মহিউদ্দিন মাহি
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৩ ১৬:১৬ পিএম
এবারের ঈদুল আজহা সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের জন্য অসাধারণ একটি ঈদ কেটেছে। যার কারণ ছিল দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির দুর্দান্ত কিছু সিনেমা। যা এবারের কোরবানির ঈদে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পেয়েছে। ঈদ শেষ হওয়ার ১৯ দিন আজ। এখনও সিনেমা হলগুলোতে দর্শকদের উপস্থিতি মুগ্ধ করেছে নির্মাতা, প্রযোজক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের। হয়তো এমন দর্শক উপস্থিতি আরও কিছুদিন দেখা যাবে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে। তবে সারা বছর দর্শকদের এমন জোয়ার ধরে রাখার জন্য করণীয় কী, সে বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের কথা হয় প্রযোজক, নির্মাতাদের সঙ্গে।
সিনেমার বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৩০০ সিনেমা হল ছিল। সারা বাংলাদেশের প্রতিটি থানায় তখন হল ছিল। যেগুলোতে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন সিনেমা মুক্তি দেওয়া হতো, দর্শকরাও প্রাণভরে সিনেমাগুলো উপভোগ করতেন। প্রযোজক ও নির্মাতারাও দর্শকদের কথা মাথায় রেখে নিজেদের কাজটি মনোযোগ দিয়ে করতেন। যার ফলে দেশের ইন্ডাস্ট্রির কালজয়ী সিনেমাগুলো সে সময় সবচেয়ে বেশি নির্মাণ হয়েছে। কারণ দর্শক চাহিদা মাথায় রেখে কাজ করতেন সবাই। এখন সময় বদলে গেছে। ১৩০০ হলের জায়গায় দেশে মাত্র হাতে গোনা নিয়মিত হলের সংখ্যা ৪৩-৪৪টির মতো। এর পর ঈদকে সামনে রেখে সিজনাল হলসহ মোট ১৬৮টি হলে ঈদের সিনেমাগুলো মুক্তি দেওয়া হয়। সেখানে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, এই হলগুলো রোজার ঈদের পর থেকে কোরবানির ঈদ অবধি আর বন্ধ হয়নি।
তাই বলাই যায়, কনটেন্ট ভালো হলে দর্শক হলে আসবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের যেটা করতে হবে সচেতনতা ও দর্শকদের পছন্দের কথা মাথায় রেখে সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া শুধু ঈদকেন্দ্রিক সিনেমা নির্মাণ করলেও আমাদের চলবে না। কারণ বছরের অনেকটা সময় কোনো ফেস্টিভ্যাল থাকে না। সে সময়টিতে হলে দর্শক ধরে রাখাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে, সেই বিষয়টি নিয়ে আমরা যারা সিনেমাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়েছি তাদের গবেষণা করতে হবে। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে হবে। হল নেই সেই দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ হল ছিল, দর্শকে ছিল। কেন দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সে বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের সিনেমার ভালো সময় আবারও এসেছে। এটা ধরে রাখার জন্য আমাদের সবার একত্রিত হতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। ভালো সিনেমা নির্মাণ হলে সারা বছর হলে দর্শক থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
গোটা বছর দর্শক ধরে রাখার বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের কথা হয় ‘হাওয়া’ সিনেমার নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “শুরুতেই আমি বলব আমাদের ‘হাওয়া’ সিনেমা নিয়ে। সিনেমাটি আমরা কিন্তু ঈদের তিন সপ্তাহ পরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়েছিলাম এবং দর্শকদের থেকে অসম্ভব ভালোবাসা পেয়েছি। তাই হলে দর্শক ধরে রাখার বিষয়ে আমার মন্তব্য হচ্ছে, গোটা বছরের সিনেমাটিক একটা রোডম্যাপ তৈরি করা। কীভাবে ইন্ডাস্ট্রি সারা বছর চলবে তার একটা খসড়া করা। কারণ এটা মনে করলে হবে না, শুধু দুই ঈদে সিনেমা নির্মাণ করে দর্শকদের সিনেমা দেখাব, ব্যবসা করব। ভালো কনটেন্ট হলে গোটা বছর সিনেমা দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব। বিগত দিনে এমন ব্যবসা বছরজুড়ে হল মালিক ও প্রযোজকরা করেছেন। কিন্তু আমাদের মাথায় এখন একটি বিষয় সেট হয়ে গেছে। সেটি হলো ঈদে সিনেমা মুক্তি। কিন্তু আমি মনে করি আমাদের দেশে নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি ভ্যাকেশনের সময় থাকে। এ সময় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে, সবাই ছুটি পায়। তা হলে কেন শুধু ঈদকে কেন্দ্র করে ভালো সিনেমা মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বছরের ১২ মাস যদি ভালো গল্পের সিনেমা মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে দর্শক অবশ্যই হলে নিয়মিত হবে বলে আমি আশাবাদী। যদি বছরজুড়ে ভালো কনটেন্ট থাকে অবশ্যই দর্শক ধরে রাখা সম্ভব। জাস্ট প্ল্যানিং করে এগোলেই ইন্ডাস্ট্রি আবারও ৩৬৫ দিন দর্শকদের এন্টারটেইন করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
গেল কোরবানির ঈদের তিনটি সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। তার মতে, “দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এ বছরের ঈদে নয়, আমার ধারণা গত বছরের ঈদ থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। যার শুরু হয়েছিল ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ সিনেমার হাত ধরে। এবার সেই ধারাবাহিকতা নির্মাতা ও অভিনেতারা ধরে রেখেছেন। সবার প্রচেষ্টাতেই হলে দর্শক ফিরেছে বলে আমি মনে করি। তবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটি উৎসব যথেষ্ট নয়, বছরের ১২টি মাস নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে। সারা বছর দর্শক থাকতে হবে হলে। সে ক্ষেত্রে কনটেন্টে মনোযোগী হতে হবে সবার। গবেষণা করতে হবে দর্শকদের রুচি নিয়ে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি গল্পনির্ভর সিনেমা দিয়ে দর্শক টানতে হবে। যখন সব ধরনের সিনেমা সফল হবে, তখনই একটা ইন্ডাস্ট্রি মজবুত বলে ধরে নেওয়া যায়। তখন নিয়মিত সিনেমার পাশাপাশি দর্শকও হলে নিয়মিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
সেন্সর বোর্ডের সদস্য ও অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস বলেন, ‘এটা খুবই দারুণ বিষয় যে আবারও হলে হলে দর্শক ফিরছে। ঈদে মুক্তি পাওয়া প্রায় সবগুলো সিনেমাই দর্শক পাচ্ছে। প্রিয়তমা তো ইতিহাস করছে। সুড়ঙ্গও খুব ভালো করছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সারা বছর হলে দর্শক ধরে রাখা। সবাই এক হয়ে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।’
গেল কোরবানির ঈদে দেশের প্রেক্ষেগৃহে ৫টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সিনেমাগুলো হলো হিমেল আশরাফ পরিচালিত ‘প্রিয়তমা’, রায়হান রাফি পরিচালিত ‘সুড়ঙ্গ’, চয়নিকা চৌধুরী পরিচালিত ‘প্রহেলিকা’, সৈকত নাসির পরিচালিত ‘ক্যাসিনো’, বন্ধন বিশ্বাস পরিচালিত ‘লাল শাড়ি’। প্রতিটি সিনেমাই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তার মধ্যে শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিয়তমা’ ব্যবসায়ের হিসাবে ঝড় তুলেছে। নিশো-তমার ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমাটিও এগিয়ে চলেছে বড় সাফল্যের পথে।