× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রিভিউ

পেয়ারার সুবাস : প্রাপ্তমনস্ক প্রতীকময়, চিহ্নময়

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:৩১ এএম

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৭:২৪ পিএম

পেয়ারার সুবাস : প্রাপ্তমনস্ক প্রতীকময়, চিহ্নময়

গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সঙ্গে প্লিনিও অ্যাপুলেইও মেন্দোজার দীর্ঘ কথোপকথনের ভিত্তিতে লেখা ‘এল ওদোর ডি লা গুয়েভা’ বইটি ছাপা হয়েছিল ১৯৮২ সালে। স্প্যানিশ ভাষায় যা ‘এল ওদোর ডি লা গুয়েভা’, ইংরেজিতে সেটাই ‘ফ্র্যাগরেন্স অব গুয়েভা’; আর বাংলায় এর নাম (অর্থও বটে) ‘পেয়ারার সুবাস’। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস অনূদিত এই ‘পেয়ারার সুবাস’ আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে গত দুই দশক ধরে; কিন্তু তারপরও কোনো সাক্ষাৎকার পর্বে এখন যদি ‘পেয়ারার সুবাস’ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে নির্ঘাত উত্তর মিলবে, ‘এটা নূরুল আলম আতিকের সর্বশেষ সিনেমা স্যার।’ এ উত্তরে নিঃসন্দেহ কোনো দোষ নেই। মার্কেস আর আতিকের ‘পেয়ারার সুবাসে’ যোজন যোজন তফাৎ। এমন হলেও হতে পারে, মার্কেসের ‘পেয়ারার সুবাস’ পাঠে মুগ্ধ হয়েছিলেন নূরুল আলম আতিক; আর সেই বিমোহনের বিমোচন ঘটতে শুরু করেছিল নতুন এক সৃজনশীলতার আধারে। যা তার আপন মহিমাতেই ভিন্ন মার্কেসের ‘পেয়ারার সুবাস’ নামের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার পর্ব থেকে।

মার্কেস মনে করতেন, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে বহুজাতিক মানুষের সম্মিলন ও মিথস্ক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে এবং বিকশিত হয়েছে স্বতন্ত্র এক বাস্তবতা। এই স্বাতন্ত্র্যকে বলা যায় ক্যারিবিয়ান বাস্তবতা, যে বাস্তবতায় রয়েছে পারস্পরিক বিরোধিতার এক নিবিড় ঐকতান। এখানে ঘটেছে আফ্রিকান ক্রীতদাসদের বেপরোয়া কল্পনা, আন্দালুসিয়ার মানুষদের খেয়ালি হেঁয়ালি জীবনবোধ, গ্যালিসিয়ার মানুষজনের পারলৌকিক অন্বেষণ, কলম্বিয়ার আদিবাসীদের রীতি-আচার ও মূল্যবোধের অদ্ভুত এক মিশেল। আর এসবের মিশেলেই সেখানে দেখা দিয়েছে এমন লোকবিশ্বাস আর জীবনযাপনের রীতি, দেখা দিয়েছে এমন কল্পনার দৌরাত্ম্য আর বাস্তবতার প্রান্তরÑ যেসবের সম্মিলনে প্রবাহিত হয়েছে বৈপরীত্যময় জীবনপ্রবাহের বাস্তবতা। সৃষ্টি হয়েছে নিবিড় এক দ্যোতনা, বাস্তবতা হয়ে উঠেছে কল্পনা, কল্পনা হয়ে উঠেছে কঠিন বাস্তবতা। সব মিলিয়ে দেখা দিয়েছে জাদুবাস্তবতা। যা কি না কি বৈপরীত্য কি নৈকট্যÑ দুয়ের সঙ্গেই এমন এক ছন্দোময় নির্দিষ্ট লয়ে বয়ে চলতে পারেÑ যা সবাইকে বিমোহিত, বুঁদ করে ফেলে এমনভাবে যেন পচা পেয়ারার সুবাস নিবিড়ভাবে ঘিরে আছে তাদের।

