× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মনের আনন্দে গান করি: ইসলাম উদ্দিন পালাকার

লিমন আহমেদ

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৩ ১২:১৪ পিএম

আপডেট : ২২ মে ২০২৩ ১২:৪৭ পিএম

মনের আনন্দে গান করি:  ইসলাম উদ্দিন পালাকার

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নোয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা রবিউল্লাহ। দারিদ্র্য আর অভাবের সংসার তার। চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে বেশ পরিবারই বলা চলে। আর দশটা বাবার মতো তিনিও চান ছেলেরা সংসারের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু ছোট ছেলের ইসলামি গানের প্রতি ঝোঁক। যেখানেই গানের আসর বসে ছুটে যায় সে। নিজেও গায় গুন গুন করে। ১২ বছর বয়সেই যাত্রাপালায় নাম লেখায়। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ উধাও। জানা গেল পালাগানের বিখ্যাত শিল্পী কুদ্দুস বয়াতীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে সে। তার শিষ্য হবে বলে। এরপর জড়িয়ে পড়ে পালাগানে। বাকিটুকু ইতিহাস। রবিউল্লাহর ছোট্ট সেই ইসলাম এখন বিখ্যাত ইসলাম উদ্দিন পালাকার। দেশ-বিদেশে তার সুনাম। সম্প্রতি কোক স্টুডিওতে ‘দেওরা’ গান গেয়ে দেশের পাশাপাশি বিদেশের কোটি মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। লিমন আহমেদের লেখায় মাটি ও মানুষের সেই শিল্পী ইসলাম উদ্দিন পালাকারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যাক...

আপনি অনেক আগে থেকেই বিখ্যাত। দেশে-বিদেশে শো করেছেন। কিন্তু সবই বাঙালিদের জন্য গেয়েছেন। কিন্তু ‘দেওরা’ গানটি বাংলা ভাষা ছাড়াও নানা ভাষার মানুষকে আনন্দ দিচ্ছে। কেমন লাগছে বলুন?

খুব ভালো। এই আনন্দ আসলে বলে বোঝানো যাবে না। অনেকে গানটি নিয়ে টিকটক করছেন। ফেসবুকে নিজেরা ভিডিও করছেন। আমার খুব ভালো লাগছে। আমি দেশে-বিদেশে অনেক গান করেছি। লন্ডনে গিয়েছি সরকারের অতিথি হয়ে। অনেক প্রশংসা পেয়েছি। কিন্তু এত বড় স্টুডিওতে এই প্রথম গাইলাম, যেখান থেকে কোটি কোটি মানুষ গানটি শুনতে পারছে। আমি কোক স্টুডিওর কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে অনেক বড় সুযোগ করে দিয়েছে।

আপনার এলাকার মানুষেরা গানটি নিয়ে কী বলছে?

তারা তো সবাই খুব খুশি। গ্রাম এলাকা, ভাটি অঞ্চল। এখানে ওইভাবে কোক স্টুডিও সবাই চিনত না। আমি গান করার পর সবাই চিনল। সবাই গানটি দেখছে। বাজারে, হাটে-মাঠে, স্কুলে এই গান নিয়ে আলোচনা। যেখানেই যাই সবাই এসে হাত মিলিয়ে যাচ্ছে। গানটি শুনতে চাইছে। আর ফোনটা তো চালাতেই পারছি না। একের পর এক কল আসে। দেখা করতে চায়। আসলে গ্রামের এই মানুষগুলোই আমার আপনার লোক। এরা এত খুশি হয়েছে দেখে আমার খুব আনন্দ হয়। আমি এই আনন্দের জন্যই আজীবন গান করতে চেয়েছি। এখন মনে হয় আমি সার্থক।

কোক স্টুডিওতে গানের প্রস্তাবটি কীভাবে পেয়েছিলেন?

