× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আতঙ্ক থেকে বিপর্যয়ের আশঙ্কা জীববৈচিত্র্যে

আমিনুল ইসলাম মিঠু

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ০৯:১০ এএম

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৪ ১৪:৪৩ পিএম

আতঙ্ক থেকে বিপর্যয়ের আশঙ্কা জীববৈচিত্র্যে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিষধর সাপের ১০টির মধ্যেও নেই রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া। অথচ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপগুলোর একটি- এমন গুজবের কারণে সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আতঙ্ক ও ভয়ে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে যত সাপ মেরে ফেলা হয়েছে, তার ৮০ শতাংশই নির্বিষ। এমন প্রেক্ষাপটে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে সর্প নিধনের কারণে দেশে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কারণ সাপ এদেশের জীববৈচিত্র্যের অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে অন্যান্য প্রাণীর মতো এটিও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এর পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাসেরও আশঙ্কা রয়েছে।

সাপ নিয়ে ভয়-আতঙ্কের পাশাপাশি নানা গুজবও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় অনেকেই বলাবলি করছেন, এর কোনো অ্যান্টিভেনম নেই, তাই রাসেলস ভাইপার কামড় দিলেই নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে। তবে গতকাল রাজধানীতে এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ভ্যাকসিন নাই, রোগী মারা গেছে, দয়া করে কেউ এই ভুল তথ্য দেবেন না। কারণ ভুল তথ্য দিলে মানুষ আতঙ্কিত হয়। রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতালেই আছে।’ 

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে

হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফোনে দেওয়া তথ্য ও ছবি যাচাই করে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে সারা দেশে মেরে ফেলা ৮০ শতাংশ সাপই নির্বিষ। চন্দ্রবোড়া সাপটি দেখতে অনেকটা অজগরের মতো হওয়ায় অনেক স্থানে অজগর নিধনও শুরু হয়েছে। অন্য কোনো প্রজাতির সাপ কামড়ালেও মনে করা হচ্ছে রাসেলস ভাইপার দংশন করেছে। মানুষ তার সহজাত ভয় ও আতঙ্কে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সাপ নিধনে।

বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক দিন ধরে সারা দেশে এভাবে মেরে ফেলা ৮০ শতাংশ সাপই আসলে শঙ্খিনী, অজগর, ঘরগিন্নি বা ঘরবউনি, দাঁড়াশ, ঢোঁড়াসাপ, গুইসাপ ইত্যাদি প্রজাতির। অথচ এসব সাপ উল্টো রাসেলস ভাইপার খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। চন্দ্রবোড়ার মতো সাপের দংশন থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে।

বন বিভাগ সূত্র জানাচ্ছে, ফসলি ক্ষেতে অনেক সাপই থাকে। ফসলের জন্য ক্ষতিকর ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণী খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। সাপের সংখ্যা কমে এলে ফসলের মাঠে ইঁদুরও বেড়ে যাবে। এতে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘রাসেলস ভাইপার কোনো ভয়ানক প্রাণী নয়। একে আক্রমণ করলেই কেবল সে পাল্টা আক্রমণ করে থাকে। একে মেরে ফেলা নিরর্থক।’ তিনি জানান, মানুষ যাতে সাপ হত্যা না করে, সেজন্য বন বিভাগ সচেতনতা তৈরির কাজ করছে।

বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যারা সাপ দেখে হটলাইনে যোগাযোগ করছেন, আমরা তাদের ছবি পাঠাতে বলছি। কেউ মেরে ছবি পাঠাচ্ছে, কেউ জীবিত ছবি দিচ্ছে। এ পর্যন্ত আমরা ৭টি রাসেলস ভাইপার সাপ মেরে ফেলার তথ্য পেয়েছি। তবে কোনো মানুষ আহত বা নিহত হওয়ার খবর পাইনি। যাচাই করে যা দেখছি, তাতে মেরে ফেলা সাপের ৮০ শতাংশেরও বেশি নির্বিষ বা উপকারী।’ 

