ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৪ ০৯:৩৬ এএম
ভারতের পক্ষী অভয়ারণ্যে বসা অবস্থায় বাদামি ঈগল। ছবি : লেখক
শিকারি পাখিটিকে রাজশাহীর শহরের কাছে পদ্মা নদীর চরে খুঁজেছি অনেকদিন। এ ছাড়াও ওকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাব্য সকল জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। আঠারো ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ বাঘমারা উপজেলা থেকে উদ্ধার করা একই প্রজাতির একটি পাখিকে দেখলাম রাজশাহী চিড়িয়াখানায়। এর বছরখানেক পর ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সকাল ১১টা নাগাদ ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর পক্ষী অভয়ারণ্যে প্রয়াত অধ্যাপক ডা. নাজমুল ভাইয়ের সঙ্গে একই রিকশায় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ অভয়ারণ্যের জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মরা গাছের ডালে দুটি ভিন্ন প্রজাতির বড় শিকারি পাখিকে বসে থাকতে দেখলাম। দ্রুত রিকশা থেকে নেমে পটাপট ক’টা সাক্ষী ছবি তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ পর পিছনে বসা বড় আকারের চিত্রা ঈগলটি (Greater Spotted Eagle) উড়াল দিল। দ্বিতীয় পাখিটি, যেটাকে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় দেখেছিলাম সেটা, তখনও গাছের ডালে বসে ছিল। কিছুটা কাছ থেকে আরও দু-চারটা ছবি তোলার পর সেও উড়ল। দুপুরের খাবারের পর অভয়ারণ্যের ক্যান্টিনের উল্টোপাশের ছোট্ট টাওয়ারটিতে উঠলাম। দ্বিতীয় দফা পাখিটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বেশ কয়েকবার আমাদের মাথার ওপর চক্কর দিয়ে পাখিটি দূরে, বহু দূরে চলে গেল। পরের দিন পক্ষী অভয়ারণ্যের অন্য একটি স্থানে একই প্রজাতির আরেকটি পাখির সঙ্গে দেখা হলো। এবার বেশ আয়েশ করে ওর আরও ক’টি ছবি তুলে নিলাম।
বাংলাদেশের রাজশাহী চিড়িয়াখানা ও ভারতের রাজস্থানের ভরতপুরে দেখা পাখিগুলো এদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি বাদামি ঈগল। নেপালি ঈগল নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে প্রান্তরবাজ নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Steppe Eagle। অ্যাক্সিপিট্রিডি (Accipitridae) বা বাজ গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Aquila nipalensis (অ্যাকুইলা নিপালেনসিস)। পাখিটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিপন্ন বলে বিবেচিত। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া এবং মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির বিস্তৃতি রয়েছে। শীতে এটি পরিযায়ী হয়ে এদেশে আসে।
প্রাপ্তবয়স্ক বাদামি ঈগলের দৈর্ঘ্য ৭২ থেকে ৮১ সেন্টিমিটার ও প্রসারিত ডানা ১৬০ থেকে ২০০ সেমি। ওজনে পুরুষ ২.০ থেকে ৩.৫ কেজি ও স্ত্রী ২.৩-৪.৫ কেজি হয়। একনজরে দেহের পালকের রঙ গাঢ় বাদামি। পিঠ কালচে, ঘাড় ফ্যাকাশে লালচে, চিবুক সাদা ও কোমরে সাদা পট্টি থাকে। দেহতল কিছুটা ফ্যাকাশে। বসা অবস্থায় ডানার আগা লেজের আগা ছুঁয়ে যায়। উড়ন্ত অবস্থায় চওড়া ডানা, ছড়ানো প্রান্তীয় পালক, ডানার নিচের অংশের প্রান্তের কালচে টান ও ওড়ার পালকের ডোরা চোখে পড়ে। চোখ কালচে-বাদামি। বড় আকারের চঞ্চু বা ঠোঁটের রং কালো। ওপরের চঞ্চুর গোড়া হলুদ। মুখব্যাদান হলুদ ও তা চোখের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। পা পালকে আচ্ছাদিত। পা, আঙুল ও পায়ের পাতা হলুদ। নখ কালচে। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। ওরা তামাটে ঈগলের চেয়ে বড় আকারের ও গাঢ় রঙের হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি ফ্যাকাশে। তা ছাড়া ডানার ওপরে দুটি ফ্যাকাশে দাগ ও ডানার নিচে চওড়া সাদা ফিতে থাকে।
শীতে পরিযায়ী বাদামি ঈগল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তবে নদী ও হ্রদের পাশে শুষ্ক উন্মুক্ত প্রান্তরে বেশি দেখা যায়। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। আকাশে উড়ে উড়ে এবং ময়লা-আবর্জনার স্তূপ বা কসাইখানার পাশে গাছে বসে খাদ্যের সন্ধান করে। ইঁদুর, গিরগিটি, ছোট পাখি, মরা প্রাণী ও নাড়িভুঁড়ি মূল খাবার। সচরাচর নীরব থাকে, কদাচ ‘পিয়াক-পিয়াক---’ শব্দে ডাকে।
এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজনন মৌসুম। এ সময় আবাস এলাকার ভূমি বা মাটি থেকে সামান্য উঁচুতে ঝোপঝাড় বা ছোট গাছে কাঠিকুটি, পালক, হাড়গোড়, পুরোনো কাপড়-কাগজ ইত্যাদি দিয়ে মাচানের মতো বাসা বানায়। স্ত্রী প্রতি মৌসুমে ৩ থেকে ৫ দিন পরপর ১টি করে ১ থেকে ৩টি বাদামি ছিটযুক্ত সাদাটে ডিম পাড়ে। ছানারা ৫৫ থেকে ৬৫ দিন পর্যন্ত বাসায় থাকে। স্বাবলম্বী হয় ৭৫ থেকে ৮০ দিনে। ডানা ও লেজের পালক পুরোপুরি গজানোর আগেই উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ১৬ থেকে ১৭ বছর।
লেখক : বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