নূরুল আলম আতিকের ‘পেয়ারার সুবাসের’ নির্মাণযজ্ঞ চলেছে আট বছর ধরেÑ সে হিসেবে বলা চলে গত ২০১৫ সাল থেকে। দীর্ঘ সময়ের এই নির্মাণ-অনুধ্যানই বোধ করি ‘পেয়ারার সুবাস’-এর নিতান্তই সাদামাটা কাহিনীতে ছড়াতে সক্ষম হয়েছে তীব্র, প্রগাঢ় স্যুররিয়ালিস্টিক আমেজ। এমনকি সবশেষে, গত ৭ ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সের প্রিমিয়ার শো-ও সমবেত দর্শনার্থীদের মধ্যে ছড়িয়েছে স্যুররিয়ালিস্টিক সুবাসÑ পেয়ারার সুবাস; পেয়ারা পচেও যেমন সুবাসের মোহিনী শক্তি দিয়ে আবিষ্ট করে রাখে, তেমনি আহমেদ রুবেলের মৃত্যুর ঘূর্ণির মধ্যে থেকেও পেয়ারা নামের নারীর সুবাস সবাইকে আটকে রাখল, বাধ্য করল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে।

গতানুগতিক কাহিনী, তবু কী আমাদের আটকে রাখে পর্দায়, ‘পেয়ারার সুবাসে’? মানুষের কাম, ঘাম, রিপু, ক্রোধ, বিবমিষা এবং প্রেমও বটে, এসবের সম্মিলিত তরঙ্গ আমাদের বারবার ভাসিয়ে নিয়ে যায় প্রান্তজনের জীবন-সংগ্রামেরও অধিক অন্তর্গত কোনো তাড়নার কাছে। আয়নাল মুন্সী, পেয়ারা, রুবেলÑ এমনকি এ সিনেমার প্রতিটি চরিত্রই যেন সেই তাড়নার প্রতীক। এই তাড়না আছে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিকে’। আছে হাসান আজিজুল হকের ‘মন তার শঙ্খিনী’তে। আছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘তারা বিবির মরদ পোলা’য়। যেন এক অনিঃশেষ পৌরাণিক প্রবাহ, যা থেকে আমরা কোনোদিন মুক্ত হব না, আমাদের কাম প্রেম ক্রোধের অভ্যুদয় ঘটবে নতুন করে, কিন্তু সেই নতুনত্বেও থাকবে আবার কোনো এক ঐতিহাসিকতা। বাংলা সাহিত্যের পরতে পরতে থাকা এই পৌরাণিক প্রবাহকে, ঐতিহাসিকতাকে চলচ্চিত্রের পর্দায় প্রতিস্থাপন করেছেন আতিক ‘পেয়ারার সুবাস’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে।

আয়নাল মুন্সী বিয়ে করে নিয়ে আসছেন পেয়ারাকে- এমন পরিপ্রেক্ষিত থেকে এগুতে থাকে এ সিনেমার কাহিনী। কিন্তু দ্রুতই তা সমাজের ও মানুষের মননের এমন সব ক্ষেত্রের দিকে আমাদের তাকাতে বাধ্য করে, যেসব আমরা চেষ্টা করি লুকিয়ে রাখার। মানুষের যৌনজীবন সম্পর্কে প্রথাবদ্ধ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ট্যাবু, বৈবাহিক জীবনকে ঘিরে পুরুষের চূড়ান্ত আধিপত্যবাদিতা, নারীর যৌনজীবনের পরতে পরতে থাকা অবদমনÑ এমন সব জটিল বিষয়কে নূরুল আলম আতিক এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, বিশেষ কোনো যৌনাবেদনময় দৃশ্যরাজি না থাকার পরও ‘পেয়ারার সুবাস’ হয়ে ওঠে প্রাপ্তমনস্কদের চলচ্চিত্র।

খুব দ্রুতই আমাদের চোখ বুঝে নেয়, শরীরের গন্ধ হলো ‘পেয়ারার সুবাসে’র ট্রিগার পয়েন্ট। জোড়া খরগোশ, জোড়া পাখি, বৃষ্টিস্নাত পৃথিবীতে শামুকের চলাচল, অভাবনীয় বৃষ্টির ধারা এমন প্রতীকী অপূর্ব সব দৃশ্য ফুঁড়ে আমাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় সুবাসের এই সত্য। এই গন্ধ বিক্রিয়া ঘটায় প্রকৃতির সঙ্গে, শরীরের সঙ্গেও বটে। চরাচরজুড়ে বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে থেকে যেন উঠে আসে এই ঘ্রাণ, ক্রমশই তা আক্রান্ত করে আমাদের, প্রথমে আমাদের দৃষ্টিকে, তারপর আমাদের নাসিকাকে। প্রাণসত্তার অধিকারী বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীরা নৈকট্যে আসে এবং পরস্পরের শরীরের কাছে থিতু হয় ঘ্রাণের বিজড়নের মধ্য দিয়েÑ প্রচল এ ধারণাকে নূরুল আলম আতিক এ সিনেমায় চ্যালেঞ্জ করেননি। আবার এমনও নয় যে, এই ধারণাকে তিনি মেনে নিয়েছেন নিরুপায়তা দিয়ে; আর সে কারণেই বোধ করি প্রচল এই ধারণাকে সিনেমার ভাষায় উপস্থাপন করতে গিয়ে, বিকশিত করতে গিয়ে আতিক যা করেছেন, সেটি আবার সিনেমার প্রচল ভাষাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। আমাদের তিনি নিয়ে গেছেন পৌরাণিক এক বৃষ্টিপাতের জগতে, নিয়ে গেছেন এমন এক প্লাবনভূমিতে যেখানে প্রেম-ভালোবাসা-যৌনতা ডুবসাঁতার খেলেছে অশরীরী প্রেতাত্মা হয়ে।