কোক স্টুডিও থেকে এক ভাই ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। দেখা করতে বললেন। গিয়ে দেখি অর্ণব ভাই, প্রীতম ভাইসহ অনেকে। প্রথমে লাঞ্চ করলাম। পরে গান নিয়ে কথা হলো। একটু ভয় লাগছিল সব শুনে। এত বড় স্টেজ কেমন কী হয় জানি না। যখন গানের সুরটা শুনলাম খুশি হলাম। কারণ এই সুরে আমিও একটি গান নিয়মিতই গাই মঞ্চে। শুধু গানের কথাগুলো আলাদা। এটা নৌকা বাইচের গান। দোহার আছে। এসব গান শুনতে ভালো লাগে। গাইতেও ভালো লাগে। আমার গলায় গানটি প্রথমবার শুনেই সবাই বুঝতে পেরেছিলেন যে এটা ভালো কিছু হবে।

কোক স্টুডিওতে গান করা ও অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

খুব ভালো অভিজ্ঞতা। এত বড় মঞ্চে গান করে আমি অনেক কিছু শিখলাম। অর্ণব ভাই, প্রীতম হাসান ভাইসহ যারা ছিলেন সবাই খুব ভালো। প্রীতম ভাই এই গানের বড় কারিগর। ‘দেওরা’ হলো বাইচের গান। তিনি এটাকে নতুন করে বানিয়ে এত মজা করে সবার সামনে নিয়ে এসেছেন। গানটা বের হওয়ার পর এত কথা হচ্ছে, এত প্রশংসা পাচ্ছি যে বলে শেষ করা যাবে না। যদি সুযোগ পাই আমি বারবার কোক স্টুডিওতে গাইতে চাই।

গানটা তো সুপারহিট। নানা মাধ্যমে কোক স্টুডিও অনেক টাকা আয় করবে। আপনি কি প্রাপ্য সম্মানি পেয়েছেন?

টাকার জন্য নয়, মনের আনন্দে গান করি। আমি ভালোবাসার জন্য গান করি। আমাকে যে যখন গান করতে ডাকে আমি ছুটে যাই। কে কত টাকা দিল সেটা বড় নয়। গানটাকে কে কত আনন্দ নিয়ে শুনল, উপভোগ করল, সেটাই আসল। কেউ গান ভালোবাসলে তাকে আমার ভালো লাগে। আমি কখনো বলি না যে আমাকে এত টাকা দিতে হবে। এভাবে টাকা চাইলে লোকটার মনে কষ্ট লাগতে পারে। সেদিক থেকে কোক স্টুডিও আমাকে যা দিয়েছে তা অনেক। তারা পারিশ্রমিক দিয়েছে, একটি বড় মঞ্চ দিয়েছে গান করার। সবাই মুরুব্বি হিসেবে, শিল্পী হিসেবে অনেক সম্মান দিয়েছে। 

আপনি কুদ্দুস বয়াতীর ছাত্র। তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়? ‘দেওরা’ গানটি তিনি শুনেছেন কি না জানেন?

উনার সঙ্গে আমার অনেক দিন যোগাযোগ হয়নি। তিনি ‘দেওরা’ শুনেছেন কি না তাও জানি না।

এবার একটু আপনার কথা শুনি। এখন পর্যন্ত আপনার লেখা পালাগানের সংখ্যা কত?

এসব তো পুরোনো কিচ্ছা-কাহিনী নিয়ে তৈরি। আমার লেখা বলা যাবে না। পুরোনো কিচ্ছাগুলো নিজের মতো করে সাজিয়ে পরিবেশন করি। কিচ্ছার ফাঁকে ফাঁকে নানা রকম গান থাকে। সেগুলো আমি লিখি। অনেক পালা আমি করেছি। অনেক গানও আছে আমার। 

এখন তো গরমকাল। গানের ব্যস্ততা কেমন?

আছে ভালোই। এখন ধান তোলার কাজ শেষ হবে। বর্ষাকাল শুরু হবে। সবার কাজ কম থাকবে। অনেক গান-বাজনা হবে। তবে আগের মতো সেই জোয়ার আর নাই। আগে আমরা দেখতাম বৈশাখের ধান ঘরে উঠলেই যাত্রাপালার আসরের ধুম লাগত। এখন খুব কম হয়। 

আপনি গ্রামেই থাকেন। শহরে থাকতে ইচ্ছা করে না?

কাজ না থাকলে আমি ঢাকায় থাকি না। গ্রাম আমার ভালো লাগে। গ্রামই আমার সব। আমি গ্রামে পালাগান করেই ঢাকার মানুষের কাছে মর্যাদা পেয়েছি, সেই আমি ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে গেলে মর্যাদাহীন হয়ে যাব। গ্রামে থেকেই পালাগান করতে চাই আমি। আমি এই গ্রাম ছেড়ে থাকতে পারব না।

আপনি কখনও নাটক-সিনেমায় গান করেছেন?