পরামর্শ দিতে পাঁচটি হটলাইন 

বন বিভাগ বলছে, সাপ আতঙ্ক থেকে জনসাধারণকে সচেতন করতে ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে ৫টি হটলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের চালু করা প্রতিটি নম্বরে ঘণ্টায় গড়ে ৫০টি করে কল আসছে। বন কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, কোথাও কোনো সাপ দেখলেই কল করছে সাধারণ মানুষ। অনেকে আবার সাপ মেরে কল করে পুরস্কারের টাকাও চাচ্ছে অধিদপ্তরের কাছে।

বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, ‘গত তিন দিন ২৪ ঘণ্টাই আমাদের ফোনগুলোতে কল এসেছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজারের মতো কল এসেছে। কেউ কেউ আতঙ্কেও কল করছেন, সমাধান চাইছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা পরামর্শ দিচ্ছি যে, সাপকে না মেরে তার মতো থাকতে দিতে বা বেশি সমস্যা মনে করলে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিতে।’

অ্যান্টিভেনম সব হাসপাতালেই আছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, ‘ভ্যাকসিন নাই, রোগী মারা গেছেÑ মানুষের কাছে কেউ দয়া করে এই ভুল তথ্য দেবেন না। কারণ ভুল তথ্য দিলে মানুষ আতঙ্কিত হয়। আর রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশের প্রত্যেক হাসপাতালেই আছে।’ 

গতকাল বৃহস্পতিবার বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব কনভেনশন হলে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন আয়োজিত ‘রাসেলস ভাইপার : ভয় বনাম ফ্যাক্ট’ শীর্ষক সেমিনারে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

সর্পদংশনে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক হ্যান্ডস আছে, মেম্বার আছে, চেয়ারম্যান আছে। রোগী হাসপাতালে আনার দায়িত্ব যদি আপনারা নেন এবং দ্রুত চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে আসেন, তাহলে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। রোগীকে তো যথাসময়ে আনতে হবে। সেটা তো আর চিকিৎসকরা পারবেন না।’ এ সময় তিনি সাংবাদিকদের রাসেলস ভাইপার নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

সেমিনারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন মো. মাহবুবুর রহমান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ রাসেলস ভাইপার সাপ এবং অ্যান্টিভেনম নিয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সভাপতি প্রফেসর ডা. মো. টিটু মিঞার সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নূরুল হক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের মহাসচিব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর।

মৃত্যুর অন্যতম কারণ দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া

গতকালের সেমিনারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. টিটো মিয়া বলেন, ‘ওঝাসহ নানা কারণে রোগী হাসপাতালে আসতে দেরি করায় মৃত্যু বাড়ে। দেরিতে হাসপাতালে আসায় রোগীরা ক্রিটিক্যাল অবস্থায় চলে যায়।’

সেমিনারে বক্তারা জানান, চন্দ্রবোড়ার দংশনে অসুস্থ রোগীদের ৭০ শতাংশই সুস্থ হচ্ছে। বাকি ৩০ শতাংশের মৃত্যুর জন্য দায়ী দেরিতে হাসপাতালে আসা। তারা জানান, সাপ কামড় দেওয়ার ১০০ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা কমে যায়। কৃষকদের ক্ষেতেখামারে গামবুট পরে কাজ করার পরামর্শ দেন তারা। 

অন্যদিকে, বন্য প্রাণী ও সাপবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মো. আবু সাইদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, ‘মানুষের ধারণা রাসেলস ভাইপারের দংশন মানে নিশ্চিত মৃত্যু। দেশে এর কোনো অ্যান্টিভেনম নেই। এসবই ভুল তথ্য।’ 

তিনি বলেন, ‘চন্দ্রবোড়া সাপ দংশনের পর যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হলে রোগী সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৭০-৮০ শতাংশ। তবে রাসেলস ভাইপারের বিষে নিউরোটক্সিন, হেমোটক্সিন ও মায়োটক্সিন থাকে। তাই সাপের দংশনের ফলে বিষক্রিয়ায় রক্ত জমাট বাঁধা প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। সেই সঙ্গে টিস্যু ড্যামেজ, রক্তক্ষরণ, কিডনি বিকল, পচনসহ অঙ্গহানি হতে পারে। তাই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন।’ 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে ২০২ জন রাসেলস ভাইপার দংশিত রোগী ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৬২ জনের মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশে বর্তমানে ভারত থেকে আমদানিকৃত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম দিয়ে বিষধর রাসেলস ভাইপার, গোখরা ও কেউটে সাপের চিকিৎসা করা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলার চরাঞ্চলের রাসেলস ভাইপার উপদ্রুত এলাকার উপজেলা হাসপাতালেও পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুদ আছে।