পেয়ারাকে তার মামা বিয়ে দিয়েছিল বয়সি মুন্সীর সঙ্গে আর তাতে পেয়ারারও সায় ছিল বটে। কিন্তু স্বামীর ঘরে এসে সে যখন দেখে মুন্সী আসলে খাটিয়া বানায়, তখন তার গায়ের গন্ধ দুঃসহ হয়ে ওঠে পেয়ারার কাছে। মুন্সী তাকে জোর করে খাওয়াতে থাকে কাঁঠালের রোয়া; কাঠালের ঘ্রাণ থেকে আমরা জন্ম নিতে দেখি এক ট্যাবুর, আত্মপ্রকাশ ঘটতে দেখি বিবমিষার; জোর করে এই ঘ্রাণের সঙ্গে পেয়ারাকে অভ্যস্ত করে তুলতে চায় আয়নাল মুন্সী, কিন্তু পেয়ারা তাতে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে মুন্সীর কাছ থেকেÑ যে মুন্সীকে যে বিয়ে করতে দ্বিধা করেনি সচ্ছলভাবে জীবন কাটাতে পারবে ভেবে। কিন্তু ঘ্রাণ এসে ভীষণ ভয়ংকর এক দেয়াল তোলে আয়নাল আর পেয়ারার মধ্যে, ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ে পেয়ারা। কিন্তু আবার তাকে একটু-একটু করে সুস্থ হয়েও উঠতে দেখা যায় পাখিওয়ালা হাশেমের আগমনের সময় থেকে। হাশেম, পেয়ারার পুরোনো প্রেমিক, তার অস্তিত্ব, যেনবা তার ঘ্রাণই তাকে সুস্থ করে তুলতে থাকে, আবারও প্রেম ফিরে আসে তার জীবনে, ফিরে আসে প্রতিহিংসা, ক্রোধ আর কান্নাও। ধুতুরার বিষে মুন্সীকে বিষাক্ত করে তোলে পেয়ারা। মুন্সী তখন নিজের শরীরেই খুঁজে পায় মৃত মানুষের অসহনীয় গন্ধ। প্রেম কেবল জীবনের জয়গান গায় না, হত্যারও শক্তি জোগায়Ñ ইতিহাসের এই ক্লিশে কিন্তু নিরুপায়, অনপেক্ষণীয় সত্যকে আবারও ফিরে আসতে দেখি আমরা ‘পেয়ারার সুবাসে’র কল্যাণে; হয়তো এই দৃশ্যাভাসও নিতান্তই ক্লিশে দেখাত, কিন্তু আবহমান বৃষ্টিপাতের তরঙ্গে, প্লাবনের নিরুপায় নিমগ্নতার বিস্তারে তা আমাদের নিঃসাড় করে ফেলে, চমকে দেয়, নিমগ্নতায় ডুবিয়ে রাখে।

প্রতীককে উপলব্ধি করার ক্ষমতা যার নেই, নূরুল আলম আতিকের এই চলচ্চিত্রের অন্তর্হিত সৌন্দর্য ও আস্বাদ গ্রহণ তার পক্ষে নিঃসন্দেহে কঠিন; শুধু কঠিন কেন, বলতে গেলে দুঃসাধ্য। আতিকের ‘পেয়ারার সুবাস’ বাংলাদেশের সিনেমাকে কেবল প্রাপ্তমনস্কই করে তোলেনি, বলতে গেলে এই প্রথমবারের মতো প্রতীকময়, চিহ্নময়ও করে তুলেছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা