টালমাটাল শিল্পী সমিতি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৪ ১৩:৩০ পিএম
কয়েক বছর ধরে সিনেমা ছাপিয়ে নির্বাচন ঘিরেই আলোচনায় থাকছে এফডিসি-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে এসব সংগঠন। বিশেষ করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির অবস্থান খুবই নাজুক। সেই ২০১৭ সালে মিশা সওদাগরের সঙ্গে প্যানেল দিয়ে জায়েদ খান যখন প্রথমবার সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করতে নামেন তখনই প্রকাশ্যে শত্রুতার পথে হাঁটতে শুরু করেন শিল্পীরা। নির্বাচনের দিন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের ওপর হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটে। এরপর জায়েদ নির্বাচিত হলে শাকিব খানের ওপর আসে বয়কট আদেশ। এফডিসিতে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে ‘চলচ্চিত্র পরিবার’ নামে একটি সম্মিলিত ব্যানার এনে তখনকার তুমুল হিট প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়াকেও নানাভাবে কোণঠাসা করা হয়। তখন মিশা-জায়েদের বিরোধীরা জাজের পক্ষে অবস্থান নেন। গড়ে তোলা হয় আরও একটি সংগঠন। প্রকাশ্য বা আনুষ্ঠানিক বিভাজনটা সেই শুরু বলা যেতে পারে।
সময়ের স্রোতে মিশা ও জায়েদ শিল্পী সমিতি থেকে বিদায় নেন ২০২২-২৪ মেয়াদের নির্বাচনে। জায়েদ ঘোষিত ফলাফলে বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি দাবি করে আদালতে রিট করলে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সাধারণ সম্পাদকের আসনে বসেন নিপুণই। সারা দেশে এ মামলা-ঝামেলার বিষয়টি দারুণ সাড়া ফেলে। সমালোচনাও তৈরি হয় অনেক। এরপর সভাপতি হিসেবে ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে জায়েদ খানের নানা কর্মকাণ্ডের শাস্তি হিসেবে তার সদস্যপদ বাতিল করেন নিপুণ। সদস্যপদ ফিরিয়ে দেন মিশা-জায়েদ শাসনামলে সমিতি থেকে বিতাড়িত হওয়া দেড় শতাধিক শিল্পীকে। এ ঘটনা নিপুণ ও তার কমিটিকে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে।
কিন্তু সে জনপ্রিয়তার প্রতি যত্নশীল ছিলেন না নিপুণ, তার প্রমাণ মিলল সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে। তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে পরাজিত হয়েছেন অভিনেতা-প্রযোজক মনোয়ার হোসেন ডিপজলের কাছে। আবারও সভাপতি হিসেবে পদে ফিরলেন মিশা সওদাগর। তবে শুরুটাই হলো তাদের অত্যন্ত ঘৃণিত ও লজ্জায় চাপা পড়ে। শপথ নেওয়ার দিন দেশের বিনোদন সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেন একাধিক চলচ্চিত্র শিল্পী। এতে আহত হন প্রায় ৩০ জন সাংবাদিক। হামলা করেছেন শিল্পী সমিতির সদস্যরা। এসব শিল্পীর অভিভাবক হিসেবে দেশজুড়ে সমালোচনার শিকার হয় মিশা-ডিপজল প্যানেল নিয়ন্ত্রিত কমিটি। ক্ষমা চেয়ে ও ক্ষতিপূরণ দিয়ে এ ঘটনার দায় মেটান তারা। তবে শিল্পী সমিতির এ ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে চলচ্চিত্রের বাকি ১৮টি সংগঠন ও এসব সদস্য নিয়ে গঠিত চলচ্চিত্র পরিবার। ঘটনাটি নিয়ে কোনো বিবৃতি না দেওয়ায় বিনোদন সাংবাদিকদের কাছে সমালোচিত হন এসব সংগঠনের নেতারা।
সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও বিড়ম্বনার শিকার তারা। কাঠগড়ায় সেই শিল্পী সমিতি। এবারও আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে দেশের দর্শক ও সাধারণ মানুষের ট্রলের মুখে পড়েছে শিল্পী সমিতি। নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিনেত্রী নিপুণ। সাধারণ সম্পাদক পদে তাকে কারচুপি করে হারানো হয়েছে বলেও প্রমাণসহ অভিযোগ করেন। ফলে আদালত এ পদে বিজয়ী ডিপজলের দায়িত্ব পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এ রায়ে শিল্পী সমিতি আবারও টালমাটাল অবস্থায়। যার প্রভাব পড়েছে এফডিসি ঘরানার সব সংগঠন ও মানুষের ওপর।
বাধ্য হয়ে ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং ইমেজ রক্ষা করতে শিল্পী সমিতির সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে বাকি ১৮ সংগঠন।
নিপুণের রিট
ভোটের ফল প্রকাশের পর হার মেনে নিয়ে নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ফুলের মালা দিয়ে স্বাগত জানাতেও দেখা গেছে অভিনেত্রীকে। তবে এক মাস না পেরোতেই এ কমিটি বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন নিপুণ। ১৫ মে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চে নিপুণের পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট পলাশ চন্দ্র রায় রিট আবেদন করেন। রিটে মিশা-ডিপজলের নেতৃত্বাধীন কমিটির দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তের নির্দেশনাও চাওয়া হয়।
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ মে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন ডিপজলকে তার দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। সেদিন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ সাধারণ সম্পাদক পদে ডিপজলের দায়িত্ব পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। একই সঙ্গে পরাজিত সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী নিপুণ আক্তারের অভিযোগ তদন্তেরও নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত।
মিশা-ডিপজলের ক্ষোভ
আদালতের এসব আদেশের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মনোয়ার হোসেন ডিপজল ও মিশা সওদাগর। ডিপজল গণমাধ্যমে বলেন, ‘নিপুণের পেছনে বড় শক্তি আছে। যেহেতু দেশের বাইরে থেকে সে (নিপুণ) এসব করছে সেহেতু বুঝতে হবে তার পেছনের হাত লম্বা। সোহেল রানা ভাইসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র শিল্পীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারাও বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত। আমার মনে হয়, যারা হিন্দি সিনেমা বাংলাদেশে আনার পাঁয়তারা করছেন এটা তারই একটা অংশ হতে পারে।’
আদালতের আদেশের বিষয়ে ডিপজল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি বরাবরই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। হাইকোর্ট যেহেতু রায় দিয়েছেন এখানে কিছু বলার নাই। তবে বিষয়টি নিয়ে আমাদের কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে চেম্বার জজ আদালতে যাব।’
নিপুণকে উদ্দেশ করে মিশা সওদাগর বলেন, ‘সংবিধানকে যিনি ক্ষতবিক্ষত করেছেন, তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দেব শিল্পী সমিতির সংগঠন কী? এবার শিল্পী সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কে? এবার এ সংগঠনের ক্যাবিনেটটা কী? পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে যাবেন।’
জায়েদ ফিরলেন, নিপুণ সংশয়ে
নির্বাচনের আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল সমিতিতে সদস্যপদ না থাকলেও মিশা-ডিপজল প্যানেলের প্রতি তার সমর্থন ছিল। তার প্রতিফলন ঘটল ক্ষমতায় এসেই তড়িঘড়ি জায়েদের সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়ায়। মূলত জায়েদের সদস্যপদ ফিরিয়ে দিয়েই মিশা-ডিপজল কমিটি তাদের দায়িত্ব পালনের যাত্রা করল।

এদিকে এক বক্তব্যে ডিপজলকে অশিক্ষিত বলায় তার সদস্যপদ বাতিলের হুমকি দিয়েছে বর্তমান কমিটি। এ প্রসঙ্গে কমিটির সহসভাপতি ডি এ তায়েব গণমাধ্যমে বলেন, ‘নিপুণের এমন মন্তব্য সত্যই হতাশাজনক। তিনি শুধু ডিপজলকেই ছোট করেননি বরং সমগ্র চলচ্চিত্র শিল্পীকে হেয় করেছেন। আমরা তার এমন মন্তব্যের জন্য একটি নোটিস দেব। যথাযথ উত্তর না পেলে তার সদস্যপদ বাতিল করা হবে।’
১৯ সংগঠনের সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনের পর চলমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ১৯টি সংগঠন। ২২ মে বিকালে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির কার্যালয়ে পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী সমিতিসহ ১৯ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ১৯ সংগঠনের মুখপাত্র মোহাম্মাদ ইকবাল। তিনি বলেন, ‘১৯ সংগঠনের মতবিনিময় সভায় অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার মধ্যে শিল্পী সমিতির চলমান পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশৃঙ্খল কথাবার্তা বলায় দুই পক্ষকে ১৯ সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হবে। যেন ভবিষ্যতে কথা বলার ক্ষেত্রে তারা সতর্ক থাকে। আমরা এফডিসিতে কোনোরকম ঝামেলা চাই না; আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই।’
এ প্রত্যাশা সবার- মিলেমিশে চলচ্চিত্রের মানুষ আগামীতে একসঙ্গে পথ চলবেন।