ফারুক আহমেদ
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২২ ২১:২৯ পিএম
আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২২ ১০:০৬ এএম
লালন সাঁই প্রয়াত হন ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক। প্রয়াণ দিবস ঘিরে ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি ও সমাধিস্থলে প্রতিবছর জড়ো হয় সাধু এবং দেশি-বিদেশি লালনভক্তগণ। তাঁকে স্মরণ করা হয় সংগীত এবং ভক্তি জ্ঞাপন করে।
লালন যে মাধুর্য এবং মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন সাধনসংগীতে, তার তুলনা সমসাময়িককালে কারও সঙ্গে করার মতো দ্বিতীয় উদাহরণটি পাওয়া মুশকিল। আমরা অপার মুগ্ধতায় ডুবে যাই তাঁর গানের কথায়-সুরে। লালনের সংগীত এবং সাধনা যেমন অপরূপ হয়ে হাজির আমাদের সামনে, তেমনি তাঁর জীবনাচার সাধুদের সাধনার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হিসেবে বিবেচিত। মানুষ তার আত্মার শুদ্ধতম সাধনায় যা আবিষ্কার করে, সে মানবসাধনাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এর বাইরে লালন নিজে কখনোই তাঁর জন্ম, পিতা-মাতা, ধর্ম এসব নিয়ে কথা বলেননি।
সাধন এবং সংগীতের বাইরে লালন নিজেকে প্রকাশিত করেননি। ফলে তাঁর অপ্রকাশিত জীবন নিয়ে ভক্তদের ভেতর অসীম কৌতূহল। তাঁর জন্ম এবং প্রকৃত পরিচয়ের সন্ধান করতে না পেরে গবেষক বা উপন্যাস লেখকরা নিজেদের মতো করে লালনের জীবনকে আঁকতে চেষ্টা করেছেন। এতে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে লালন আমাদের সামনে হাজির হন। তাঁর সংগীতের মতোই এক প্রহেলিকাময় মানুষকে দেখতে পাই লালনের ভেতর দিয়ে।
লালন সাঁইকে নিয়ে এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের খবর রয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই লালনকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। ‘লালন ফকির’ শিরোনামে এ চলচ্চিত্রের পরিচালক খ্যাতিমান অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম। ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখের একটি মঞ্চনাটক থেকে চলচ্চিত্রায়ণ করা হয়। সিনেমা হওয়ার আগে লালনকে নিয়ে লেখা নাটকটি বেশ ক’বার মঞ্চায়ন হয়। সৈয়দ হাসান ইমাম নিজেই চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখেন; এতে লালনের ভূমিকায় অভিনয় করেন অভিনেতা উজ্জ্বল।
লালনকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার পর একই নামে আরও একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায় কলকাতা থেকে। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘লালন ফকির’ নামে নতুন এই চলচ্চিত্রের পরিচালক শক্তি চট্টোপাধ্যায়, চিত্রনাট্য ও সংলাপ মন্মথ রায়।
তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ২০০৬ সালে ‘লালন’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর আগে এই পরিচালক লালনকে নিয়ে ‘অচিন পাখি’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘লালন’ চলচ্চিত্রে আমরা ঘোরগ্রস্ত এক লালনকে পাই। যিনি সাধক এবং মহাত্মা-যিনি একটি সাধন-ভ্রমণে নিজেকে সমর্পিত করে রেখেছেন। এ চলচ্চিত্রটি ‘মিউজিক্যাল ফিল্ম’ হিসেবেও মুগ্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। খুব জনপ্রিয় হয়নি সিনেমাটি, তবে সাধক হিসেবে লালন সবচেয়ে গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছেন এই চলচ্চিত্রেই।
২০১০ সালে বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ প্রযোজনায় মুক্তি পায় চলচ্চিত্র ‘মনের মানুষ’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রের পরিচালক গৌতম ঘোষ। চিত্রনাট্য এবং সংলাপও তারই লেখা। লালনকে নিয়ে নির্মিত যেসব সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, তার মধ্যে এ সিনেমাটি সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় হয়। এ চলচ্চিত্রে লালনের ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ। এরপর লালনকে নিয়ে আরও একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। ‘অন্ধ নিরাঙ্গম’ নামে এ চলচ্চিত্রে লালন সশরীরে উপস্থিত হননি। তাঁর দর্শন, তাঁর সংগীত, তাঁর ভাবাদর্শের অনুসারীদের ভিন্ন ভিন্ন মতকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। এটির পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল।
লালনকে নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। এই আগ্রহ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে লালনকে নিয়ে হয়তো আরও চলচ্চিত্র নির্মিত হবে। তাঁর জীবন, তাঁর ভাবাদর্শের নানা রূপ-রূপান্তর সেসব চলচ্চিত্রে উঠে আসবে হয়তো। তবে আপাতত লালনকে বড়পর্দায় দেখতে চাইলে এই পাঁচটি চলচ্চিত্রই আমাদের ভরসা।