প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৩ ১৪:১৬ পিএম
বাংলাদেশের সিনেমাশিল্পকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন নায়ক ফারুক তাদের একজন। সুজন সখী, গোলাপী এখন ট্রেনে, সারেং বউ, লাঠিয়াল, নয়নমণি, মিয়া ভাই, আলোর মিছিলÑ অসংখ্য আলোচিত সিনেমার নায়ক ফারুক। তার নায়কজীবনে এ দেশের শীর্ষ সব নায়িকা অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং আজীবন সম্মাননা। অভিনেতা ছাড়া একজন সংসদ সদস্যও তিনি।
কবরী
সদ্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সে সময়ে চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক প্রথমবার সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হন। সিনেমার নাম ‘জলছবি’। এইচ আকবর পরিচালিত এ সিনেমায় তার নায়িকা ছিলেন কবরী। এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭২ সালে। নায়ক ফারুক প্রথম ছবির গল্প জানাতে গিয়ে কবরীর সঙ্গে স্মৃতিচারণ করে বেশকিছু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “কবরী তখন সুপারস্টার। তার মতো নায়িকার সঙ্গে জুটি বেঁধে সিনেমা শুরু করতে পারাটা আমার জন্য আনন্দের। তবে ব্যাপারটি অতটা সহজ ছিল না। আমি খানিকটা ডানপিটে ছিলাম। আমি মারামারি করি এমনটাও প্রচার ছিল। যখন ‘জলছবি’ সিনেমার প্রযোজক আমাকে তার ছবির নায়ক করলেন, কবরী তখন কারও মাধ্যমে জানতে পারলেন যে আমি গুন্ডা কিসিমের। সে শুনেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে ছবি করবে না বলে আপত্তি তুলেছিল। তবে পরে তাকে বোঝানো হলে তিনি রাজি হন। অভিনয় করতে এসে আমার সম্পর্কে তার ভুল ধারণাটি ভেঙে গিয়েছিল।”
সেই শুরু। এরপর ফারুক-কবরীকে দেখা গেছে বেশকিছু জনপ্রিয় সিনেমাতে। ‘সারেং বউ’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘আরশিনগর’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সুজন সখী’ ইত্যাদি। এর মধ্যে আব্দুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘সারেং বউ’ সিনেমাটি ফারুক-কবরী জুটিকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। আর খান আতার চিত্রনাট্যে প্রমোদ করের ‘সুজন সখী’ সিনেমাটি এ জুটিকে সেরা পাঁচটি রোমান্টিক জুটি হিসেবে ঢালিউডের ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছে। এই সিনেমাটি পরে রিমেক করা হয়। সেখানে জুটি বেঁধে সফল হয়েছিলেন সালমান শাহ ও শাবনূর।
ববিতা
চিত্রনায়ক ফারুক জুটিপ্রথায় বিশ্বাসী নন বলে দাবি করেন। তার মতে, বহু নায়িকার সঙ্গেই তিনি জুটি বেঁধে সফল হয়েছেন। জুটিপ্রথা বলতে যা বোঝায় তেমনটি তিনি অনুসরণ করেননি। তবে ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি সিনেমা তিনি করেছেন ববিতার সঙ্গে। তাই নিজের সফল বা প্রিয় নায়িকা হিসেবে ববিতাকেই এগিয়ে রাখেন তিনি। তাস ছাড়া ঢালিউডে জনপ্রিয় ও সফল দশটি জুটির একটি বলে মনে করা হয় ফারুক-ববিতা জুটিকে। ১৯৭৩ সালে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমা দিয়ে প্রথমবারের মতো জুটি হন তারা। এরপর ‘আলোর মিছিল’, ‘কথা দিলাম’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘ গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমণি’, ‘মিয়া ভাই’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ইত্যাদিসহ ৩৩টি ছবিতে অভিনয় করেন তারা। তার মধ্যে কালজয়ী হয়ে আছে ‘আলোর মিছিল’, ‘ গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিগুলো। আর ‘নয়নমণি’ সিনেমার মিষ্টি রসায়নে ফারুক-ববিতা আজও দর্শকের মনে নিটোল প্রেমের প্রতীক হয়ে আছেন।
