প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৩ ১৫:৫৩ পিএম
হুমায়ুন ফরীদি এক নক্ষত্রের নাম। ঠিক তেমনি একটি দীর্ঘশ্বাসেরও নাম। আমরা কেবল সহকর্মী ছিলাম না, পরস্পরের ভালো বন্ধুও ছিলাম। ব্যক্তি ফরীদিকে আমি ভাই হিসেবে, বন্ধু হিসেবে আপন করে নিয়েছিলাম। সৃষ্টি নিয়ে একই রকম ভাবনা, এক সঙ্গে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া, হাসি-গান-গল্প-আড্ডার মধ্য দিয়ে রক্তের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে আত্মার সম্পর্কে পৌঁছেছিলাম আমরা।
মনে হতো, তিনি যেন আমার ঘরেরই একজন। মন চাইলে যেকোনো সময় বাসায় চলে আসতেন ফরীদি। এসেই বলতেন ‘কী রেঁধেছিস? ভাত দে, খিদা লাগছে।’ এই কথাগুলো এখনও কানে বাজে।
ফরীদি অভিনয় করতেন মেধা দিয়ে। তার রক্তেই যেন অভিনয় ছিল। যেকোনো চরিত্র কি অবলীলায় সে ফুটিয়ে তুলত। ঢাকা থিয়েটারে তার প্রথম নাটক ছিল ‘শকুন্তলা’। সেখানে তক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন ফরীদি। প্রথম নাটকেই সবার নজরে পড়েন। নাটকের রিহার্সেল হয়েছিল টিএসসিতে। সেখানেই ফরীদির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। এখনও চোখে জ্বলজ্বল করছে সেদিনের স্মৃতি। ফরীদিকে নিয়ে এসে বাচ্চু [নাসির উদ্দীন ইউসুফ] বলল, 'ছেলেটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে। আজকে তার রিডিং হবে।’ কী রিডিং করে তা শোনার জন্য মনোযোগী হয়ে বসে পড়লাম। জাহাঙ্গীরনগর থেকে এসে কী এমন করবে! মনে মনে এটাই ভাবছি। কিন্তু রিডিং শুরুর পর চমকে গেলাম, তার অভিব্যক্তি মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল সবাইকে।
আপাতদৃষ্টিতে হুমায়ুন ফরীদি সবার কাছে একজন কীর্তিমান অভিনেতা। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সে আরও অনেক কিছু আমাদের দিতে পারত। অনেক কিছুই তার করার বাকি ছিল। এটি আমার জন্য অনেক কষ্টের। তার মতো অভিনেতাকে আমরা ব্যবহার করতে পারলাম না। ফরীদি অসম্ভব রুচিশীল ও উদার মনের মানুষ ছিলেন। যাকে ভালোবাসতেন, তাকে মন দিয়েই ভালোবাসতেন। কোনো ভণিতা তার মধ্যে দেখিনি। রবীন্দ্রসংগীত, পুরোনো দিনের আধুনিক গানে অন্যরকম দখল ছিল।
নাটকের শো শেষ করে আমরা গলা ছেড়ে গাইতাম। ফরীদির প্রাণবন্ত গলা আসর মাতিয়ে রাখত। তার হাসিমাখা মুখটা বারবার মনে পড়ে। কোথাও ঘুরতে গেলে খুব মজা করত। মাঝেমধ্যে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটাত। আসলে ফরীদি ছিল এমনই মানুষ হিসেবে সাধারণ আর শিল্পী হিসেবে অসাধারণ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পীর মৃত্যু নেই। সৃষ্টি দিয়ে আজীবনই থাকবেন স্মৃতিতে অমলিন।