বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২২ ১৯:৩১ পিএম
আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২২ ২০:৪১ পিএম
পারিবারিক নাম ইলিয়াস। তবে এদেশের দর্শকের কাছে তিনি অভিনেতা জাভেদ নামেই পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি রয়েছেন আড়ালে। কোনো অনুষ্ঠানে তার দেখা মেলে না। আসেননি সর্বশেষ শিল্পী সমিতির নির্বাচনেও। বারবার খোঁজ নিতে গেলে মুঠোফোনে অল্পবিস্তর কথা বললেও সাক্ষাতের প্রশ্ন উঠলে গণমাধ্যমকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন। অবশেষে তিনি দেখা দিলেন। কথাও বললেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। জানালেন তার জানা-অজানা অনেক গল্প। লিখেছেন লিমন আহমেদ
এককালে তার সিনেমা মুক্তি পেলে ওই সপ্তাহে আর কোনো প্রযোজক সিনেমা মুক্তি দেওয়ার সাহস করতেন না। তার সিনেমা দেখতে ঢল নামত মানুষের। নানা রঙের পোশাকে রঙিন নায়কের দিন কাটত শত শত মানুষের সঙ্গে আড্ডা-উল্লাসে। সেই নায়ক জাভেদ বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছা নির্বাসনের এক জীবন। কেন? মূলত সেই কৌতূহল মনে নিয়েই জাভেদের সঙ্গে যোগাযোগ। তিনি অসুস্থ। বয়সজনিত ছোট-বড় নানা অসুখের সঙ্গে মোকাবিলা করে টিকে আছেন। তাই তার হয়ে যোগাযোগটা করেন স্ত্রী ডলি জাভেদই। অনুরোধ ও অনুনয়ে মন গলল দম্পতির। দিলেন কিছু সময়ের অনুমতি। ঠিকানা নিয়ে ছুটলাম একসময়ের সিনেমার পর্দা কাঁপানো নায়ক, নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদের দেখা পেতে। উত্তরা নিবাসী জাভেদ থাকেন নিজের বাড়িতেই। বিশাল বাড়িতে তার একমাত্র সঙ্গী স্ত্রী অভিনেত্রী ডলি ও বেশ কয়েকটি রোগের ওষুধ। ১৯৮৪ সালে জাভেদকে বিয়ে করে যিনি নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে গৃহবধূ বনে গেছেন। দুজনে মিলে একরকম নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছেন আজকাল। ঠিকানা খুঁজে যে বাড়িটি পাওয়া গেল তার চারদিকে বিষণ্নতা। যখন খটকা লাগছিল এটাই নায়ক জাভেদের বাড়ি কি না তখনই খুলল গেট, নিশ্চিত হওয়া গেল এটাই সেই বাড়ি।
নায়কের স্ত্রী স্বাগত জানালেন। তার সঙ্গে ভেতরে ঢুকে দোতলায় উঠে দরজা খুলেই দেখা মিলল সেই মানুষটির, যার সন্ধানে এত যানজট জয় করে ছুটে আসা। বয়স যে চেহারা ও শরীরে ছাপ ফেলেছে সেটা স্পষ্ট। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙ, সাদা চুল দাড়িতে ছাইরঙা ফতুয়ায় কালো রঙের নেপালি টুপি পরে বসে আছেন তিনি। প্রথম দেখেই চোখ মোহিত হয়। বয়সেরও যে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য আছে, আকর্ষণ আছে সেটা বোঝা গেল। চোখে চোখ পড়তেই মুচকি হাসলেন। রাজ্য হারানো আত্মবিশ্বাসী এক রাজার মতো সেই হাসি। যেখানে ইঙ্গিত, আবারও কোনো একদিন রাজ্য ফিরে পাবেন তিনি। বসে থেকেই হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন।
