বাংলাদেশে হিন্দি সিনেমা
মহিউদ্দিন মাহি
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:৩৫ পিএম
বিশ্বের ১০০টি দেশের হাজার হাজার হলে আজ মুক্তি পাচ্ছে বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের সিনেমা ‘পাঠান’। এই ছবি দিয়ে দীর্ঘ চার বছরের বিরতি কাটিয়ে পর্দায় ফিরছেন হিন্দি সিনেমার এই সুপারস্টার। তার ছবিটি ঘিরে শুরু হয়েছে উন্মাদনা। এরই মধ্যে অগ্রিম টিকিট বিক্রির ধুম লেগেছে। বলিউড বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ‘পাঠান’ মুক্তির প্রথম দিনেই ৫০ কোটি রুপি আয় করবে। এই ছবি নিয়ে বাংলাদেশেও শোরগোল কম নয়।
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক অনন্য মামুনের প্রযোজনা সংস্থা অ্যাকশন কার্ট এন্টারটেইনমেন্ট থেকে ‘পাঠান’ সিনেমাটি বাংলাদেশে আমদানির কার্যক্রমও চলছে। প্রযোজনা সংস্থাটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে ছবিটি আমদানির অনুমতি চেয়ে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সেই চিঠি পেয়েছে বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। গতকাল বেলা ৩টায় ‘পাঠান’মুক্তির বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। অনন্য মামুন জানিয়েছেন, গতকালের বৈঠকে সিনেমাটি বাংলাদেশে মুক্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নিয়মনীতি মেনে যদি ‘পাঠান’ নিয়ে আসা যায় তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আজকালের মধ্যেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। ‘পাঠান’ সিনেমা বাংলাদেশে মুক্তির অনুমতি মিললে সাফটা চুক্তির নীতিমালা অনুসারে ভারতে মুক্তির দুই দিন পর বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা হবে।
এদিকে বাংলাদেশে ‘পাঠান’- এর মুক্তি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। কেউ ভাবছেন ‘পাঠান’ ছবি মুক্তির মধ্য দিয়ে ঢালিউডে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে। হিন্দি সিনেমার সঙ্গে নিয়মিত প্রতিযোগিতায় বাড়বে ঢালিউডের গতি। ভালো সিনেমা নির্মাণে মনোযোগী হবেন প্রযোজক ও পরিচালকরা।
অনেকে আবার মনে করছেন, এদেশে হিন্দি সিনেমার মুক্তি বিপর্যয় ডেকে আনবে। বড় বাজেটের ভারতীয় ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ম্লান হয়ে যাবে দেশীয় নির্মাণ। পাশাপাশি বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে হুমকির মুখে পড়বে দেশীয় সংস্কৃতি। অনেকে ২০১৫ সালের আলোচিত আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। সে বছর হিন্দি সিনেমা তথা ভারতীয় সিনেমা আমদানি ঠেকাতে মাঠে নেমেছিলেন ঢালিউডের প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা। শাকিব খান, পরীমনি, রুবেল, ওমর সানিরা কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় নেমেছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধনও করেছিলেন তারা। সেই আন্দোলনের মুখে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েও থেমে গিয়েছিল হিন্দি সিনেমার মুক্তি।
২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে ভারতীয় ১২টি চলচ্চিত্র আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে হিন্দি ৯টি ও বাংলা চলচ্চিত্র ছিল তিনটি। তবে হিন্দি কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি না পেলেও ২০১১ সালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হলে দেখানো হয়েছিল ভারতীয় বাংলা ছবি ‘জোর’, ‘বদলা ও ‘সংগ্রাম’। তখন থেকেই চলচ্চিত্র অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। পরবর্তীতে সাফটা চুক্তিতে বেশ কিছু ভারতীয় বাংলা ছবি আমদানি করা হয়েছে। তবে হিন্দি বা অন্য ভাষার ছবি মুক্তি পায়নি। সম্প্রতি ‘পাঠান’- এর মুক্তি নিয়ে নতুন করে আবারও ঢালিউডে ফিরে এলো পুরোনো প্রসঙ্গটি।
