প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১৪:২৪ পিএম
আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১৪:২৫ পিএম
মঞ্চ থেকে টিভি নাটক, চলচ্চিত্র থেকে অভিনয়, নাট্য রচনা থেকে নির্দেশনা, কিংবা উপন্যাস সবখানেই তার সফল পদচারণা। তার নাটক, সিনেমায় বাংলাদেশের সমসাময়িক পারিবারিক, সামাজিক ও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচিত্র পেশাজীবী মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের কথা উঠে এসেছে। তিনি চিত্রনাট্য রচনায় যেমন নিজের প্রতিভা আর শক্তির পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি নিজের অপরিমেয় ক্ষমতার প্রমাণ রেখেছেন তার নির্দেশনায় ও অভিনয়েও।
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তিনি হেঁটেছেন সংস্কৃতিচর্চার প্রায় সব ক্ষেত্রে। ‘মেরাজ ফকিরের মা’, ‘কোকিলারা’, ‘উজান পবন’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘দ্যাশের মানুষ, সুবচন নির্বাসনে’র মতো নাটকের স্রষ্টা তিনি। তার হাতেই চিত্রায়ণ হয়েছিল শহীদুল্লা কায়সারের অমর উপন্যাস ‘সারেং বৌ’। টিভি নাট্যকার হিসেবেও তিনি দারুণ সফলতা পেয়েছেন। তার এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল সেই শহীদুল্লা কায়সারের অমর উপন্যাস ‘সংশপ্তক’ যখন তিনি চিত্রায়ণ করলেন টিভি নাটকে। চিত্রনাট্য আবদুল্লাহ আল মামুন লিখলেও পরিচালনা করেছিলেন যৌথভাবে আবদুল্লাহ আল মামুন ও আল মনসুর। শেষের দিকে আবার মোহাম্মদ আবু তাহের। ১৯৬৯ সালে নির্মাণ শুরু হয়েছিল সংশপ্তক নাটকের। ১৯৭১-এ চার পর্ব প্রচারিত হলো, আবার মুক্তিযুদ্ধের কারণে নাটকের নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেল। ফের আবার মুক্তিযুদ্ধের পর নির্মাণ শুরু হলো। আবদুল্লাহ আল মামুনের হাত ধরে ১৯৮৫ সালে নতুন করে সূচনা হলো ফের। ১৯৮৮ সালে টিভি পর্দায় ফিরে এলো সংশপ্তক।
সেই দিক থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ধারাবাহিক নাটকের সূচনা তার হাতেই। আবদুল্লাহ আল মামুনের মৌলিক নাটক সৃষ্টির হাত ষাটের দশকের শুরুতে। প্রথম নাটক ‘নিয়তির পরিহাস’। এই নাটকটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৬১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে। এরপর ক্রিস্টোফার মার্লোর বিখ্যাত নাটক ‘ডক্টর ফস্টাস’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন সময়ে তিনি লিখেছিলেন ‘বিন্দু বিন্দু রঙ’ নামে আরেকটি মৌলিক নাটক। তবে আবদুল্লাহ আল মামুন আলোচনায় এসেছিলেন ‘শপথ’ নাটক রচনার মধ্য দিয়ে। সে বছর সংস্কৃতি সংসদের উৎসব হবে। সেই উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে মঞ্চায়িত হয়েছিল শপথ নামের যুদ্ধবিরোধী নাটকটি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মৌলিক নাটক রচনা শুরু করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। মঞ্চ নাটকেও মনোনিবেশ করেন তখন। ১৯৭৪ সালে মঞ্চের জন্য সৃষ্টি করলেন বিখ্যাত নাটক ‘সুবচন নির্বাসনে’। ১৯৭৫ সালে তিনি আনলেন ‘এখনও দুঃসময়’। তারপর একে একে ‘এবার ধরা দাও’, ‘সেনাপতি’, ‘অরক্ষিত মতিঝিল’, ‘ক্রস রোড ক্রস ফায়ার’, ‘আয়নায় বন্ধুর মুখ’, ‘এখনও ক্রীতদাস’, ‘শাহজাদীর কালো নেকাব’, ‘চারদিকে যুদ্ধ’ কিংবা ‘এখনও ক্রীতদাস’-এর অসামান্য সব নাটক উপহার দিয়েছেন তিনি।
চলচ্চিত্রেও অসামান্য মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। সারেং বৌ নির্মাণ করেই থেমে থাকেননি আবদুল্লাহ আল মামুন। রাজ্জাক, শাবানা ও ফারুককে নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র ‘সখী তুমি কার’। ১৯৮০ সালে তিনি নির্মাণ করলেন আরেক অসামান্য চলচ্চিত্র ‘এখনই সময়’। যে চলচ্চিত্রে আব্বাস আলী তালুকদার নামে এক প্রগতিশীল যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘এখনই সময়’ চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন ববিতা। এই চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি আফজাল হোসেন, দিতি, কবরী ও বুলবুল আহমেদকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দুই জীবন’। ছবির গান বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। ‘সারেং বউ’, ‘দুই জীবন’ ছবির গান কালজয়ী হয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন ছিলেন শক্তিমান অভিনেতাও। নানা পরিচয়ে তার এই পরিচয়টি যেন অনেকটা ভাটায় থেকেছে। বহু নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। সিনেমাতেও ছিলেন বেশ সপ্রতিভ। আবদুল্লাহ আল মামুন অভিনয় করেছিলেন গোলাপী এখন ট্রেনে, এখনই সময়, জনম দুঃখী, দারুচিনি দ্বীপ, দরিয়াপাড়ের দৌলতিসহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে। তিনি তার অভিনয়জীবনে চাষি থেকে শুরু করে যুবক, নেতা, সেনাপতি, মাতবর, বাবা, শিক্ষক, ব্যারিস্টার, নায়ক, বাউল, ফকির, হাজী, ব্যাপারী, ব্যবসায়ী প্রভৃতি স্বদেশীয় চরিত্রের পাশাপাশি ওথেলো নাটকে ইয়াগো, আন্তিগোনে নাটকে ক্রেয়ন প্রভৃতি ভিনদেশি চরিত্রে অভিনয় করেন।
আবদুল্লাহ আল মামুন অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। নাট্যদল থিয়েটার তো বটেই, যার আরেকটি প্রমাণ ১৯৯০-এ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে অধ্যক্ষ করে আবদুল্লাহ আল মামুনের হাতে গড়া থিয়েটার স্কুল। পাশাপাশি এরশাদ শাসনামলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আবদুল্লাহ আল মামুনের ভূমিকা ছিল অসামান্য। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক।
ঔপন্যাসিক হিসেবেও আবদুল্লাহ আল মামুন সফল। ‘মানব তোমার সারা জীবন’, ‘হায় পার্বতী’ কিংবা ‘খলনায়ক’ উপন্যাসগুলো তারই প্রমাণ।
আজ আবদুল্লাহ আল মামুনের জন্মদিন। ১৯৪২ সালের ১৩ জুলাই জামালপুরে আমড়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আবদুল্লাহ আল-মামুনের পিতা অধ্যক্ষ আব্দুল কুদ্দুস এবং মাতা ফাতেমা খাতুন। তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ পাস করেন।
দীর্ঘ রোগভোগের পর ২১ আগস্ট, ২০০৮ সালে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নাট্যামোদী মানুষের প্রিয় এই ব্যক্তি। সেই সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। সংস্কৃতিচর্চার এই অনন্য মহারথীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।