কুশল সেরে শুরু হলো আলোচনা। আগেই বলে নিলেন, খুব বেশি কথা তিনি বলবেন না। কোনো বিতর্কিত আলোচনাও হবে না। যার দেখা পেতে এতদূর আসা, যার কিছু কথা শুনতে এতদিনের অপেক্ষা, তার এসব শর্ত মেনেই নিতে হয়। জাভেদ সাহেবের কথা বলতে কষ্ট হয়। তার হয়ে বেশিরভাগ কথা স্ত্রীই বললেন। প্রথমেই পারিবারিক পরিচিতি পাওয়া গেল নায়ক জাভেদের। ১৯৫০ সালে আফগানিস্তানের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা চৌধুরী মোহাম্মদ আফজাল ও মা আনোয়ারা বেগম। মা পাঞ্জাবি, তাই সবাই এই নামটা আনোয়ার বলে ডাকে। আফগানিস্তান থেকে একটা সময় পাঞ্জাবে চলে আসে জাভেদের পরিবার। আর জাভেদ সিনেমার নায়ক হবেন এই স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) চলে আসেন। সাধু মহারাজ নামে এক নাচের গুরুর সান্নিধ্য পান তিনি। তার হাত ধরেই ঢাকায় আসেন। ওঠেন এক বোনের বাসায়। তখন থাকতেন পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারে। সেই মহল্লার নাম এখন জাভেদ গলি। দেখতে ছিলেন রাজপুত্রের মতো। যে-ই দেখত সে-ই আদর করত, ছেলে বানিয়ে ফেলত। তেমনি একজন ছিলেন উত্তরার সুলতান চেয়ারম্যান। তিনিই প্রযোজক হয়ে ১৯৬৩ সালে ‘নায়ি জিন্দেগি’ নামের একটি সিনেমায় নায়ক করেন। সেখানে তার নায়িকা হন নাসিমা খান। ছবিটি মুক্তি পায়নি।
তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘পায়েল’। সেখানে রাজ্জাক ও শাবানার সঙ্গে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন জাভেদ। প্রথম ছবিই হিট। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
নায়ক হয়ে তারকা খ্যাতি নিয়ে এদেশেই থেকে যাওয়া। হাজার হাজার মাইল দূরে পড়ে রইল পরিবার, বাবা-মা ও স্বজনেরা। জাভেদ জানান, তারা ৭ ভাই ও ২ বোন। তিনি সবার বড়। বাবা তাই চাইতেন ছেলে ব্যবসা করুক। সংসারের হাল ধরুক। কিন্তু জাভেদ চাইতেন নায়ক হবেন। হয়েছেন। বলতে বলতে আবেগে আপ্লুত হয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন কথায়। খানিক বিশ্রাম নিয়ে বলেন, ‘বাবা-মা, ভাইবোনদের মনে পড়ত। কিন্তু নায়ক হওয়ার নেশা, এই দেশ ও দেশের মানুষ আমাকে এত আকৃষ্ট করেছিল যে ফিরে যেতে ইচ্ছে করত না। আমার কোনো আফসোসও ছিল না এ নিয়ে। আজও নেই।’
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয় কি না জানতে চাইলে বলেন, ভাইয়েরা ফোনে যোগাযোগ করে। কিছুদিন আগে এসে দেখে গেছে দুই ভাইয়ের দুই ছেলে। মায়ের কথা মনে পড়ে। দেখা হয়েছিল অনেক আগে। একটা যৌথ প্রযোজনার ছবি করতে পাকিস্তান গিয়েছিলেন। একফাঁকে মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন।