চিত্রনায়ক রিয়াজ
ভারতীয় সিনেমা মুক্তি নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে কোনো অসুবিধা নেই। আমি চাই হলে দর্শক ফিরে আসুক। আমাদের হলগুলো দর্শকের অভাবে দিনদিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বছরজুড়ে হল মালিকদের ব্যবসা করার মতো ১০/১২টি সিনেমাও এখন আর আমরা মুক্তি দিতে পারছি না। বছরে দু-তিনটি হিট সিনেমা উপহার দিয়ে দর্শক ধরে রাখা যায় না। তাই মাথায় রাখতে হবে হলে দর্শক ফেরানো জরুরি। হল মালিকদের বাঁচাতে না পারলে সিনেমা বাঁচবে না। মিনিমাম বছরে ১২টি দর্শকপ্রিয় সিনেমা উপহার দিতে হবে। আর বাজার চাঙ্গা করতে দেশের প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি সিনেমা মুক্তি পেলে আমি তার বিপক্ষে যাব না। তবে আমি বলব যেসব সিনেমা মুক্তি পাবে সেগুলোর মানের দিকে যেন নজর দেওয়া হয়।
প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু
আমি ‘পাঠান’- এর মুক্তিকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছি। হিন্দি ভাষায় নির্মিত সিনেমার বড় একটি মার্কেট কিন্তু বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই তৈরি। নানা উপায়ে এখানকার দর্শক ভারতীয় সিনেমা উপভোগ করে। আমাদের ড্রয়িংরুম দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সিনেমার দখলে রয়েছে। টেলিভিশন খুললেই হিন্দি সিনেমা দেখতে বসে যায় দেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শক। তাহলে দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে হিন্দি সিনেমা মুক্তি দিতে সমস্যা কী? আমি কোনো ক্ষতি দেখি না। বরং আমাদের হলগুলোর জন্য আরও ভালো হবে। আমারা চাই আমাদের হলগুলো আগের সময়ে ফিরে আসুক। হলের গেটে দর্শকদের ভিড় জমুক। তার জন্য হিন্দি সিনেমা আসুক অথবা অন্য ভাষার সিনেমা আসুক। মূল উদ্দেশ্য হলো হলে দর্শক ফিরিয়ে আনা। হিন্দি সিনেমা দেখতে যদি দর্শক হলে যায়, তাহলে বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলোও খুলে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পুরোটা তাদের দখলে যেতে দেওয়া যাবে না। একটা নিয়মনীতি রাখতে হবে।
পরিচালক সমিতির মহাসচিব, শাহীন সুমন
দেশে হিন্দি সিনেমা মুক্তির বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তাই আমি এ বিষয়ে কিছু বলব না। যখন সিদ্ধান্ত আসে তখন দেখা যাবে। এ বিষয়ে আমাদেরও কিছু মতামত রয়েছে, কিছু দাবি রয়েছে। সেসব বিষয়ে একটা ফয়সালা আসলে তখনই বলতে পারব ‘পাঠান’সিনেমার মুক্তি আমাদের জন্য লাভ না ক্ষতির। তবে আমার বিশ্বাস, এমনটা হবে না। বিদেশি সিনেমা এদেশে আসবে না।
নির্মাতা অমিতাভ রেজা
সিনেমার কোনো নির্দিষ্ট দেশ নেই। নির্মাতা একটি সিনেমা নির্মাণ করেন গোটা পৃথিবীর জন্য। সেক্ষেত্রে ভারতীয় সিনেমা হোক কিংবা অন্য কোনো দেশের সিনেমা হোক, আমার কাছে এই বিষয়টি তেমন কোনো জটিল বিষয় নয়। তবে একটা বিষয় আছে, সেটি হলো আমাদের দর্শকদের মধ্যে বড় একটি অংশ আগে থেকেই ভারতীয় সিনেমার প্রতি আলাদা ভালোবাসা দেখিয়ে এসেছে। দর্শক চাহিদা আছে বলেই হল মালিকরা হিন্দি সিনেমা আমদানি করে চালাতে চান। বাণিজ্যের এই বিষয়টা আজকের মুক্ত বাজারে অস্বীকার করা যায় না। আমাদের