দেশেই অ্যান্টিভেনম তৈরির কার্যক্রম

গবেষকরা বলছেন, ভারতের অ্যান্টিভেনম মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। রাসেলস ভাইপারে কামড়ানো রোগীর জন্য এক ডোজ অ্যান্টিভেনমে খরচ হয় ১৪ হাজার টাকা। এই সাপে কামড়ানো রোগীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার ডোজ অ্যান্টিভেনম দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ একজন রোগীর শরীর থেকে এই সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে খরচ হয় ৫৬ হাজার টাকা। এই অ্যান্টিভেনম যাতে ব্যয়সাশ্রয়ী হয়, সে লক্ষ্য সামনে রেখে চট্টগ্রাম মেডিকেলে অবস্থিত ভেনম রিসার্স সেন্টারে সরকারি অর্থায়নে দুই বছর মেয়াদি একটি প্রজেক্ট পরিচালিত হচ্ছে। ভেনম রিসার্স সেন্টার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ইমুনাইজেশন ল্যাব, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সমন্বয়ে রাসেলস ভাইপারের জন্য আলাদা অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে এই প্রজেক্টটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রজেক্টের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র দুই লাখ টাকা। যা গবেষণা পরিচালনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেলে অবস্থিত ভেনম রিসার্স সেন্টারের গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক ইব্রাহীম আল হায়দার বলেন, ‘আমরা ক্লিনিক্যালি অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ শুরু করেছি। আপাতত রাসেলস ভাইপারের ক্লিনিক্যাল অ্যান্টিবডি তৈরির চেষ্টা চলছে। ৩৫ ভাগে মতো কাজ শেষ হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ ভারতের সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম দিয়ে বর্তমানে আমাদের দেশে রাসেলস ভাইপারে কামড়ানো রোগীর চিকিৎসা চলছে। কিন্তু এটা পুরোপুরি কার্যকর নয়। কারণ ওই অঞ্চলের আবহাওয়া, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও মাটি ভিন্ন। তাই এসব অঞ্চলের সঙ্গে আমাদের দেশের সাপের বিষের গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্য রয়েছে। তাই ভারতের অ্যান্টিভেনম পুরোপুরি কাজ করবে না। আমরা দেশের পাঁচটি ক্লাইমেটিক অঞ্চল থেকে রাসেলস ভাইপারের বিষ সংগ্রহ করে সমন্বিত বিষের প্রভাবের ওপর অ্যান্টিবডি তৈরি করছি। এটি সফল হলে রাসেলস ভাইপারে কামড়ানো রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করা যাবে বলে আশা করছি।’

চট্টগ্রাম মেডিকেলের ভেনম রিসার্স সেন্টারের সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনো একটা প্রাণীর শরীরে সাপের বিষ প্রয়োগ করার পর সেই প্রাণীর মধ্যে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়। পরে সেই অ্যান্টিবডি রক্ত থেকে অথবা পাখি হলে সেক্ষেত্রে ডিম থেকে আলাদা করতে হয়। এরপর অ্যান্টিবডিকে পরিশুদ্ধ করতে হয়। এরপর সেই অ্যান্টিবডিকে যেকোনো ভেনম দিয়ে মিউটিলাইজ করা যায় কি না, তা চেক করা হয়। মিউটিলাইজ করার পর যদি কার্যকর হয়, তখন কোনো একটা প্রাণীর, যেমনÑ ইঁদুরের শরীরে ভেনমটি প্রয়োগ করে দেখা হয়, বিষকে সেটি নিষ্ক্রিয় করতে পারছে কি না। রাসেলস ভাইপারের ভেনম উৎপাদনে এখন মুরগির ডিম ও ছাগলের রক্ত থেকে অ্যান্টিবডি তৈরির চেষ্টা চলছে। ট্রায়াল পর্যন্ত যেতে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কারণ মুরগির ডিম থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে গেলে যে মেশিনের দরকার, সেটির দামই ৫০ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম মেডিকেলে অবস্থিত ভেনম রিসার্স সেন্টারের ল্যাবে বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও এটি নেই। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনিটিক ল্যাবে প্রতি মাসে অথবা দুই মাস অন্তর রিসার্স ম্যাটেরিয়াল নিয়ে গিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। যার কারণে এটি এখন সময়সাপেক্ষ হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘এটির জন্য তেমন কোনো বরাদ্দও নেই। সরকারের মাত্র দুই লাখ টাকার একটি ছোট প্রজেক্ট এটি, যা খু্বই অপর্যাপ্ত। এরপরও আমরা আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একটি ফলাফল পাওয়া যাবে।’ 

