প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৪ ১৯:৩৪ পিএম
আপডেট : ২২ জুন ২০২৪ ১৯:৩৫ পিএম
দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে একের পর এক দুর্যোগ বাড়ছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। এবারের বাজেটে জলবায়ু সম্পর্কিত বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক শতাংশের কম। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় প্রকৃত বরাদ্দ ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমেছে। জলবায়ু সহনীয়তা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতে বাজেটে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়লেও প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭০৬ শতাংশ। অর্থাৎ জিডিপির হিসেবে গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ কমেছে বলে মন্তব্য করেছেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান।
শনিবার (২২ জুন) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। ‘টেকসই সমৃদ্ধি, সবুজ অর্থনীতি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট: প্রেক্ষিত জলবায়ু ও পরিবেশ, দুর্যোগ, খাদ্যনিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি’ বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এম জাকির হোসেন খান, উপস্থিত ছিলেন গবেষণা সহকারী ড. দিলরোবা, তন্মন সাহা প্রমুখ।
এম জাকির জাকির হোসেন খান বলেন, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় এবারের বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বেড়ে দুই হাজার ১৩০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ৫২ কোটি টাকা বাড়লেও বিদ্যমান মুদ্রাস্ফীতির নিবেচনা করলে প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ কমেছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হেনেছে। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত দুর্যোগ বাড়লেও কৃষি, স্বাস্থ্য এবং পানি সম্পদ খাতে জলবায়ু সম্পর্কিত বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বা তার সামান্য বেশি। তীব্র তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ ও মওসুমের বাইরে বৃষ্টিপাতসহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং শিলাবৃষ্টির মতো দুর্যোগ বাড়লেও খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা ও জ্ঞান ব্যবাবস্থাপনায় জলবায়ু সম্পর্কিত অর্থায়ন ক্রমেই কমছে।
জাকির হোসেন খান বলেন, প্যারিস চুক্তিতে সাক্ষরকারী দেশ হিসাবে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ এনডিসিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ১১৪ দশমিক ২ মেগাওয়াট। এজন্য প্রতি অর্থবছরে গড়ে কমপক্ষে প্রায় ৩ হাজার ৮৬ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য শক্তি বাবদ মাত্র ১০০ কোটি টাকা বা মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে করে প্রতি অর্থবছরে বাংলাদেশে সার্বিক জলবায়ু অর্থায়নে ঘাটতি ২৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। দুর্যোগে গড়ে বছরে ২১ দিন কর্মদিন হারাচ্ছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হারানো কর্মদিবসের আর্থিক মূল্য বিবেচনায় সার্বিক জলবায়ু অর্থায়নে ঘাটতি বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ঘাটতির তুলনায় আন্তর্জাতিক উৎস হতে বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। এ প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিশ্রুত প্রতি বছর ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। জলবায়ু ঋণ না নিয়ে এ তহবিলের অনুদান পেতে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে দ্বিপাক্ষিকভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা প্যারিস চুক্তির আওতায় সরকার জলবায়ু সহনীয়তার জন্য কার্বন নিঃসরণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য কার্বন কর আরোপ করা উচিত। তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি অভিযোজনেও বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হবে। এতে কার্বন নিঃসরণ কমে বায়ু দূষণের পরিমাণ কমে যাবে। কার্বন কর, দূষণ করারোপের মাধ্যম বছরে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার সবুজ অর্থায়ন সম্ভব বলেও জানান এই জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ।
ক্রমবর্ধমান পানি, মাটি দূষণসহ শ্রমিকের দেহের ভেতরে মাইক্রোপ্লাষ্টিকের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে তৈরি পোশাকের ভোক্তার উপর পরিবেশ সংরক্ষণ ফি/করারোপের সুপারিশ জানিয়েছে চেঞ্চ ইনিশিয়েটিভ।
জাকির হোসেন খান বলেন, ২০১২-২১ সাল পর্যন্ত জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জিডিপি ক্ষতির দিকে বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। তা ছাড়া বাংলাদেশে আমন ধানের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, নিজস্ব গবেষণা না থাকলে বিদেশিদের ধার করা জ্ঞান দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, জল, বন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকৃতিভিত্তিক টেকসই সমৃদ্ধি প্রণয়ন, নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার করতে হবে; পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ দখল এবং দুর্যোগ ঝুঁকিকে একীভূত করতে হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি প্রত্যাহার করে তা নবায়নযোগ শক্তি, সবুজ উদ্যোগে ভর্তুকি, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রকৃতিবান্ধব কৃষিতে বিনিয়োগ করতে হবে।