কিত্তনখোলা সিনেমায় একটা গান করেছিলাম। এরপর আর সিনেমায় গান করিনি। নাটকে কখনও গান হয়নি। যদি কেউ মনে করেন আমাকে দিয়ে গান করানো যায়, তবে হয়তো তারা ডাকবেন। আমার গান করতে কোনো সমস্যা নেই।

পালাগান গুরু-শিষ্য পরম্পরায় চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। আপনিও একজনের শিষ্য। আপনার শিষ্য নেই কেউ?

ওইভাবে বলতে গেলে না। কারণ এখন নানা রকম গানের ব্যবস্থা আছে। অনেকে ইউটিউব দেখেই গান শিখে ফেলে, গেয়ে গেয়ে শিল্পী হয়ে যায়। কিন্তু পালাগান বা গানের দল করা কঠিন বিষয়। অনেক সময় দিতে হয়। লাঞ্ছনা সইতে হয়। আমি নয় মাস পড়ে ছিলাম আমার গুরুর বাড়িতে। পালাগান শিখব বলে। বললেই হয়ে যায় না। এখানে অবাবিহত ছেলে দরকার। যেন সময় দিতে পারে। নারী ও পুরুষ চরিত্রগুলো একসাথে করতে হয়। এজন কম বয়স হলে ভালো। অনেকে আসে বিবাহিত, গান করবে। সে সংসার করবে নাকি গান করবে। তা ছাড়া এখন পেশা হিসেবেও্ এটা দুর্বল হয়ে গেছে। আগে যাত্রাপালার  অনেক চাহিদা ছিল। এখন আর তেমন নেই। আমি নিজেও গানের পাশাপাশি ব্যবসা করি। 

একটু ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাই। আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্ত্রী-সন্তান সম্পর্কে জানতে চাই 

আমার বাবার নাম রবিউল্লাহ ও মা আমেনা। আমরা চার ভাই ও এক বোন। আমি সবার ছোট। দুই মেয়ে ও এক ছেলে আমার। সবাইকে নিয়ে গ্রামেই আনন্দে দিন কাটাই, গান করি।

খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছেন আপনি। সেখান থেকে আপনার এই পালাকার হওয়ার গল্পটা শুনতে চাই

এই গল্প অনেক দীর্ঘ। ছোট করে বলি, ছেলেবেলায় গ্রামীণ নাট্যপালার অভিনয়ে যুক্ত হই। প্রথম পর্যায়ে ‘কাশেমমালা’ ও ‘দস্যু বাহরাম’ নামের দুটি ঝুমুর যাত্রাপালায় অভিনয় করেছি। ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে ‘ইসলাম উদ্দিন কিচ্ছাকার ও তার দল’ নামে একটি পালাগানের দল বানাই। তারপর থেকেই পালাকারের জীবন শুরু। আজকের এই এত এত মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে আছি। যতদিন বাঁচি সবার মন জয় করে যেতে চাই।

গান-বাজনা করতে গিয়ে পরিবার বা সমাজ থেকে বাধা পাননি কখনও?

পেয়েছি। প্রথম প্রথম বাড়ি থেকে না করত। আমার ভাইয়েরা ধরে নিয়ে আসত গানের আসর থেকে। যখন ছোট বয়সে যাত্রায় অভিনয় করে ফেললাম তখন আর বাধা দিল না। আমি যখন ছয় মাসের জন্য গুরুর কাছে চলে গেলাম, তখন তারা সব জানতে পেরে আর খোঁজাখুঁজি করল না। আর গ্রাম বা সমাজের লোকেরাও ঝামেলা করেনি। আগে এসব গানের চাহিদা ছিল। লোকে সময় কাটাত গান-বাজনা করে। এখন বরং অনেকে ঝামেলা করে। নানা কথাবার্তা বলে। তবে এসব কানে নিলে তো আর চলে না। জীবনে কিছু করতে হলে নিজের মনকে গুরুত্ব দিতে হবে। টার্গেট ঠিক রাখতে হবে। তাহলে সাফল্য দেরিতে হলেও আসে।

এ প্রজন্মে যারা মাটি ও মানুষের গান করে তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

একটাই কথা আমাদের অনেক পুরোনো গান আছে, সেগুলো বেশি বেশি করে গাইতে হবে। সেগুলোকে নতুন করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের যাত্রাপালা, জারি-সারি, ভাটিয়ালি ও লোক গানের ভান্ডার অনেক বড়। সেগুলো তুলে ধরতে পারলে অর্থমূল্য এবং গর্বের জায়গায় অনেক প্রাপ্তি বয়ে আনবে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা