সৌম্য প্রীতম
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:৩২ পিএম
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:৫৮ পিএম
সিনে দুনিয়ায় তিনি তুলনাহীন। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশা প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। সময়ের আগে ছুটে চলা যায় না-- বিজ্ঞানীদের এমন ধারণা প্রতিনিয়ত তিনি ভুল প্রমাণ করে যান। কারণ তিনি ‘স্পেশাল ওয়ান’ জেমস ক্যামেরন। সেলুলয়েডের ফ্রেম যেন তার কাছে ড্রয়িংয়ের খাতা। যাতে রংতুলির আলপনায় রাঙিয়ে তোলেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। এ প্রজন্মের নির্মাতাদের কাছে তিনি আইকন। তবে তাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেললে আপত্তি জানাতে পারেন অনেকে। বরং তাকে ভবিষ্যতের দিশারী বলা যায়। যিনি সময়ের আগে চলে আগামীর কথা বলেন। তার পথ ধরে অন্যরাও খোঁজ করেন ভবিষ্যতের। এই ম্যাজিশিয়ান নির্মাতার উল্লেখযোগ্য ১০টি ঘটনা নিয়ে এ আয়োজন...
১. জেমস ক্যামেরনের বাবা ফিলিপ ক্যামেরন ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং মা শার্লি একাধারে চিত্রশিল্পী ও নার্স। স্কটল্যান্ডের শেকড়ধারী এই পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় ক্যামেরন। জন্ম কানাডায় হলেও একটা সময় সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান। ১৯৭৩ সালে কমিউনিটি কলেজ ‘ফুলারটন কলেজ’-এ ভর্তি হন। ভালো না লাগায় পদার্থবিজ্ঞান ছেড়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে কলেজ ছেড়ে দেন। শুরু করেন ‘অড জব’। ট্রাক চালানো শেখেন এবং ট্রাকচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।
২. ১৯৭৭ সালে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ‘স্টার ওয়ারস’ সিনেমাটি ক্যামেরনের জীবনে নতুন বাঁক এনে দেয়। এরপর সিনেমা নেশার মতো পেয়ে বসে তাকে। ট্রাকচালকের ক্যারিয়ার ইস্তফা দিয়ে পরিকল্পনা করেন সিনেমা নির্মাণের। সে সময় অপটিক্যাল প্রিন্টিং, ফ্রন্ট স্ক্রিন প্রজেকশন, ডাই ট্রান্সফার এবং চলচ্চিত্র প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক কিছুই শিখেছেন প্রবল আগ্রহভরে। তার এসব অভিজ্ঞতা যে হলিউডের মৃতপ্রায় সায়েন্স ফিকশনধর্মী চলচ্চিত্রধারাকে নতুন জীবন দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
৩. নির্মাতা হিসেবে জেমস ক্যামেরনের ক্যারিয়ারের শুরু বলা যায় ১৯৭৮ সালে। দন্ত চিকিৎসকদের একটি সংস্থা থেকে টাকা ধার করে তার এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘জেনোজেনেসিস’। এরপর তিনি ‘রক অ্যান্ড রোল হাইস্কুল (১৯৭৯)’-এর প্রযোজনা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের কলাকৌশল শেখার এ অভিযাত্রায় রজার কোরম্যান স্টুডিওতে ‘মিনিয়েচার মডেল’ নির্মাতা হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত শিল্পনির্দেশক, বিশেষ দৃশ্যধারণ সহকারী, প্রডাকশন ডিজাইনারসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।