এদেশে এসে তিনি স্বপ্নপূরণ করেছেন। হয়েছেন সিনেমার রাজকুমার। কেউ ডাকেন নাচকুমার বলে। অনেকে বলেন- জাভেদ বাংলার দীলিপ কুমার। এই নামের গল্প জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খুবই জনপ্রিয় নেতা, ব্যক্তিত্ব। তাঁর নানা ভাষণ শুনতাম নির্যাতিত মানুষের পক্ষে। মুগ্ধ হতাম। খুব ইচ্ছে করত একবার দেখা করতে যাব। সেই ইচ্ছেটা পূরণ হলো আমার এক ভাগ্নের হাত ধরে। সেই ভাগ্নে ছিল কমলাপুরের এক বোনের ছেলে। তাদের জায়গাতেই এখন রেলওয়ে স্টেশন। সেই ভাগ্নে একদিন নিয়ে গেলেন শেখ সাহেবের বাসায়। সেখানে কত মানুষ! দেখা হলো। দোয়া চাইতে গেলাম। বললাম, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন স্যার, ইন্ডিয়া যাচ্ছি নাচের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে।’ আমার কথা শুনেই তিনি বললেন, ‘তুই তো বাংলার দীলিপ কুমার। তুই ইন্ডিয়া গেলে তো ওরা তোকে আসতে দেবে না। তুই কিন্তু থাকবি না। নাচ শিখে চলে আসবি।’ আমি উনার মুখে এই কথা শুনে খুব লজ্জা পেলাম। বঙ্গবন্ধু ওই নামে ডাকার পর সেটা ছড়িয়ে গেল ইন্ডাস্ট্রিতে।’
দুর্দান্ত সফল ও হিট নায়ক ছিলেন। বর্ণিল একটা ক্যারিয়ার। সবকিছু ছেড়ে এভাবে আড়ালে চলে কেন? জাভেদ বলেন, ‘কিছু ব্যক্তিগত বিষয় আছে। সেসব আমি প্রকাশ করতে চাই না। লোকে আমাকে যেভাবে জানে আমি সেই ইমেজ নষ্ট করতে চাই না। আমার শিল্পী সত্তাটাই তাদের কাছে থাক। আমার যা কিছু ব্যক্তিগত সেটা একান্তই আমার। আমি এসব সবার সামনে আনতে চাই না। যেদিন আমি থাকব না সেদিন না হয় জানবে সবাই।’
মিস করেন না সিনেমার মানুষ, পরিবেশ ও হইচই? ‘সয়ে গেছে। আর সিনেমারও সেদিন আর নেই।’
কারও ওপর কোনো অভিমান কি আছে, এ প্রশ্নের উত্তরে অভিনেতা জানান, অভিমান গোপন বিষয়। প্রকাশ করলে আর অভিমান থাকে না। তিনি তার ৪০ বছরের সঙ্গী স্ত্রীকে নিয়ে জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে যেতে চান যে কয়দিন সুযোগ পান। এক মেয়ে আছে, নাম লুনা। নাতি-নাতনিদের নিয়ে তিনি থাকেন আমেরিকায়। মেয়ের সঙ্গে কথা হয়।
নায়ক বা তারকা জাভেদের ইমেজে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে অসুস্থ অবস্থায় মেকআপ ছাড়া ছবিও তুলতে চাইলেন না। আলোচনা শেষে স্ত্রীর হাত ধরে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন। ছবি ও ভিডিও দিতে পারলেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বুকে জড়িয়ে ‘ভালো থাকো বেটা’ বলে বিদায় দিলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামার মুহূর্তে পেছন ফিরে ডেকে বললেন, ‘দোয়া করো যেন সুস্থ হই। সুস্থ হলে তোমাকে ছবি তুলতে ডাকব।’
মুচকি হেসে বেরিয়ে এলাম। জানি না, চোখগুলো কেন বারবার ভিজে যাচ্ছিল। সময়ের কাছে মানুষ বড় অসহায়। হইচই করে যে মানুষের দিন কেটেছে তার চারপাশে এখন নির্জনতা। অন্তত আরও একটা মুখরিত দিন নায়ককে উপহার দিতে হলেও দোয়া করি তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। রঙিন সাজ-মেকআপে আয়োজন করে তার ছবি তুলতে আসব, তার ভিডিও করতে আসব।
প্রবা/এলএ/জেআই