ফারুক-ববিতা সর্বশেষ জুটিকে দেখা গিয়েছিল ২০০৮ সালে, ‘ঘরের লক্ষ্মী’ নামের সিনেমায়। দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কটাও খুব জমজমাট এই দুই তারকার। নানা উপলক্ষেই একজন আরেকজনের বাসায় নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন, আড্ডায় মেতে ওঠেন। চোখ ভেজান সোনালি অতীতের রোমান্স-রোমাঞ্চকর দিনগুলোর স্মৃতিচারণে।
শাবানা
কবরী ও ববিতার সমসাময়িক আরও ক’জন নায়িকার সঙ্গে ফারুক জুটি বেঁধেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম শাবানা। ‘ মেহমান’, ‘লাল কাজল’, ‘সখী তুমি কার’, ‘ভাই ভাই’র মতো কিছু ছবিতে তারা জুটি হয়েছেন। তবে দর্শক কোনো এক কারণে এই জুটিকে গ্রহণ করেননি। নায়ক ফারুকের বক্তব্য, ‘অনেক পরিচালকই আগ্রহ নিয়ে শাবানাকে আমার বিপরীতে কাজ করিয়েছেন। আমরা বেশ ভালো গল্প নিয়েই কাজ করেছিলাম। দুজনের অভিনয়ও ভালো ছিল। কিন্তু শাবানার সঙ্গে কেন জানি না আমার রসায়নটা ঠিক জমত না। দর্শকও খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। তবে শাবানার অভিনয় ও তার ব্যক্তিত্ব চমৎকার। তার সঙ্গে কাজ করে আমি আনন্দিত ছিলাম।’
রোজিনা
ফারুক সফল হয়েছেন রোজিনার সঙ্গেও। বেশকিছু চলচ্চিত্রেই এই জুটির সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। তার মধ্যে ‘সাহেব’, ‘সিকান্দার’, ‘শেষ পরিচয়’, ‘যন্তর মন্তর’, ‘অন্ধ বধূ’, ‘বন্ধু আমার’, ‘দুঃখিনী মা’, ‘হাসু আমার হাসু’, ‘মান অভিমান’, ‘ভুল বিচার’, ‘সুখের সংসার’, ‘দাঙ্গা ফ্যাসাদ’ ইত্যাদি ছবি উল্লেখযোগ্য। নায়ক ফারুক মনে করেন, তার ক্যারিয়ারে গতানুগতিক জুটি বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু সত্যি হয়ে থাকলে সেটি ছিল রোজিনার সঙ্গে। খুব সহজেই দুজনে মিশে যেতে পারতেন চরিত্রের সঙ্গে। জমে উঠত অনস্ক্রিন রসায়নও।
সুচরিতা
চিত্রনায়িকা সুচরিতার সঙ্গেও অনেকগুলো সিনেমায় নায়ক হয়েছেন ফারুক। সেই সব সিনেমা পেয়েছে ব্যবসায়িক সাফল্য ও জনপ্রিয়তাও। উল্লেখ করা যায় ‘লাখে একটা’, ‘নাগর দোলা’, ‘ কোটি টাকার কাবিন’, ‘ছক্কা পাঞ্জা’ ইত্যাদি ছবির নাম।
সুনেত্রা
বলা হয়ে থাকে গ্রামীণ চরিত্রে নায়ক ফারুক ছিলেন অনবদ্য। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের ছবির জন্য পরিচালকদের সেরা পছন্দের ছিলেন তিনি। সেই ধাঁচের কিছু ছবিতে সুনেত্রার বিপরীতে নায়ক হয়েছেন ফারুক। দুই তারকার মধ্যে বয়সের গ্যাপ থাকলেও জমজমাট পর্দার রসায়ন জনপ্রিয় করে তুলেছিল ফারুক-সুনেত্রা জুটির ‘শিমুল পারুল’, ‘পালকী’ ছবিগুলোকে।
সমসাময়িক প্রায় সব নায়িকার সঙ্গে জুটি হয়েছেন ফারুক। তাদের মধ্যে নাচের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত চিত্রনায়িকা অঞ্জনার বিপরীতেও কাজ করেছেন তিনি ‘ ছোট মা’ নামের ছবিতে। তাকে তার চেয়ে বয়সে ছোট অঞ্জু ঘোষের নায়ক হিসেবে দেখা গেছে ‘শক্তিশালী’, ‘যাদুমহল’ নামের ছবিতে। ফারুক তার ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি ‘ঝিনুক মালা’য় নায়িকা হিসেবে পেয়েছিলেন নিপা মোনালিসাকে। চিত্রনায়িকা জুলিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন ‘ দোস্তী’ সিনেমায়।