পদাতিকের নাট্যোৎসব
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৪ ১২:৩২ পিএম
বাঁ থেকে আবুল হায়াত, মান্নান হীরা ও সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন।
ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট, পদাতিকের আজীবন সভাপতি প্রয়াত নাট্যজন সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন ১৯২৩ সালের ১১ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর তিনি কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। ১৯৫২ সালের মহান মাতৃভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন এবং কারান্তরিত হন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্সপেক্টর অব কলেজ পদে যোগদান করেন ও পরে রেজিস্ট্রার পদে উন্নীত হন। ১৯৮৭ সালে তিনি অবসরে যান।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এই রাজনীতিবিদ স্বাধীনতাসংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে অমূল্য অবদান রাখেন। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এই ব্যক্তিত্ব একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ ও সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন। শিক্ষকতাজীবন ও রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালনকালেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন দেশের নাট্য আন্দোলনের সঙ্গে। পঞ্চাশের দশকের বিশিষ্ট নাট্যকারদের সঙ্গে তিনি যেমন কাজ করেছেন তেমনি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন দেশের অন্যতম নাট্যদল পদাতিক নাট্য সংসদের সভাপতি ছিলেন। প্রায় তিন দশক তিনি পদাতিককে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি নাটককে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার বলে মনে করতেন। তাই পদাতিক ছিল তার ধ্যান ও প্রাণের স্পন্দন। বয়োবৃদ্ধকালেও তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী।
তার স্মরণে ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর পদাতিক নাট্য সংসদ আয়োজন করে নাট্যোৎসবের। সেখানে নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্বদের সম্মাননাও প্রদান করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইনের ১০১তম জন্মদিন উপলক্ষে আগামী ১৬-১৯ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হল, এক্সপেরিমেন্টাল হল ও স্টুডিও থিয়েটার হলে চার দিনব্যাপী সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন স্মৃতিনাট্য উৎসব ও স্মারক সম্মাননার আয়োজন করেছে নাটকের দলটি। সেখানে দেশের দুই নাট্যব্যক্তিত্ব আবুল হায়াত ও মান্নান হীরাকে সম্মাননা দিতে যাচ্ছে তারা। তার মধ্যে মান্নান হীরা মরণোত্তর পদক পাচ্ছেন।
নাট্যোৎসবে পদাতিক নাট্য সংসদ ছাড়াও আটটি নাটকের দল নাটক নিয়ে হাজির হবে। তাদের মধ্যে আছে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, আরণ্যক নাট্যদল, থিয়েটার, থিয়েটার আর্ট ইউনিট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, বাতিঘর, খোকন বয়াতি ও তার দল নবরস এবং ভারতের কলকাতার সন্তোষপুর অনুচিন্তন দুইটি নাটক নিয়ে উৎসবে অংশগ্রহণ করবে। পাশাপাশি প্রতিদিন বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটি পর্যন্ত জাতীয় নাট্যশালার মূল হলের সম্মুখ প্রান্তে উন্মুক্ত মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে।
এই উৎসবে সম্মাননাপ্রাপ্তির খবরে আনন্দিত একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক আবুল হায়াত। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই সম্মানের একটি প্রাপ্তি আমার জন্য। প্রয়াত নাট্যজন সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন ছিলেন একজন বরেণ্য মানুষ। শিক্ষা, রাজনীতি ও নাট্যচর্চায় তিনি চিরকাল পূজনীয় হবেন। তার হাত ধরে এ দেশের মঞ্চনাটকের বিকাশ ঘটেছে। তার নামে প্রচলিত সম্মাননা পদকটি আমার জন্য বিশেষ সম্মানের। সেই সঙ্গে প্রয়াত মান্নান হীরাকেও এবার সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, এটা জেনেও ভালো লাগছে।’
প্রসঙ্গত আবুল হায়াত একাধারে অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক হিসেবে সমাদৃত। ভারতের পশ্চিমববঙ্গে জন্ম হলেও দেশ বিভাগের পর চলে আসেন চট্টগ্রামে। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে প্রকৌশলী হিসেবে নিযুক্ত হন ওয়াসায়। ওয়াসার সেই ইঞ্জিনিয়ার অভিনয় দিয়ে হয়ে ওঠেন টিভি নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘বাবা’। তিনি ১৯৬৯ সালে ‘ইডিপাস’ নাটকের মধ্য দিয়ে টেলিভিশন জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের নিয়মিত অভিনেতা। বিশেষ করে নব্বই দশক থেকে সিনেমায় নিয়মিতই অভিনয় করেন তিনি। সাহিত্যজগতেও নিজের নাম লিখিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, উপস্থাপক হিসেবেও প্রশংসিত হয়েছেন।
আবুল হায়াত ১৯৭০ সালে মেজ বোনের ননদ মাহফুজা খাতুন শিরিনকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জন্ম নেন তাদের প্রথম সন্তান বিপাশা হায়াত। ছয় বছর পর জন্ম নেন নাতাশা হায়াত। তারা দুজনেই শোবিজের জনপ্রিয় মুখ।
অন্যদিকে মান্নান হীরার জন্ম ১৯৫৬ সালে সিরাজগঞ্জ জেলায়। মফস্বল শহর থেকে মাধ্যমিক, রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। নাট্যচর্চার শুরু থেকেই তিনি আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রধানত তিনি নাট্যকার হলেও মঞ্চের অন্যান্য শাখার সঙ্গেও তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সব সময় তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন মঞ্চনাটক, টেলিভিশন ও পথনাটক রচনায়। তার নাটকের প্রধান উপাদান নিরন্ন মানুষ ও দরিদ্র জনপদ। বিশেষ করে তার পথনাটক বিশাল কৃষিজীবী মানুষ, তাদের উৎপাদন ও উপকরণকে কেন্দ্র করে লেখা। ২০০৬ সালে তিনি নাটক শ্রেণিতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
মঞ্চনাটকের পাশাপাশি পথনাটক রচনা করেন মান্নান হীরা। যে কজন নাট্যকার এ দেশের পথনাটককে সমৃদ্ধ করেছেন, মান্নান হীরা তাদের অন্যতম। তার রচিত রাজনীতি-আশ্রয়ী পথনাটক প্রশংসিত হয়েছে দেশ-বিদেশে।
সফলতার সঙ্গে আরণ্যক নাট্যদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মান্নান হীরা।
একটা সময়ে এসে চলচ্চিত্রেও মনোযোগী হন তিনি। ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। তার আগে মান্নান হীরা ‘গরম ভাতের গল্প’ ও ‘৭১-এর রঙপেন্সিল’ নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি পরিচালনা করেন। ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।