লিমন আহমেদ
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৩ ১৩:২৫ পিএম
আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৩ ১৩:২৬ পিএম
কলকাতায় নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে নতুন করে জড়িয়েছে অয়ন শীল আর শ্বেতা চক্রবর্তীর নাম। দুজনই জড়িত টলিউডের গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সিনেমা ‘কাবাডি কাবাডি’তে টাকা ঢেলেছিলেন প্রোমোটার অয়ন। সিনেমার সেটেও নাকি গিয়েছিলেন দু-একবার। সিনেমার প্রযোজকের দিকে আঙুল তোলায় শোরগোল চলছে টলিউডে।
কলকাতার সিনেমায় দুর্নীতির সম্পৃক্ততা বা দুর্গন্ধ দুটোই বাড়ছে ক্রমে। সিনেমার সঙ্গে গডফাদার বা কালো টাকার যোগসূত্র অনেক প্রাচীন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের সাফল্যের সঙ্গেই কালো টাকা লেগে আছে। কলকাতার সিনেমাও তার ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি যেন দুর্নীতিগ্রস্ত আর নানা কিসিমের ‘দাদা-দিদি’দের টাকাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে কলকাতার সিনেমা। তাই ফেসবুকে এ নিয়ে সমালোচনা ভরপুর। যেকোনো শিল্পীর পোস্টে গিয়েই পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা লিখে দিচ্ছেন ‘দুর্নীতির টাকার সিনেমার আর্টিস্ট। কালো টাকায় মাইনে নিচ্ছেন, গাড়ি-বাড়ি করছেন। যাদের টাকায় এত কিছু, এত খ্যাতি, তাদের শাস্তি হচ্ছে। আপনাদেরও হবে।’
যৌক্তিকভাবে সিনেমার শিল্পী-কুশলীরা অর্থের জোগানের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারা জানেন না কোথা থেকে প্রযোজক টাকা আনেন। জানার কথাও না। তবে যে অবস্থা এখন দৃশ্যমান, তাতে করে কোনো সিনেমায় কাজ করার আগে সেই সিনেমার অর্থের জোগান সম্পর্কে খোঁজ করাটাও দায়িত্ব হয়ে যাবে। সেই দায় এড়ানোর সুযোগ মিলবে না। যেমন সুযোগ পাচ্ছেন না ঋত্বিক চক্রবর্তীও।
বিতর্কিত অয়ন শীল প্রযোজিত ‘কাবাডি কাবাডি’ সিনেমার অভিনেতা হিসেবে সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন অভিনেতা ঋত্বিক। তিনি সেখানে বলেন, পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েই ছবির কাজে গিয়েছিলেন। প্রযোজকের সঙ্গে কোনো আলাপই ছিল না। সেটে দু-একবার দেখেছেন। কিন্তু সেভাবে কোনো কথাও হয়নি।
অভিনেতার কথায়, ‘ব্যবহার ঠিক ছিল। আমি অভিনয় করি। কোথা থেকে টাকা এলো, সেটা তো দেখতে পারি না। আমি গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয় করি মাত্র। গোয়েন্দা নই। কে কী ব্যবসা করে, তা নিয়ে মাথা ঘামাই নাকি। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা সিনেমা, তা করতে গিয়েছি। প্রযোজক প্রোমোটারি করে, না অন্য কিছু বিক্রি করে, তা জানি না। আর ব্যবহার দিয়ে এসব কিছুই বোঝা যায় না।’
তার দায়হীন বক্তব্যে বিরক্ত হয়েছেন সাধারণত জনতা। সেটা তারা জানান দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই সঙ্গে তাদের দাবি, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তারকারা রাজনীতিমুখী হয়েছেন অনেক বেশি। ক্ষমতার প্রয়োগ ও দাপট দুটিই বেড়েছে সিনেমায়। অবাধে ঢুকে যাচ্ছে নানা রকম অপরাধ, দুর্নীতি। এতে করে সিনেমায় কলঙ্ক লেগেছে। দুর্নীতির দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
কলকাতার প্রেক্ষাপটে এসব কোনো ঘটনাই নয়। একটা সময় দেখা যাবে, অয়ন শীল সব কিছু থেকে রেহাই পেয়েছেন। আগের চেয়ে আরও ঘটা করে চলবে তার প্রোমোটারি। চলবে সিনেমার ব্যবসাও। যেমন চলছে এসভিএফের। অনেকে তো বলেন, কলকাতার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজক শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের (এসভিএফ) কর্ণধার শ্রীকান্ত মেহতাকে গ্রেপ্তার করার পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বেড়েছে। রোজভ্যালির চিট ফান্ড দুর্নীতিকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) তাকে ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার করেছিল। মেহতার বিরুদ্ধে ৩০ কোটি রুপি প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। তিনি ২০২১ সালে জামিনে মুক্ত হন। রোজভ্যালি ও সারদার কর্ণধারের ওপর প্রভাব খাটিয়ে মেহতা সিনেমা তৈরির নামে বহু অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক অবৈধ অর্থ নিয়ে নয়ছয় করার পাশাপাশি অভিনেত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও অনেক সমালোচিত এই মেহতা।
এ ছাড়াও কলকাতার সিনেমায় দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঘটনায় সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন মিঠুন চক্রবর্তী, শতাব্দী রায়, তাপস পালদের মতো তারকারা। রাজনীতির ছায়ায় তারা নানা সুবিধা অনৈতিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নানা সুবিধা ভোগ করার তালিকায় দেব, সোহম, সায়নী ঘোষ, নুসরাত জাহান, মিমি চক্রবর্তীদেরও নাম আছে। এসব নিয়ে আরেক অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি ও ইশারা-ইঙ্গিতে বেশ সরব।
সর্বশেষ কলকাতার সিনেমায় দুর্নীতির দুর্গন্ধ ছড়িয়েছেন অভিনেতা বনি সেনগুপ্ত। নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযোগ ওঠায় কলকাতার অভিনেতা বনি সেনগুপ্তকে তলব করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তৃণমূল নেতা কুন্তল ঘোষের সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগে তাকে তলব করা হয়েছে। এদিকে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িত রয়েছেন এক অভিনেত্রী, এমন অভিযোগও উঠছে। কে সেই অভিনেত্রী, তার নাম প্রকাশ্যে আসেনি। তবে অনেকেই মনে করছেন, এই অভিনেত্রী হলেন সায়নী ঘোষ। রাজ্যের প্রধান ‘দিদি’র সঙ্গে সুসম্পর্কের প্রভাবে বেশ ফুলেফেঁপে উঠছেন সায়নী। অভিনয়ে তাকে দেখা না গেলেও নানা উপায়েই হচ্ছে অর্থ আয়। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েও অনেক টাকা কামাই করেছেন তিনি। এখন দেখার পালা, নিজের নামের সঙ্গে লেগে থাকা দুর্নীতির দুর্গন্ধ মুছতে পারেন কি না সায়নী। বনির দিকেও তাকিয়ে কলকাতার সিনেমা। তারা নিজেদের শুদ্ধ প্রমাণ করতে পারলে কিছুটা হলেও যে মান বাঁচে সত্যজিত-উত্তম কুমারদের প্রিয় কর্মস্থল।
সম্প্রতি কয়লা পাচারকাণ্ডের সঙ্গেও টলিউডের যোগসূত্র রয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি। তদন্তকারীদের নজরে ইতোমধ্যেই দক্ষিণ কলকাতার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ইডি সূত্রে খবর, সম্প্রতি বালিগঞ্জ এলাকা থেকে কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনায় মনজিৎ সিং গ্রেওয়ালকে গ্রেপ্তারের পরই তদন্তকারীরা জানতে পারে তার সঙ্গে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লেনদেন হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যোগসূত্রকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জানা যায়, কয়লা পাচারকাণ্ডের কালো টাকা সাদা করতে নিশানা করা হয়েছে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে। এই সংস্থার সঙ্গে টলিউডের যোগাযোগ রয়েছে বলেও খবর। এমনকি দুর্নীতির টাকা ব্যবহার করে কয়েকটি বাংলা সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এই গোটা বিষয়টি এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ। হয়তো অনেকের নাম ও ঘটনা বেরিয়ে আসবে, যা কলকাতার সিনেমাকে আরও সমালোচনার মুখে ছুড়ে মারবে।