× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারে দরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ১০:০২ এএম

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪ ১২:০৮ পিএম

এখনই ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ করা না হলে আগামীতে বাংলাদেশেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। চশমা পড়া হনুমানও আজ বিপন্নের পথে। ছবিটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে তুলেছেন মোছাব্বের হোসেন

এখনই ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ করা না হলে আগামীতে বাংলাদেশেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। চশমা পড়া হনুমানও আজ বিপন্নের পথে। ছবিটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে তুলেছেন মোছাব্বের হোসেন

‘ইকোসিস্টেম’ বা বাস্তুতন্ত্র। একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী জীবগোষ্ঠী, তাদের পরিবেশ এবং জীবগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃক্রিয়ার ফলে বাস্তুতন্ত্র গঠিত হয় অর্থাৎ জীবজগৎ এবং তাদের স্বাভাবিক বাসস্থানই হচ্ছে ‘ইকোসিস্টেম’ বা বাস্তুতন্ত্র। এভাবেও বলা যায়, জীবের সঙ্গে পরিবেশের আন্তঃসম্পর্কই বাস্তুসংস্থান। 

প্রতিটি জীব বেঁচে থাকার জন্য নিজের একটি আশ্রয়স্থল গড়ে তোলে। খাদ্যের জন্য সকল জীব প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বাংলাদেশে বাস্তুতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জলবায়ুবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ইকোসিস্টেমের মধ্যে রয়েছে সুন্দরবন তথা ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম, হাওর ইকোসিস্টেম, পাহাড়ি ইকোসিস্টেম এবং বিল, বাঁওড় ও জলাশয়নির্ভর ইকোসিস্টেম।

এ ছাড়া আরেকটি বড় ইকোসিস্টেম হচ্ছে বে-অব বেঙ্গল বা বঙ্গোপসাগর। এর মধ্যে সুন্দরবন তথা ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ ও লবণাক্ততার হুমকিতে পড়েছে। অন্যদিকে এই ম্যানগ্রোভ বনের ইকোসিস্টেমে ডেভেলপমেন্ট স্ট্রেস বা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রভাব বেশি। শুধু সুন্দরবনই না, অন্যান্য ইকোসিস্টেমও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রভাবে আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষ করে হাওর, বিল, বাঁওড় ও জলাশয়গুলো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে গরমের মৌসুমে। এই সময় যে তাপমাত্রা বাড়ছে, গত দুই বছরে তীব্র তাবদাহের প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মো. শামসুদ্দোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সুন্দরবনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাইতেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রভাব বেশি। আমাদের যেসব ইকোসিস্টেম রয়েছে তার মধ্যে অ্যাডাপটেশন ও মিটিগেশন বেনিফিট দেয়। যা কার্বন ডাইঅক্সাইড কমিয়ে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে। প্রত্যেকটা ইকোসিস্টেমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। তবে সরাসরি পড়ছে সুন্দরবনের ওপর। কিন্তু অন্যান্য ইকোসিস্টেমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রভাব বেশি। সুন্দরবনের ভেতর স্থাপনা নির্মাণসহ গাছ কাটা ও সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। হাওরের উন্নয়নের নামে ইকোসিস্টেম বিনষ্ট করা হচ্ছে। সেখানে আবাসনসহ নানা অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা হচ্ছে। পাহাড়েও বনের জমিতে অনিয়ন্ত্রিত কৃষিকাজ, গাছ কাটা, বন নিধন, পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। যা ওই অঞ্চলের ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে দিচ্ছে। এখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তনকে আমলে নিলে একটা সাইড হচ্ছে লবণাক্ততা। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণে কিছু করার নেই। 

