সেন্সরে জটিলতা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৪ ১৪:২১ পিএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৪ ১৪:২৩ পিএম
নানা কারণে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড আটকে দেয় সিনেমা। কখনও কখনও বছরের পর বছর চলে যায় সিনেমা মুক্তির অনুমতি পায় না। সে তালিকা বেশ লম্বাই। নতুন করে সেখানে যুক্ত হয়েছে তানভীর হাসানের চলচ্চিত্র ‘মধ্যবিত্ত’। ছবিটির নামসহ কিছু বিষয় নিয়ে সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে আটকে আছে এর মুক্তি। তানভীর হাসান জানান, সিনেমাটি মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনাচার ও প্রেমের গল্প নিয়ে তৈরি। এজন্যই নাম রাখা হয়েছে মধ্যবিত্ত। কিন্তু এতেই সেন্সরের আপত্তি। সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা সিনেমার নাম পরিবর্তন করতে বলেছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে ছবিটি সেন্সর বোর্ডে জমা দেন তানভীর হাসান। ৭ ফেব্রুয়ারি ছবিটি দেখেন বোর্ডের সদস্যরা। ১৩ ফেব্রুয়ারি তানভীর হাসানকে একটি নোটিস দেয় সেন্সর বোর্ড। উপপরিচালক মো. মঈনউদ্দিন স্বাক্ষরিত নোটিসে সাতটি বিষয় উল্লেখ করে সংশোধন করতে বলা হয়।
সেখানে প্রথম শর্তেই নাম পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া আরও বলা হয়েছে, সিনেমায় ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে হবে। গ্রামীণ সালিশে জুতার মালা গলায় দিয়ে ঘোরানোর দৃশ্য বাদ দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ কর্তন করতে হবে। কনডমের ব্যবহার সিম্বলিক দেখাতে হবে, ধূমপান ও মদ্যপানের দৃশ্য যথাযথভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
এরপর ৪ মার্চ ছবির নাম ‘মধ্যবিত্ত’ বহাল রাখতে এর পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরে সেন্সর বোর্ডে চিঠি দেন পরিচালক তানভীর হাসান। তার সেই চিঠির জবাব আসে ১৩ মার্চ। উপপরিচালক মো. মঈনউদ্দিন স্বাক্ষরিত নোটিসে ছবির নাম মধ্যবিত্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পাশাপাশি বোর্ডের অন্য নির্দেশনাগুলো মেনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ছবিটি পুনরায় জমা দিতে বলা হয়।
এ প্রসঙ্গে নির্মাতা বলেন, ‘নাম পরিবর্তন করলে তো সিনেমাটাই শেষ হয়ে যাবে। নামের ওপর ভিত্তি করেই তো এর গল্প, নির্মাণ। এখন যদি নামটাই না থাকে, তাহলে পুরো সিনেমাটাই আবেদন হারাবে। তাই নাম বহাল রাখার আবেদন করি আমি। সেন্সর বোর্ড ১৩ মার্চ এক চিঠিতে জানায় নাম বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তানভীর জানান, নোটিস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কর্তন ও সংযোজন করে ছবিটির মুক্তির অনুমতি পেতে পুনরায় আবেদন করেন। কিন্তু এখনও মুক্তির অনুমতি পাচ্ছে না মধ্যবিত্ত। তার ভাষ্য, ‘সেন্সর বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সব মেনে ছবিতে পরিবর্তন এনেছি। কিন্তু এখনও ছবিটি সেন্সর থেকে মুক্তির অনুমতি পাচ্ছে না।’
কারণ কীÑজানতে চাইলে তানভীর হাসান বলেন, নতুন করে আবারও ছবির নাম নিয়ে আপত্তি তুলেছে সেন্সর বোর্ড। কিন্তু ছবিটির গল্পের সঙ্গে মধ্যবিত্ত নামটিই মানানসই। এ নাম ছাড়া তিনি ছবিটি মুক্তি দিতে চান না। তানভীর বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার ছবির নামের কপিরাইট রয়েছে বলেও দাবি করেন। কপিরাইটের একটি সনদ দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘চলচ্চিত্র নির্মাণের আগেই কপিরাইট বোর্ড থেকে নামটি রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়েছে। সেজন্য সিনেমার পাণ্ডুলিপি এবং ফি জমা দিতে হয়েছে। চার মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাকে। কপিরাইট বোর্ড নামটি পরিবর্তন করতে বলেনি। সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অনুমতি আরেকটি প্রতিষ্ঠান উল্টিয়ে দেওয়ার আলাদা কোনো আইন আছে কি না সেটাও একটা প্রশ্ন।’
সেই সঙ্গে বোর্ডের কাছে তার প্রশ্নÑ‘যখন আমাকে নাম পরিবর্তনসহ সাতটি নির্দেশনা দেওয়া হলো তখন একটি নির্দেশনা ছিল, সিনেমায় মধ্যবিত্ত শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে হবে। যদি ছবির নাম মধ্যবিত্ত অপ্রাসঙ্গিকই হয় তাহলে মধ্যবিত্ত শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার কী করে হতে পারে!’
বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হয় সেন্সর বোর্ডের সদস্য চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুর সঙ্গে। সেন্সর বোর্ডে এ নিয়ে চারবার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ প্রযোজক নেতা। ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছবিটি প্রথম দেখার পর সেন্সর বোর্ড থেকে নাম পরিবর্তনসহ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ছবির প্রযোজক-পরিচালক সেগুলো মেনে ছবিটি পুনরায় জমা দেন। নাম মধ্যবিত্ত বহাল রাখতে আবেদনও করেন তারা। তখন সেন্সর বোর্ড থেকে নাম বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে সংশোধিত ছবিটি পুনরায় দেখা হয়। সেদিন আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। তবে সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্ত জেনেছি। বোর্ডের সদস্যরা ছবির নাম মধ্যবিত্ত হওয়াটা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করেছেন। তাই আবারও ছবির নাম পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে।’
এদিকে তানভীর হাসান দিলেন আরও নতুন তথ্য। তিনি জানান, শুধু নাম নয়, মধ্যবিত্ত নিয়ে নতুন করে আরও কিছু দৃশ্যে আপত্তি জানিয়েছে সেন্সর বোর্ড। এই পরিচালক বলেন, ‘গেল ৭ মে আমাকে জানানো হয়েছে ছবিতে নতুন করে আরও সাতটি সংশোধন আনতে হবে। আমার প্রশ্ন হলোÑএ দৃশ্যগুলো নিয়ে বোর্ড তো প্রথমে প্রশ্ন তোলেনি। প্রথমে তারা নামসহ সাতটি নির্দেশনা দেয়। আমি সেগুলো মেনে সংশোধন করে জমা দিয়েছি। ছবি থেকে প্রায় ৪ মিনিট ১২ সেকেন্ড কেটে ফেলতে হয়েছে। তাহলে আবার কেন সাতটি সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে? প্রথমবার যখন ছবিটি দেখা হলো, তখনই কেন এগুলো নজরে এলো না বোর্ড সদস্যদের? খুব দুঃখ হয় অনেক স্বপ্ন নিয়ে সিনেমা বানাতে এসে এত ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে দেখে। এটি আমার প্রথম সিনেমা। শিল্পচর্চা ও সিনেমাকে ভালোবাসি বলেই সুন্দর ক্যারিয়ারের হাতছানি রেখে শোবিজে কাজ করতে এসেছি। নিজের টাকা খরচ করে সিনেমা বানিয়েছি। আর এখন সেই স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে নেমে এসেছে। আমি সেন্সর বোর্ডের সদস্যদের অনুরোধ করব একজন নতুন নির্মাতার পাশে যেন তারা থাকেন।’
জানা গেছে, গতকাল সেন্সর বোর্ডের মিটিং হওয়ার কথা। সেখানে নানা বিষয়ের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত নিয়েও আলোচনা হতে পারে। আসতে পারে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত। ছবিটির পরিচালক অপেক্ষা করছেনÑতার জন্য ইতিবাচক বার্তাই আসবে।
নির্মাতা তানভীর হাসান তার ছবিটি সম্পর্কে জানান, গ্রাম থেকে শহর, ফুটপাথ থেকে অট্টালিকা কোনো জায়গার চরিত্র বাদ যায়নি এ সিনেমায়। তিনি বলেন, ‘গেল বছরের অক্টোবরে ফার্স্টলুক পোস্টার রিলিজ করা হয়েছে। সেন্সর জটিলতা কাটলে ট্রেলার প্রকাশ করা হবে। সেই সঙ্গে জানানো হবে মুক্তির তারিখ।’
নির্মাতার ভাষ্য, ‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে সিনেমাটি নির্মাণ করেছি। এতে শ্রেণিবিভেদের গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনরেখা, সংগ্রাম তুলে ধরেছি। আমার বিশ্বাস সিনেমাটি দেখলে দর্শক নিরাশ হবেন না। এ সিনেমার গল্প সবার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। প্রতিটি চরিত্র দর্শক হৃদয়ে ধারণ করবে বলে আমার বিশ্বাস। নাম শুনে গল্পের কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে হয়তো। তার চেয়েও বেশি কিছু করার চেষ্টা করেছি আমরা।’
মধ্যবিত্ত সিনেমায় অভিনয় করেছেন নবাগত শিশির সরদার, মায়িশা প্রাপ্তি, প্রয়াত মাসুম আজিজ, বড়দা মিঠু, সমু চৌধুরী, এলিনা শাম্মি, ওমর মালিক, আমির সিরাজী, সোহেল রানা, শবনম পারভীন প্রমুখ। এর গল্প, সংলাপ ও চিত্রনাট্য লিখেছেন নির্মাতা নিজেই।