হল বাঁচাতে যদি হিন্দি সিনেমার আমদানি ইতিবাচক হয় তবে আমি বলব কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। সেটি হলো, ভারতের সিনেমা যদি আমাদের দেশে মুক্তি দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে ভারতেও আমাদের সিনেমা মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে একটি স্পষ্ট চুক্তি থাকতে হবে। আমাদের সিনেমাগুলো যেন তাদের দেশে নিয়মিত মুক্তি পায় সেই বিষয়টি ভাবতে হবে। ব্যবসাটা যেন ভারসাম্য বজায় রেখে হয়। তাহলে আমাদের সিনেমার জন্যও ভালো প্রেক্ষাপট দাঁড়াবে। কারণ আমাদের সিনেমার দর্শকও রয়েছে তাদের দেশে। এসব বিষয়ে যদি একমত হওয়া যায় তাহলে দুই দেশের সিনেমার জন্যই নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করি।
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন
আমাদের দেশের প্রেক্ষাগৃহে অনেক আগে থেকেই তো হলিউডের সিনেমাগুলো মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যেহেতু কোনো সমস্যা হচ্ছে না তাহলে বলিউডের সিনেমা মুক্তি দিলে কেন সমস্যা হবে? এই প্রশ্ন উঠাই তো উচিত না বলে আমি মনে করি। আমি চাই ভারতীয় সিনেমা দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাক। সেক্ষেত্রে আমাদের কাজের গতিটা আরও বেড়ে যাবে। তাদের সঙ্গে একটা প্রতিযোগিতাও শুরু হবে বলেও আমি মনে করি। যা আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে।
হল মালিক নেতা ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ
দেশের সিনেমা হলে ‘পাঠান’কিংবা যেকোনো বিদেশি সিনেমার কথাই বলেন না কেন, এটা আমার কাছে অবশ্যই ইতিবাচক। একটা বিষয় ভাবেন, সিনেপ্লেক্সগুলো কিন্তু এককভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে। আমরা সিনেমা হল মালিক এতদিন ধরে দেশের সিনেমা হল বাঁচিয়ে রেখেছি, অথচ আমাদের সিনেমা হলে ‘অপারেশন সুন্দরবন’- এর মতো সিনেমা মুক্তি পেলেও সেখানে দিনে মাত্র গুটিকয়েক টাকা লাভ হিসাব করতে হয়। সিনেপ্লেক্সের ধারেকাছেও আমরা নেই। তাই আমি বা আমরা যারা সিনেমা হল মালিক সমিতিতে আছি তারা ব্যক্তিগতভাবেই চাই, দেশের সিনেমা হলে বিদেশি সিনেমা মুক্তি পাক। সেক্ষেত্রে আমরা যদি কিছু ব্যবসা করতে পারি তাহলেই না আমরা হল চালাতে পারব। তবে হিন্দি সিনেমা মুক্তির ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা রাখতে হবে। শুধু হিন্দি সিনেমা হলেও আবার হবে না। আমাদের দেশি সিনেমাও সমানভাবে যেন ভারতে মুক্তি পায় সেদিকটি খেয়াল রাখতে হবে। তাহলে দুই ইন্ডাস্ট্রির সিনেমাই লাভবান হবে। একতরফা কিছু চাই না আমরা।
নির্মাতা ও প্রযোজক অনন্য মামুন
‘পাঠান’ সিনেমাটি বাংলাদেশে আমদানি প্রসঙ্গে মঙ্গলবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, ছবি আমদানি করতে মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে কোনো সমস্যা বা বাধা নেই। তথ্য মন্ত্রণালয়ে যে নীতিমালা সেখানে বিদেশি সিনেমা আমদানির ক্ষেত্রে দুটি বিষয় উল্লেখ আছে। এক স্থানে বলা, আনা যাবে, আরেক স্থানে বলা আছে আনা যাবে না। তাই আইনের বিষয়গুলো পরিষ্কার করে ছবি আমদানি যেন করা যায় সে নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। ‘পাঠান’যেহেতু একটি বিদেশি পণ্য তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরও কিছু কাজ আছে এখানে। সেগুলো মিটিয়ে ছবিটি নিয়ে আসব আমরা। দু-এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। আশা করছি কোটি কোটি দর্শক দেশের প্রেক্ষাগৃহে বসেই ‘পাঠান’দেখতে পাবেন।