সমীক্ষা যা বলছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের পরিচালিত ‘স্টুডেন্ট পারসেপশন অন স্নেইক ইন নর্থওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, সঠিক তথ্যের অভাবে সাপ নিয়ে বিভিন্ন বয়সি মানুষ, এমনকি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। দেশের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, সাপ মানুষকে আক্রমণ করে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ১০৫ প্রজাতির সাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ৮২ প্রজাতির সাপের সন্ধান মিলেছে। 

সাপে কাটার ঘটনাকে বাংলাদেশের একটি জরুরি অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সম্প্রতি এ নিয়ে কর্মকৌশল তৈরি করেছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যাতে ২০৩০ সাল নাগাদ সাপের কামড়জনিত অসুস্থতা ও মৃত্যু ৫০ ভাগ কমিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগ এবং সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের যৌথভাবে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়, যার মধ্যে মারা যায় সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি। প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে সাপের ছোবল খায় ২৪৪ জন। যার মধ্যে মৃত্যু হয় ৪-৫ জনের। সব মিলে গ্রামেই ৯৬ শতাংশ ঘটনা ঘটে। এ সমীক্ষায় চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ৪৪ জন রোগীর বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা যাচাই করা হয়। 

সর্প দংশনের ঘটনা বেশি খুলনা এবং বরিশাল বিভাগে। দংশনের শিকার ৮০ শতাংশ মানুষ দংশিত অঙ্গে গিঁট দেন এবং ৬৫ শতাংশ প্রথমেই ‘ওঝা’র কাছে যান বা স্থানীয় চিকিৎসা নেন। এসব ঘটনায় প্রতি হাজারে দুজনের অঙ্গহানি ঘটে এবং ২-২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদে ভোগেন ১০ শতাংশ। সাপের কামড়ের শিকার প্রতি ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় প্রায় দুই হাজার টাকা। জরিপে আরও বলা হয়, বছরে প্রায় ১৯ হাজার গৃহপালিত পশুও সর্প দংশনের শিকার হয় এবং এতে আড়াই হাজার পশু মারা যায়।

রাসেলস ভাইপার কামড়ালে যা হয়

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্স সেন্টারের সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল জানান, রাসেলস ভাইপারের দংশনের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে দংশনের স্থানে ব্যথা শুরু হয় ও দংশিত স্থান ফুলে যায়। পরে দংশনের স্থানে পচন ধরে। তা ছাড়া দংশনের শিকার ব্যক্তির তলপেটে ব্যথা হতে পারে। বমি হতে পারে, দংশনের স্থান, দাঁতের মাড়ি ও মলমূত্রের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে। কেউ যদি রাসেলস ভাইপারের দংশনের শিকার হন, তার প্রথম কাজ হচ্ছে আশপাশের কাউকে জানানো, যিনি দংশনের শিকার ব্যক্তির দেখাশোনা ও পরিচর্যা করতে পারবেন। দংশনের স্থানে বা এর আশপাশে বন্ধন বা গিঁট দেওয়া উচিত নয়। কারণ রাসেলস ভাইপারের বিষ হিমোটক্সিন ও মায়োটক্সিন হওয়ায় দংশিত স্থানে পচন ধরায়। তাই দংশিত স্থানে বাঁধ বা গিঁট দেওয়ার কারণে অনেক সময় অঙ্গহানি হতে পারে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা