে। পেছনের ডানার ঢেউ খেলানো প্রান্ত বরাবর একসারি সাদা রৈখিক অর্ধচন্দ্রাকৃতির দাগ দেখা যায়। দেহ সাদা ফোঁটযুক্ত কালো এবং দেহের নিচটা গাঢ় বাদামি। চন্দ্রাবল্লীর (Yellow Helen) সঙ্গে চেহারার বেশ মিল থাকলেও চন্দ্রাবল্লীতে পেছনের ডানার নিচের দিকের প্রান্তীয় অর্ধচন্দ্রাকৃতির ফ্যাকাশে লাল দাগের সারির পরিবর্তে ধূসর-হলুদ অর্ধচন্দ্রাকৃতির দাগের সারি থাকে। চন্দ্র্রাবল্লীর সঙ্গে আরেকটি পার্থক্য হলো পেছনের ডানার ওপরের সাদা ছোপ তিনটি শিরার পরিবর্তে দুটি শিরা দিয়ে ছেদ করেছে। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম।
লাল চন্দ্রাবল্লী দেশের উত্তরপূর্ব (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম বিভাগ) বৃষ্টিপাতসম্পন্ন চিরসবুজ বন পছন্দ করে। এ ছাড়া জঙ্গল, ঝোপঝাড় এবং বাগান, যেখানে পোষক গাছ আছে, সেখানেই দেখা মেলে। দ্রুত কাপড় বুননের মতো করে ওড়ে। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত উড়ে বেড়ায়। এ ছাড়া স্যাঁতসেঁতে জায়গায় বসে থাকতে দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই রসের জন্য ফুল গাছের কাছে ঘুরঘুর করে। পুরুষগুলোকে ভেজা মাটির রসও চুষতে দেখা যায়।
জীবন চক্র অনেকটা চন্দ্রাবল্লীর মতোই। স্ত্রী পাতি লেবু, মটকিলা, দাহান, তাম্বুল, বাজনা প্রভৃতি গাছের কচি পাতা বা কচি কাণ্ডের আগায় একটি করে হলুদ গোলাকার ডিম পাড়ে। শুককীট দেখতে পাখির বিষ্ঠার মতো চকচকে। ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপাতি হতে ৪৩ থেকে ৫৩ দিন সময় লাগে।
লেখক : পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