মৌসুম আহমেদ
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০৪ পিএম
‘এ হাওয়া আমায় নেবে কত দূর, এ হাওয়া আমি এখানে।’ সুরের নেশায় ভাসতে ভাসতে হাওয়ার টানে গুটি গুটি পায়ে ২০ বছরে পা রেখেছে মেঘদল ব্যান্ড। আজ সবার কাছে প্রিয় এক গানের দলের নাম মেঘদল। ২০০৩-এর ২২ জানুয়ারি মেঘদলের শুরু।
বিশ বছর পূর্তিতে সেই আবেগ থেকে এই দলের ড্রামার আমজাদ হোসেইন তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস শেয়ার করে লেখেন, ‘সময় ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ, ২২ জানুয়ারি। তৎকালীন ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটের শুকনো পুকুরে শুরু হয়েছিল মেঘদলের আজকের এই গানের যাত্রা। আজ মেঘদল বিশ বছর পূর্ণ করল। এটা এক অভাবনীয় ব্যাপার যে এই সুদীর্ঘ সময় ধরে অগণিত শ্রোতা-বন্ধুরা আমাদের গানকে নানাভাবে উদযাপন করে আসছে। আমাদের প্রাণিত করে আসছে। কত সুসময় কত দুঃসময়ের সাক্ষী এসব চেনা-অচেনা শ্রোতা-বন্ধুরা। মেঘদল তাদের ভালোবাসার শক্তিতে আজও একইভাবে সবার পাশে আছে তাদের গান, কথা আর সুর নিয়ে। একটা সুন্দর পৃথিবীর কথা আমরা আজও ভাবতে পারি তাদের জন্য। গান আমাদের লড়াই আর স্বপ্ন দেখার যুগপৎ হাতিয়ার হয়ে উঠুক এই কামনা। সকলের জন্য ভালোবাসা।’
এই আশ্চর্য মেঘের দলকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন কিছু গান পাগলের সওয়ারি। তাদের গানের কথায় মেঘের আনাগোনা, কণ্ঠে তাদের মেঘের সুর আর বাদ্যযন্ত্রে আছে মেঘের সিম্ফনি। গানের দলের নামটাও তাই বুদ্ধদেব বসুর কবিতার সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে উঠল ‘মেঘদল’। মেঘদলের গল্পের শুরুটা অনেক বছর আগের। তিন বন্ধু মেজবাউর রহমান সুমন, শিব কুমার শীল ও মাসুদ হাসান উজ্জ্বল মিলে গান-বাজনার শুরু। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন আরেক বন্ধু সৌরভ। তিনি মূলত বাঁশি বাজাতেন।
চারুকলায় পড়ার সময় নিজেদের সঙ্গে পরিচয়। বন্ধুত্বের সঙ্গে সঙ্গে গানের প্রতি ভালোবাসাও বাড়তে থাকে। নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক দর্শন সবকিছুর মধ্যেই কেমন যেন আত্মীকরণ খুঁজে পেয়েছিলেন তারা। প্রথমে সুমন এবং উজ্জ্বল নিজেদের গান শুরু করেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন শিব কুমার শীল বা সংক্ষেপে শিবু।
শিবু হলেন মূলত কবি। কবিতার ভাষাকে উপজীব্য করে কিছুটা নাটকীয় আমেজে সুরের মূর্ছনায় ভাসিয়ে তোলার প্রয়াসে ২০০৩ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গানের দলটির নামকরণ করা হয় ‘মেঘদল’। মেঘদলের ভালো লাগা ছিল ‘মহীনের ঘোড়াগুলো’, ‘কবীর সুমন’, ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ ও ‘লালন’-এর প্রতি। তবে তেমন করে কখনও মঞ্চে অন্যের গান করা হয়নি দলটির। প্রথম থেকেই নিজেদের কথা ও সুরের সঙ্গে শ্রোতাদের একাত্ম করে চলেছে মেঘদল।
শুরু থেকেই মেঘদলের গানের চিন্তায় ছিল শহরকেন্দ্রিক ‘সুরিয়ালিজম’ বা ‘পরাবাস্তবতা’। ‘ওয়াইল্ড মেট্রোপলিস’ বা ‘বন্য-মহানগর’ যেন বারবার ফিরে এসেছে মেঘদলের প্রতিটি গানে। শহরের নোনা ধরা দেয়ালের আস্তরণে, বস্তির ক্রন্দনরত শিশুর মুখের হাসি ফোটাতে, কিংবা অফিস থেকে বাসের ভিড়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত ঘামে ভেজা সেই মানুষটির চোখে এই শহরের কেমন প্রতিচ্ছবি তা-ই যেন ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে প্রতিটি গানের কথা ও সুরে।
আর তাই তো এই প্রজন্ম পেয়েছে, এসো আমার শহরে, এ হাওয়া, মায়া সাইকেল, তবু মন, চেনা অচনা, না বলা ফুল, নির্বাণএর মতো কিছু মৌন অবসাদ কাটানো গান, চোখ বুজে শোনা কিছু শান্তির গান।
এ পর্যন্ত মেঘদলের প্রকাশিত অ্যালবামের মধ্যে ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম অ্যালবাম ‘দ্রোহের মন্ত্রে ভালোবাসা’। অ্যালবামটির ‘চেনা অচেনা’, ‘আকাশ মেঘে ঢাকা’, ‘আমার শহর’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
২০০৭ সালে নিওন আলোয় স্বাগতম (মিশ্র অ্যালবাম) মুক্তি পায়। ২০০৯ সালে আসে মেঘদলের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘শহরবন্দী’। অ্যালবামটির ‘রোদের ফোঁটা’, ‘ঠিক ঠাক’, ‘কুমারী’, ‘নির্বাণ’, ‘আবার শহর’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর ২০১৭ সালের শেষদিকে মেঘদল প্রকাশ করে তাদের আসন্ন ‘এলুমনিয়ামের ডানায়’ অ্যালবামের একটি গান ‘এসো আমার শহরে’। যে গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে ব্যাপক সাড়া ফেলে শ্রোতাদের মনে।
সর্বশেষ, হাওয়া চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করেই মেঘদল এক দীর্ঘবিরতির পর আবারও তাদের নতুন গান ‘এ হাওয়া’ নিয়ে শ্রোতাদের মাঝে হাজির হচ্ছে। যে গানে এখনও বুঁদ হয়ে আছে গোটা বাঙালি।
মেঘদলের বর্তমান সদস্য হিসেবে আছেন শিবু কুমার শীল (কথা, সুর, কণ্ঠ), মেজবাউর রহমান সুমন (কথা, সুর, কণ্ঠ), রাশিদ শরীফ শোয়েব (কণ্ঠ, সুর, গিটার),
আমজাদ হোসেন (ড্রামস), এমজি কিবরিয়া (বেইস), তানভির দাউদ রনি (কিবোর্ড), সৌরভ সরকার (বাঁশি, ক্ল্যারিনেট, স্যাক্সোফোন)।