৪. জন কার্পেন্টারের হরর সিনেমা ‘হ্যালোইন (১৯৮২)’ তাকে অনুপ্রাণিত করে সাই-ফাই অ্যাকশন চলচ্চিত্র ‘দ্য টার্মিনেটর (১৯৮৪)’ নির্মাণে। সাবেক স্ত্রী, সহকর্মী এবং প্যাসিফিক ওয়েস্টার্ন প্রোডাকশনের প্রতিষ্ঠাতা গ্যাল অ্যান হার্ড ক্যামেরনের চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করার শর্তে ১ ডলারের বিনিময়ে স্ক্রিপ্টটি কিনে নেন। ক্যামেরনের পরিচালনা এবং হার্ডের প্রযোজনায় হেমডেল পিকচার্স চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করে। আর এ সিনেমার মধ্য দিয়েই রুপালি পর্দায় আরেক হলিউড তারকা আরনল্ড শোয়ার্জনেগারের সঙ্গে জুটি গড়ে ওঠে ক্যামেরনের। এ ছবিটি ক্যামেরনের ক্যারিয়ারে নতুন পালক যোগ করে।
৫. ‘টাইটানিক’ সিনেমা শুধু হলিউড নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনেও চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। তবে চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগেই ‘ওভার বাজেট’-এর তকমা পায়। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও এবং কেট উইন্সলেট জুটির এ সিনেমা মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে এবং জিতে নেয় ১১টি অস্কার। দর্শক থেকে শুরু করে সমালোচক মহলে তুমুল প্রশংসা পাওয়া সিনেমাটি টানা একযুগ ইতিহাসে সর্বোচ্চ উপার্জনকারী চলচ্চিত্রের আসনটি ধরে রাখে।
৬. ১৯৯৫ সালে ‘অ্যাভাটার’ সিনেমা নিয়ে কাজ শুরু করেন ক্যামেরন। তবে সে সময় প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে ২০০৯ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। এ ছবিটিও সিনে দুনিয়ায় সায়েন্স ফিকশন ঘরানার চলচ্চিত্রের নতুন দ্বার উন্মোচন করে। সায়েন্স ফিকশন সিনেমায়ও যে সুন্দর গল্পের বুনন দেওয়া সম্ভব, তা ক্যামেরন ছবিটি দিয়ে প্রমাণ করেছেন। গত মাসে ছবিটির দ্বিতীয় কিস্তি মুক্তি পায়। এরই মধ্যে সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে।
৭. সমুদ্রের তলদেশের প্রতি প্রবল আকর্ষণ রয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ‘সি এক্সপ্লোরার’ ক্যামেরনের। তিনি সমুদ্র তলদেশ নিয়ে অসংখ্য ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছেন। জেমস ক্যামেরন প্রথম একক ডুবুরি হিসেবে পৃথিবীর গভীরতম স্থান প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চে পৌঁছানোর অনন্য রেকর্ড গড়েন ২০১২ সালে।
৮. পাঁচবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ক্যামেরনের প্রথম চারটি বিয়ের মেয়াদ ছিল দুই থেকে ছয় বছর করে। তিনি ২০০০ সালে স্যুজি এমিসেকে বিয়ে করেন। তারা এখনও একসঙ্গে রয়েছেন এবং এ দম্পতি এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাট চুকিয়ে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী হয়েছেন ক্যামেরন। সেখানে তিনি জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ নিয়ে মেতে আছেন।
৯. জেমস ক্যামেরন নাসার উপদেষ্টা পরিষদ এবং মঙ্গল গ্রহকেন্দ্রিক ‘মার্স সোসাইটি’রও সদস্য। নাসার সঙ্গে মিলে তিনি ক্যামেরা তৈরির কাজ করেছিলেন, যা মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর কথা ছিল। পরীক্ষার সময়স্বল্পতার কারণে ‘কিওরিওসিটি রোভার’টি ক্যামেরনের প্রযুক্তি ছাড়াই পাঠানো হয়। তিনি পৃথিবীর শীর্ষ ১৫০ প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন।
১০. ১৯৯৮ সালে তিনি এবং তার ভাই ‘আর্থশিপ প্রোডাকশন’ কোম্পানি গঠন করেন, যা গভীর সমুদ্রে ডকুমেন্টারি স্ট্রিমিংয়ের অনুমতি পায়।