এখন করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, লবণসহিষ্ণু কৃষি, চিংড়ি চাষসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লবণাক্ততাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। তবে গাছ কাটা, যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মাণ, ল্যান্ড ইউজ চেঞ্জ, আন সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে আমাদের যে ইকোসিস্টেম বিনষ্ট করা হচ্ছে তা যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করতে হবে। তা করতে আমাদের প্রধানত শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে আমাদের ইকোসিস্টেম টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। এ ছাড়া এই কারণে শুধুমাত্র ইকোসিস্টেমই নয়, বায়োডাইভারসিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশকে আরও বেশি মোকাবিলা করতে হবে। যাতে আমাদের দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হবে। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন বন ও জলাভূমি বেশি দখল করছে আবাসন প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। বেশি ছাড় পাওয়াতে তারা শালবন কেটে ইকো ট্যুরিজম করছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে রিসোর্ট করা হচ্ছে। সিলেটেও অনেকগুলো আছে। এসব অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের সামনের সারিতে থাকা মানুষরা। তাই এই মুহূর্তে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সরকারের যে দপ্তরগুলো আছে সেগুলোকে আরও কার্যকর এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ভাওয়াল রিসোর্ট পরিবেশ ছাড়পত্র মেনে করেনি। তাদের দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এভাবে যদি জরিমানা দিয়ে তাদের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্যবস্থাপনা না মেনে শুধু জরিমানা দিয়েই পরিবেশ ধ্বংসের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। আর পরিবেশ ও জলাভূমি ধ্বংস করে এক কোটি গাছ লাগানো বা সামাজিক বনায়ন করে বিনষ্ট হওয়া ইকোসিস্টেম বা বায়োডাইভারসিটি ফিরিয়ে আনা যাবে না। ভারতে এবার তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়েছে। বাংলাদেশেও সেটি ছিল ৪০ ডিগ্রির ওপরে। এখনই যদি ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ করা না হয় তবে আগামীতে বাংলাদেশেও তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

রিভার ও ডেল্টা রিসার্স সেন্টারের চেয়ারম্যান ও নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যতটা ইকোসিস্টেম বাংলাদেশে ধ্বংস হয়েছে তা আমরা নিজেরাই করছি। দূষণ ও দখল করে সারা দেশের বেশিরভাগ নদী এবং জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নাম দিয়ে সারা দেশে গত এক বছরে প্রায় ১২ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। এটা বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, এখন থেকে সকল প্রজেক্টে ফরমায়েশি সমীক্ষা না করে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দিয়ে করাতে হবে। কোনো জলাশয় ভরাট করা যাবে না। দূষণ বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি দূষণ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যতটা না জলবায়ু পরিবর্তন, তার থেকে বেশি ইকোসিস্টেমের ক্ষতি করা হচ্ছে আমাদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের কারণে। তিনি বলেন, ইকোসিস্টেম না থাকার কারণে এখন ঢাকা শহরে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে জনজীবন। আশপাশের নদী-খাল থেকে আমরা একসময় প্রাকৃতিক সুবিধা পেতাম। কিন্তু সেগুলো নষ্ট হওয়াতে এখন আমরা দুর্ভোগে পড়েছি। তাই প্রকৃতিকে ঠিক রেখে উন্নয়নের কথা এখন থেকেই ভাবা শুরু করা প্রয়োজন। 

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বন থেকে রাজস্ব আদায় করাÑ এমন চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বনকে এখন পুরোপুরি সংরক্ষণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। কিছু বনে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না, কিছু বন সংরক্ষণ করতে হবে। যারা বন ধ্বংস করেছেÑ সেটা কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিÑ যে-ই হোক না কেন, তার থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে একটা নতুন বন সেখানে সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে আফ্রিকার বন বা সেখানকার ইকোসিস্টেম বাংলাদেশের ইকোসিস্টেম এক নয়। বাংলাদেশে যদি নদনদী ঠিক রাখা না যায় তবে বাংলাদেশ ও বন টিকবে না। এটা বদ্বীপ; আফ্রিকার দেশগুলোতে বনের ভেতর দিয়ে নদী গেছে কিন্তু আমাদের দেশ নদীর ওপর সৃষ্টি হয়েছে। তাই এটাকে বদ্বীপ বলা হয়। সেন্টমার্টিন যেমন সাগরের মাঝে একটি দ্বীপ, আমাদের পুরো দেশই তেমন। তাই বন ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা